বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

প্রবাস

সুদের ফাঁদে নীরব নির্যাতনের শিকার, গ্রেপ্তার ২ ব্যবসায়ী

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি ৮ আগস্ট , ২০২৬, ১২:২৪:৩৫

102
  • ছবি : নিউজজি

ঠাকুরগাঁও: অভাবের তাড়নায় নেয়া মাত্র ১২ হাজার টাকার ঋণ। সেই ঋণের জামানত হিসেবে দেয়া একটি ফাঁকা চেকই হয়ে ওঠে এক দিনমজুরের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। চেকে বসানো হয় ১৩ লাখ টাকা, এরপর শুরু হয় আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর দৌড়ঝাঁপ, অর্থনৈতিক নিঃস্বতা আর মানসিক যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়।

শুধু একজন নন, একই কৌশলে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি পরিবারকে সুদের ফাঁদে ফেলে নিঃস্ব করার অভিযোগ উঠেছে আলোচিত দাদন ব্যবসায়ী খাদেমুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অবশেষে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় ক্ষোভ এবং গণমাধ্যমে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে।

গত বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার ভানোর ইউনিয়নের শিধোর বাজার এলাকা থেকে খাদেমুল ইসলামকে আটক করে বালিয়াডাঙ্গী থানা পুলিশ। পরে ভুক্তভোগী দিনমজুর উত্তম কুমার রায় বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ৩ বছর আগে ভানোর ইউনিয়নের কলন্দা কাজীপাড়া গ্রামের দিনমজুর উত্তম কুমার রায় সংসারের অভাব মেটাতে খাদেমুল ইসলামের কাছ থেকে সুদে ১২ হাজার টাকা ধার নেন। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুদে-আসলে সেই ঋণের দাবি দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকায়। ধার করা টাকার দ্বিগুণেরও বেশি পরিশোধ করেও তিনি জামানত হিসেবে দেয়া ফাঁকা চেক ফেরত পাননি। পরবর্তীতে সেই চেকে ১৩ লাখ টাকা লিখে উত্তম কুমারের বিরুদ্ধে আদালতে চেক প্রতারণার মামলা করা হয়। গত ৩ বছর ধরে ওই মামলার পেছনে দেড় লাখ টাকারও বেশি ব্যয় করে আজ প্রায় সর্বস্বান্ত এই দিনমজুর।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, খাদেমুল ইসলামের সুদের কারবার ও ফাঁকা চেকের অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন উপজেলার অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর সুদের ব্যবসার আড়ালে অসহায় মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মিথ্যা চেক মামলার মাধ্যমে তাদের আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলা হয়েছিল।

আরেক ভুক্তভোগী খমির উদ্দীন জানান, ২০২০ সালে তিনি মাত্র ৭ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধেও ১০ লাখ টাকার চেক মামলা করা হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সম্প্রতি তিনি আদালত থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

ভুক্তভোগী উত্তম কুমার রায় বলেন, একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ হয়েছে। ১১ মাসের সুদসহ ৩৮ হাজার টাকা পরিশোধ করতেও রাজি ছিলাম। কিন্তু তিনি কোনো সমাধানে না গিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেন। মামলার খরচ চালাতে গিয়ে আজ আমি নিঃস্ব।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খাদেমুল ইসলাম ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংকে নিয়ে গিয়ে হিসাব খুলে দিতেন। এরপর চেকবইয়ের সব পাতায় স্বাক্ষর নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিতেন। পরবর্তীতে সুদের টাকা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলেই সেই ফাঁকা চেকে বড় অঙ্কের টাকা লিখে আদালতে মামলা করতেন।

সম্প্রতি এসব অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এরপরই পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম জানান, স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে অভিযুক্তের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, শুধু একজনকে গ্রেপ্তার করলেই চলবে না; তার দায়ের করা সব মিথ্যা ও হয়রানিমূলক চেক মামলা বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং সুদের কারবারের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনা শুধু একজন দাদন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি গ্রামীণ জনপদে সুদের ফাঁদ, ফাঁকা চেকের অপব্যবহার এবং নীরবে চলতে থাকা আর্থিক শোষণের একটি ভয়াবহ চিত্র, যা প্রতিরোধে প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

 

নিউজজি/এসএম

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers