সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ , ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

দেশ

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যার ১৯ বছর পর স্বামী গ্রেপ্তার

নিউজজি প্রতিবেদক ২৩ জুন, ২০২২, ১৭:৫৩:০৯

59
  • ছবি: ইন্টারনেট

ঢাকা: মানিকগঞ্জ সদর থানার বাসিন্দা গৃহবধূ জুলেখা বেগম (১৯) হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি স্বামী সিরাজুল ইসলামকে (৪০) ১৯ বছর পর গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। বুধবার (২২ জুন) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-৪-এর একটি দল নারায়ণগঞ্জ জেলার সদর থানাধীন চর সৈয়দপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করে।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুন) দুপুরে কাওরান বাজার র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাব-৪-এর অধিনায়ক ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক।

ডিআইজি জানান, সিরাজুল ও জুলেখার ২০০২ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে সিরাজুল জুলেখাকে প্রায়ই যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতে থাকেন। এর মধ্যে জুলেখা ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সিরাজুল তার প্রতিবেশী মোশারফ নামে এক যুবকের সঙ্গে জুলেখার পরকীয়ার সম্পর্ক আছে বলে মিথ্যা অভিযোগ তোলে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

তিনি জানান, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০০৩ সালে সিরাজুল ব্যাগে থাকা গামছা স্ত্রী জুলেখার গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করেন। পরে মরদেহ নদীর পাড়ে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় সিরাজুল।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ২০০২ সালে বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে বেশকিছু নগদ অর্থ, গহনা ও আসবাবপত্র বরপক্ষকে দেন জুলেখার বাবা। বিয়ের পর থেকে সিরাজুল ভিকটিমকে আরও যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে এবং ভিকটিমকে যৌতুক না দিতে পারলে তালাক দেয়ার ভয়-ভীতি দেখায়। ভিকটিমের পরিবার থেকে পর্যাপ্ত যৌতুক না পাওয়ায় আসামির নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে আসামি সিরাজুল প্রতিবেশী মোশারফ নামে এক যুবকের সঙ্গে ভিকটিমের পরকীয়ার সম্পর্ক আছে বলে মিথ্যা অভিযোগ তোলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন, আসামির নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ভিকটিমের বাবা ও ভাইসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে গ্রামে সালিশ বৈঠক হয়। সেখানে ভিকটিমের কোনো দোষ না পেয়ে এবং পরকীয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় সালিশে আসামি সিরাজুলকে গালিগালাজ করা হয়। একই সঙ্গে ভিকটিমকে নির্যাতন না করার জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়। এ ঘটনার পর সিরাজুল আরও ক্ষিপ্ত হয়ে জুলেখাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০০৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সিরাজুল জুলেখাকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি সিংগাইরের উত্তর জামশা গ্রামে যায়। এর তিন দিন পর সিরাজুল জুলেখাকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলে মানিকগঞ্জ শহরে নিয়ে যায় এবং বিভিন্ন অজুহাতে কালক্ষেপণ করে গভীর রাতে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে মানিকগঞ্জ শহর থেকে রওনা হয়। মানিকগঞ্জ শহর থেকে সিরাজুল জুলেখাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি না গিয়ে কৌশলে তার শ্বশুরবাড়ির নিকটবর্তী কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়।

র‍্যাব-৪-এর অধিনায়ক ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক বলেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আসামি তার ব্যাগে থাকা গামছা বের করে জুলেখার গলায় প্যাঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীর পাড়ে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ৭ ডিসেম্বর থানা পুলিশ ভিকটিমের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠায়। একই দিন নিহত জুলেখার বাবা আব্দুল জলিল বাদী হয়ে সিংগাইর থানায় আসামি সিরাজুল, তার বড় ভাই রফিকুল, মা রাবেয়া বেগম, খালু শামসুল, চাচা ফাইজুদ্দিন ও তাইজুদ্দিন এবং মামা আবুল হোসেনসহ মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-১৬।

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত শেষে এজাহারনামীয় আসামি ভিকটিমের স্বামী সিরাজুল, ভাসুর রফিকুল, শাশুড়ি রাবেয়া এবং খালু শ্বশুর শামসুলসহ মোট ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করে এবং এজাহারনামীয় বাকি ৩ আসামি, ফাইজ উদ্দিন, তাইজুদ্দিন ও আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পরবর্তীতে চার্জশিটের ভিত্তিতে আদালত মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন এবং পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ভিকটিম জুলেখাকে হত্যায় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে ২০০৫ সালের শেষের দিকে মানিকগঞ্জ জেলার জেলা ও দায়রা জজ মো. মোতাহার হোসেন সিরাজুলকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন এবং অপর ৩ জন আসামি ভাসুর রফিকুল, শাশুড়ি রাবেয়া এবং খালু শ্বশুর শামসুলকে খালাস দেন। ঘটনার পর থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সিরাজুল প্রায় ১৯ বছর পলাতক ছিলেন। অবশেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নিউজজি/জেডকে

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন