শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ , ২২ শাওয়াল ১৪৪৭

দেশ

শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় আইন ও মানবিকতার সমন্বয়ের আহ্বান

নিউজজি প্রতিবেদক ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:২৫:২০

47
  • ছবি : নিউজজি

ঢাকা: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) এর আয়োজনে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন নাকি দক্ষিণ এশীয় আশ্রয় প্রদানের ঐতিহ্য: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ” শীর্ষক একটি সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত বিলিয়া নিজেস্ব  অডিটোরিয়ামে এই সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়।

সিম্পোজিয়ামে সমসাময়িক বিশ্বে শরণার্থী সুরক্ষার নৈতিক ভিত্তি ও ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করতে এ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিবৃন্দ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।

সিম্পোজিয়ামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের আইন বিভাগের রিডার ড. সাইমন বেহরম্যান। আশ্রয় ও শরণার্থী আইন বিষয়ে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি বৈশ্বিক শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থার জটিলতা তুলে ধরেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি থেকে উদ্ভূত নতুন চ্যালেঞ্জসমূহের ওপর আলোকপাত করেন।

তার মূল বক্তব্যে ড. বেহরম্যান আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের একটি বিস্তৃত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন এবং দেখান কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের আশ্রয় ও আতিথেয়তার ঐতিহ্য ঐতিহাসিকভাবে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি তিনি এ অঞ্চলে শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান আইনগত, রাজনৈতিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বিলিয়ার পরিচালক অ্যাম্বাসেডর এম. মারুফ জামান। তিনি শরণার্থী সুরক্ষার বিষয়টি আইনগত ও নৈতিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে আধুনিক শরণার্থী আইন, যা মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, তা অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একটি বিধিবদ্ধ কাঠামো তৈরি করেছে। অপরদিকে, দক্ষিণ এশীয় আশ্রয় প্রদানের ঐতিহ্য মানবিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক রীতি এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতাগত ধারা প্রতিফলিত করে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের নিজস্ব ইতিহাস—বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ব্যাপক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়া—এর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গঠিত করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক উচ্চকমিশনারি (UNHCR)-এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে বসবাস করছেন। এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে আসছেন, যার মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির কুতুপালং শিবিরও রয়েছে। ১৯৫১ সালের শরণার্থী সংক্রান্ত চুক্তির স্বাক্ষরকারী না হওয়া সত্ত্বেও, মানবিক কারণে বাংলাদেশ রহিঙ্গা জনগণকে সুরক্ষা প্রদান করেছে।

অ্যাম্বাসেডর জামান আরও বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয়তাবাদ ও জনতাবাদ বৃদ্ধির ফলে অভিবাসনকে সার্বভৌমত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার ফলে আশ্রয়নীতি আরও কঠোর হয়ে উঠছে এবং শরণার্থী চলাচলকে নিরাপত্তা-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হচ্ছে। তিনি আশ্রয় প্রদানের দায়িত্ব বহির্ভূত করার প্রবণতা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবিত বাছাইভিত্তিক মানবিক প্রতিক্রিয়ার উদ্ভবের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

অ্যাম্বাসেডর জামান আরও উল্লেখ করেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও পরিবেশগত অবক্ষয়সহ বিভিন্ন ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ নিজেও রয়েছে, যা দেশ ও অঞ্চলে ক্রমবর্ধমানভাবে বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়ে উঠছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শরণার্থী সুরক্ষায় আইনগত কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে সহমর্মিতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বৈশ্বিক দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়টিও সমানভাবে প্রয়োজন।

সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বিলিয়ার সম্মানিত ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাম্বাসেডর আবদুল্লাহ আল হাসান, অ্যাম্বাসেডর এম. জামির এবং অ্যাম্বাসেডর মাজেদা রফিক নেসা। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি সংগঠনের বিশিষ্ট সদস্যরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

সিম্পোজিয়ামে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মূল্যবান মতামত আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে এবং একটি প্রাণবন্ত মতবিনিময়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন বিলিয়ার সম্মানিত সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ একরামুল হক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে শরণার্থী সুরক্ষা বিষয়ে ধারাবাহিক সংলাপ ও গবেষণার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।

নিউজজি/এসডি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers