বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৮ সফর ১৪৪৮

দেশ

ঠাকুরগাঁওয়ে এক অবর্ণনীয় মানবিক ট্র্যাজেডি!

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি ১০ জুলাই, ২০২৬, ১৫:১৬:৩৭

87
  • সংগৃহীত

ঠাকুরগাঁও: মৃত্যু চিরন্তন, কিন্তু বিদায়ের শেষ মুহূর্তটি যখন এক জীবন্ত নরকযন্ত্রণার রূপ নেয়, তখন তা সমাজ আর সভ্যতার বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তেমনই এক বুক ফাটানো, হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হলো ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা।

টানা কয়েকদিনের বর্ষণে প্লাবিত পথ, চারদিকে থৈ থৈ করছে পানি। সেই পানির তীব্র স্রোত ঠেলে, কোমর থেকে বুকসমান পানিতে ডুবে কাঁধে খাটিয়া নিয়ে এগিয়ে চলেছেন কয়েকজন মানুষ। খাটিয়ার ওপর শুয়ে আছেন ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা মা—মফিজান বিবি। এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, বরং দেশের একটি গ্রামীণ জনপদের নির্মম বাস্তবতার ছবি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড়।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোরে হরিপুর উপজেলার বকুয়া ইউনিয়নের ফালডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা মফিজান বিবি বার্ধক্যজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর স্বজনদের শোকের ছায়াকে আরও ঘনীভূত করে তোলে গ্রামের ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিকেলে বকুয়া ইউনিয়নের রহমান হাফেজিয়া মাদ্রাসা মাঠে জানাজার সময় নির্ধারণ করা হয়। ​কিন্তু বাড়ি থেকে জানাজাস্থল—মাত্র আড়াই কিলোমিটারের এই পথটুকুই যেন হয়ে ওঠে এক দুর্ভেদ্য মহাসমুদ্র। বিকল্প পথে যেতে হলে ঘুরতে হবে প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ, যা ওই মুহূর্তে ছিল অসম্ভব। নিরুপায় হয়ে স্বজন ও গ্রামবাসীরা মৃত মায়ের খাটিয়া কাঁধে তুলে নেন। কোথাও কোমর, কোথাও বুকসমান নোংরা পানি ভেঙে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই মরদেহ বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জানাজার মাঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি নেটিজেনরা। জেলা ছাড়িয়ে পুরো দেশে এখন এই ভিডিওটি এক নীরব প্রতিবাদের প্রতীক।

স্থনীয় ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ফালডাঙ্গী-নোনা সংযোগ সড়কে দীর্ঘদিনেও কোনো স্থায়ী ব্রিজ নির্মিত হয়নি। ফলে প্রতি বছর বর্ষা এলেই দোস্তমপুর ও ফালডাঙ্গীসহ আশপাশের চার গ্রামের প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পুরোপুরি পানিবন্দি ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ​গ্রামবাসীদের অভিযোগ, নির্বাচন এলে জনপ্রতিনিধিরা বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু ভোট ফুরোলেই সব শেষ। অবহেলার এই চিত্র বদলাতে সম্প্রতি স্থানীয়রা নিজেদের পকেটের টাকা ঢেলে, নিজেদের শ্রমে একটি কাঁচা রাস্তা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাস আর প্রশাসনের উদাসীনতায় কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সেই স্বপ্নও এখন পানির নিচে। আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও এই চার গ্রামের মানুষ এখনো মধ্যযুগীয় ভোগান্তির শিকার।

স্থানীয়রা জানান, বর্ষাকালে কোনো মানুষ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো অবস্থা থাকে না। রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় এই অঞ্চলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়াও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মফিজান বিবির এই খাটিয়া শুধু একটি মরদেহ বহন করেনি, বরং তা বহন করেছে আমাদের গ্রামীণ অবকাঠামোর কঙ্কালসার রূপকে। ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত এলাকাবাসী এখন দ্রুত ফালডাঙ্গী-নোনা সড়কে একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ এবং রাস্তা সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন।

​জানাজা শেষে মফিজান বিবিকে হয়তো কবরে শায়িত করা হয়েছে, কিন্তু সমাজের বিবেকের কাছে গ্রামবাসীদের রেখে যাওয়া প্রশ্নটি এখনো বাতাসে ভাসছে"স্বাধীনতার এত বছর পরেও, আর কতদিন প্রিয়জনের মরদেহ এভাবে বুকসমান পানি ভেঙে গোরস্থানে নিয়ে যেতে হবে?"

​​এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চন্দন কর মুঠোফোনে জানান, "আমি বিষয়টি জানার সাথে সাথেই উপজেলা প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেছি। বন্যার পানি কিছুটা কমলেই সেখানে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিউজজি/এসডি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers