বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

দেশ

আজ পবিত্র ‘আখেরি চাহার সোম্বা’

নিউজজি ডেস্ক ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৫:০৩

167
  • সংগৃহীত

ঢাকা: ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ একটি আরবি ও ফারসি শব্দগুচ্ছ। এর অর্থ সফর মাসের শেষ বুধবার। ফারসি ভাষায় ‘আখেরি’ অর্থ শেষ, ‘চাহার’ অর্থ বুধবার এবং ‘সোম্বা’ শব্দটি সফর মাসকে বোঝায়। অর্থাৎ, ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বলতে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বোঝানো হয়।

আখেরি চাহার সোম্বা কী?

হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে আখেরি চাহার সোম্বা বলে। বুধবার (১২ আগস্ট) আজ আখেরি চাহার সোম্বা।

সফর মাসের শেষ বুধবার মহানবী (সা.) গুরুতর অসুস্থতা থেকে সুস্থতা অনুভব করেছিলেন—এমন একটি মত প্রচলিত রয়েছে। এ উপলক্ষে সাহাবিরা আনন্দ প্রকাশ করে দান-সদকা ও শুকরিয়া আদায় করেছিলেন বলেও উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের কিছু দেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ দিনে দান-সদকাসহ বিভিন্ন নফল ইবাদত পালন করে থাকেন।

বাংলাদেশেও আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে সরকারি বার্ষিক ছুটির তালিকায় একটি ঐচ্ছিক ছুটি রাখা হয়েছে। তবে এ দিবস পালন নিয়ে দেশের আলেমদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে।

আখেরি চাহার সোম্বা উদযাপন!

কারো মতে মহানবী (সা.) কোন দিনে সুস্থ হয়েছিলেন, কোন অসুস্থতার পর সুস্থ হয়েছিলেন ইত্যাদি স্পষ্ট করে ইতিহাসে বর্ণিত নেই। আবার মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পর কোনো সাহাবি এই দিবস পালন করতেন না। তাই এই দিবস পালনে তারা নিরুৎসাহিত করেন।

যারা এই দিবস পালন করে থাকেন তারা দুই সময়ের অসুস্থতার কথা বলে থাকেন। কেউ বলেন সপ্তম হিজরিতে মহানবী (সা.)-এর জাদুতে আক্রান্ত হওয়ায় অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এবং সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন। আবার কেউ কেউ বলেন, মহানবী (সা.)  মৃত্যুর আগে যে অসুস্থ হয়েছিলেন সে সময় সফর মাসের শেষ বুধবারে সুস্থতা অনুভব করেন এবং মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন। এ সময় হজরত আবু বকর (রা.)-কে ইমামতির দায়িত্ব দেন তিনি। সে বুধবারের পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।

মহানবী (সা.) যখন সুস্থ হয়ে মসজিদে আসেন তখন উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম অনেক আনন্দিত হন এবং শুকরিয়া স্বরূপ দান সদকা করেছিলেন। সে ঘটনাকে স্মরণ করে অনেকে সফর মাসের শেষ বুধবারে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ পালন করে থাকেন। তবে মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পরে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়িদের মধ্যে কেউই কখনো  এই দিন উদযাপন করেননি।

বর্ণিত আছে, আবু বকর (রা.) খুশিতে ৭ হাজার দিনার এবং ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) ৫ হাজার দিনার, ওসমান (রা.) ১০ হাজার দিনার, আলী (রা.) ৩ হাজার দিনার, আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ১০০ উট ও ১০০ ঘোড়া আল্লাহর পথে দান করেছিলেন। এসব বর্ণনা ‘বারো চান্দের ফজিলত’ ও ‘রাহাতুল কুলুব’ ইত্যাদি বইয়ে বলা আছে। তবে উল্লিখিত কিতাব দুটিতে বর্ণিত ও বহুল প্রচলিত সফর মাসের শেষ বুধবারের বিষয়টিকে ইসলামি পণ্ডিত ও গবেষকগণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

তাদের বক্তব্য হলো, মহানবী (সা.) অসুস্থ হওয়ার দিনক্ষণ নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য থাকায় নির্দিষ্ট কোনো দিনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অথচ রসুল (সা.)-এর অসুস্থতাজনিত বর্ণনা অসংখ্য হাদিসে রয়েছে, তবে কোথাও দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। তা ছাড়া প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে ইসহাক বলেন, মহানবী (সা.) যে অসুস্থতায় ইন্তিকাল করেন, সেই অসুস্থতার শুরু হয়েছিল সফর মাসের শেষ কয়েক রাত থাকতে অথবা রবিউল আউয়াল মাসের শুরু থেকে। (ইবনে হিশাম, সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ : ৪/২৮৯)

এ ছাড়া ইবনে হিশাম বিভিন্ন বর্ণনার আলোকে মহানবী (সা.)-এর অসুস্থতার দিন ঠিক করেছেন ১৮ সফর থেকে একনাগাড়ে ১৩ দিন পর্যন্ত। (ইবনে হিশাম ৯৯৯) এই মতের মতোই হুবহু পাওয়া যায় ইসলামি বিশ্বকোষের ১৩নং পৃষ্ঠায়।

শুধু তা-ই নয়, মহানবী (সা.) কোন দিন থেকে অসুস্থ হয়েছিলেন, সে বিষয়েও বিস্তর মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন শনিবার, কেউ বলেছেন বুধবার এবং কেউ বলেছেন সোমবার। এমনকি কত দিনের অসুস্থতার পর তিনি ইন্তিকাল করেন, সে বিষয়েও রয়েছে মতভেদ। কেউ বলেছেন ১০ দিন, কেউ বলেছেন ১২ দিন, কেউ বলেছেন ১৩ দিন, কেউ বলেছেন ১৪ দিন। এরপর তিনি ইন্তিকাল করেন। (জারকানি/শারহুল মাওয়াহিব-১২/ ৮৩; কাসতালানি, আহমদ ইবনে মুহাম্মদ, আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া : ৩/ ৩৭৩)

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, মহানবী (সা.)-এর ওপর জনৈক ইহুদির জাদুর প্রভাব ছিল হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে সপ্তম হিজরির মহররম মাসের প্রথম দিকে। এই জাদুর প্রভাব কোনো বর্ণনায় ছয় মাসের কথা এসেছে, আর কোনো বর্ণনায় এসেছে ৪০ দিনের কথা। সুতরাং সুস্থতার তারিখ কোনোভাবেই ১১ হিজরির সফর মাসের ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বা ‘শেষ বুধবার’ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত অনেক গবেষক আলেম। (ফাতহুল বারি : ৭/৭৪৮, কিতাবুল মাগাজি : ৪৪৪২, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/১৯৩, সিরাতুন নবী, শিবলী নোমানী : ২/১১৩)

এ কথাও ঠিক নয় যে, বুধবারের পর সুস্থতায় কোনোরূপ উন্নতি হয়নি। বরং এরপর আরেক দিন সুস্থতা বোধ করেছিলেন এবং জোহরের নামাজ আদায় করেছিলেন। (বুখারি ৬৬৪, ৬৮০, ৬৮১; মুসলিম ৪১৮) এমনকি সোমবার সকালেও সুস্থতা অনুভব করেছিলেন, যার কারণে আবু বকর (রা.) অনুমতি নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। (সিরাতে ইবনে ইসহাক ৭১১-৭১২, আর রাওজাতুল উলুফ ৭/৫৪৭-৫৪৮)

বিশেষভাবে লক্ষনীয় হলো!

এই দিনটি যদি আমলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতো তাহলে এ দিনটি সম্পর্কে হাদিসে বা সাহাবিদের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতো। আর ধর্মীয় সব রীতিনীতি নির্ভরযোগ্য সনদে পাওয়া না গেলে সেটার অনুকরণ-অনুসরণ উম্মতের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। সেটা শরিয়তে বিদআত এবং নিষিদ্ধ। 

কেননা ইসলামে কেউ যদি নিজের থেকে ভালো মনে করে ইবাদতের পদ্ধতি তৈরি করে সওয়াবের আশায় পালন করে তাহলে সেটা বিদআত হিসেবে পরিগণিত হয়। কেননা, মহানবী (সা.) বলেন, কেউ যদি এমন কোনো আমল করে, যার প্রতি আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। (বুখারি, হাদিস : ২৬৯৭; মুসলিম, হাদিস : ১৭১৮)

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers