বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ , ৩ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

দেশ

সরকারি খাল দখল করে মাছের ঘের, ঘেরের পানিতে মানবেতর জীবন

কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৬:৪৬:৩০

114
  • ছবি : নিউজজি

গোপালগঞ্জ: কোটালীপাড়া উপজেলার পুর্ণবতী ও কুরপালা গ্রামের মধ্যবর্তী সরকারি দুটি খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে পাশের বিস্তীর্ণ জমিতে মাছের ঘের তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ঘেরের পানিতে চারদিক ঘিরে থাকা বসতবাড়ি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন কৃষক আকবর শিকদার ও তার পরিবার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের মুখ বন্ধ করে দেয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই অনেকের বাড়িঘরে পানি উঠে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে গেছে খালে নৌকা চলাচল। একই সাথে সামনে বোরো মৌসুমে খালের পানি সেচকাজে ব্যবহার করা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পুর্ণবতী ও কুরপালা গ্রামের মধ্যবর্তী সরকারি দুটি খালের মুখে বাঁধ দিয়ে বিস্তীর্ণ ফসলী জমি ও দুটি খাল দখলে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে কুরপালা মৎস্য ঘের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি খলিল দাড়িয়ার নেতৃত্বে গত জুন মাসে খালের মুখে বাঁধ দেয়া হয়। এরপর থেকেই খালের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে ঘেরের পানির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে পড়েছেন কৃষক আকবর শিকদার। ঘেরের ভেতরে তার প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমির ওপর বসতবাড়ি ও পুকুর। বাড়িটির চারপাশ এখন মাছের ঘেরের পানিতে থৈ থৈ করছে। পুরো পুকুর ডুবে গেছে ঘেরের পানিতে। একদিকে পানির ঢেউয়ে প্রতিনিয়ত ভাঙছে বাড়ির চারপাশের মাটি অন্যদিকে মাছে খেয়ে ফেলছে পুকুরের পাড়গুলো। ইতোমধ্যে গাছপালাও ভেঙে পড়ছে। যেকোনো সময় বসতবাড়িটি ভেঙে ঘেরের পানিতে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

আকবর শিকদারের স্ত্রী রোজিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মাছের ঘেরের কারণে আমাদের বাড়িঘর ও গাছপালা ভেঙে যাচ্ছে। ঘের মালিকদের বারবার বলেছি, কিন্তু আমাদের বাড়িঘর রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এখন আমরা ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোথায় যাব?

আকবর শিকদারের অভিযোগ, বাড়ির চারপাশে ভাঙন ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঘের পরিচালনাকারীদের একাধিকবার অনুরোধ করেছেন তিনি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় হতাশ তিনি।

আকবর শিকদার বলেন, চারপাশে পানি আর পানি। ঢেউয়ের কারণে বাড়ির মাটি ভেঙে গাছপালা পড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এভাবে চলতে থাকলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, সেটাই বুঝতে পারছি না।

শুধু আকবর শিকদারের পরিবার নয়, খাল বন্ধ করে মাছের ঘের তৈরির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীরাও। পুর্ণবতী খালটি এলাকার অনেক মানুষের মাছ ধরার অন্যতম মাধ্যম। বছরের বিভিন্ন সময়ে খাল থেকে মাছ ধরে সংসার চালাতেন তারা। কিন্তু খাল বন্ধ করে ঘের তৈরির পর আগের মতো মাছ ধরতে পারছেন না বলে অভিযোগ তাদের।

মৎস্যজীবী কাজী হাচান ও মকিত শেখ বলেন, আমাদের কোনো ঘের নেই। খাল-বিল থেকে মাছ ধরে সংসার চালাই। খাল দুটি বন্ধ করে দেয়ার কারণে মাছ ধরার সুযোগ কমে গেছে, পাশাপাশি গোখাদ্য সংগ্রহেও সংকট দেখা দিয়েছে। এভাবে খাল বন্ধ থাকলে আমরা মাছ ধরব কোথায়?

স্থানীয়দের দাবি, সরকারি খাল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত মাছ চাষের জায়গা হতে পারে না। খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়ার ফলে শুধু মৎস্যজীবীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং কৃষি, নৌযান চলাচল ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়ছে।

অভিযোগের বিষয়ে মাছের ঘের পরিচালনাকারী খলিল দাড়িয়া বলেন, এলাকাবাসী সবাই মিলে মাছের ঘের করেছে এবং আমাকে ঘেরটি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

খালের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘেরের ভেতরে দুটি খাল রয়েছে এবং ওই খাল দুটিতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা হয়েছে। তার ভাষ্য, এভাবে খালে বাঁধ দেয়া ঠিক হয়নি। তবে এলাকাবাসী সবাই মিলে বাঁধ দিয়েছে, তাই আমার কিছু করার নেই।

খলিল দাড়িয়া আরও বলেন, শুধু এই ঘেরেই খাল দখল করে মাছ চাষ হচ্ছে এমন নয়; কোটালীপাড়ার আরও অনেক খাল দখল করে মাছের ঘের করা হয়েছে।

কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, তিনি সদ্য কোটালীপাড়া উপজেলায় যোগ দিয়েছেন। খাল দখল করে মাছের ঘের নির্মাণের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।

তিনি বলেন, সরকারি খাল বা জলাশয় কারও দখলে নেয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের কোনো বিষয় প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। মাছের ঘেরের কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, মাছ চাষের স্বার্থে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি সরকারি খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিতে পারেন? যদি খাল দুটি সরকারি জলাশয় বা জনসাধারণের ব্যবহারের জলপথ হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে মাছ চাষের সুযোগই বা কীভাবে তৈরি হলো?

আরও বড় প্রশ্ন-একটি সরকারি খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করার পরও যদি দীর্ঘদিন ধরে তা চলতে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি কোথায় ছিল?

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে খাল দুটির প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ বাঁধ অপসারণ এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হোক। একই সাথে ঘেরের পানিতে ঝুঁকিতে থাকা আকবর শিকদারের বসতবাড়ি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

নিউজজি/এসএম

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
 নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers