রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ , ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২

দেশ

দেশজ গানের মরমীশিল্পী ভাওয়াইয়া-সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ

নিউজজি প্রতিবেদক ২৭ অক্টোবর, ২০২০, ০১:১৯:০৩

  • দেশজ গানের মরমীশিল্পী ভাওয়াইয়া-সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ

ঢাকা : ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘তোরষা নদী উথাল পাতাল, কারবা চলে নাও’, কিংবা ‘প্রেম জানে না রসিক কালাচান’ -এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় ভাওয়াইয়া গানের অমরশিল্পী আব্বাস উদ্দীনআহমদ। একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আব্বাসউদ্দীনের পরিচিতি দেশজোড়া। আধুনিক গান, স্বদেশী গান, ইসলামি গান, পল্লীগীতি, উর্দুগান সবই তিনি গেয়েছেন। তবে পল্লীগীতিতে তার মৌলিকতা ও সাফল্য সবচেয়ে বেশি। তিনি তার দরদভরা সুরেলা কণ্ঠে পল্লি গানের সুর যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তা আজও অদ্বিতীয়।

যেকোনো গান মাত্র একবার শুনেই যিনি তার সুমধুর কণ্ঠের আয়ত্বে নিয়ে আসতে পারতেন, তিনি আব্বাসউদ্দীন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি প্রথম গেয়েছিলেন আব্বাস উদ্দিন আহমদ। এই গানটি এমন একটি গান যে গান না শুনলে আমাদের সংস্কৃতিতে রোজার ঈদকে ঈদই মনে হয় না। গজলেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। ‘ত্রিভূবনের প্রিয় মুহাম্মদ’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’, ইত্যাদি গান গেয়ে তিনি সমগ্র বাংলার মানুষকে মাতোয়ারা করেছিলেন। 

আমাদের দেশজ গানের মরমীশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের ১১৯তম জন্মদিন আজ। ১৯০১ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতের কুচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জাফর আলী আহমদ এবং মায়ের না বেগম লুৎফন নেসা। পেশায় তার পিতা ছিলেন একজন আইনজীবি। 

আব্বাসউদ্দীনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের এক প্রাইমারি স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই যেমনি ছিল তার গানের গলা, তেমনি পড়াশোনাতেও গভীর মনোযোগ। খুব ভালো ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯১৯ সালে তুফানগঞ্জ হাইস্কুল থেকে আব্বাসউদ্দীন ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। কিন্তু এখানে বেশিদিন থাকা হয়নি। 

সেসময় তার মন এবং স্বাস্থ্য কোনোটাই ভালো যাচ্ছিল না। তাই তিনি রাজশাহী কলেজ ছেড়ে ভর্তি হন কাছের শহর কুচবিহার কলেজে। ১৯২১ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। সেখান থেকে বিএ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে তিনি কোলকাতায় চলে যান এবং সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন।

গানের জগতে আব্বাসউদ্দীনের কোনো ওস্তাদের তালিম ছিল না। আপন প্রতিভাবলে নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি প্রথমে ছিলেন পল্লীগায়ের একজন গায়ক। যাত্রা, থিয়েটার ও স্কুল-কলেজের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। এরপর কিছু সময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর নিকট উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিখেছিলেন।

 রংপুর ও কুচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া, ক্ষীরোল চটকা গেয়ে আব্বাসউদ্দীন প্রথমে সুনাম অর্জন করেন। তারপর জারি, সারি, ভাটিয়ালি , মুর্শিদি, বিচ্ছেদী, দেহতত্ত্ব, মর্সিয়া, পালা গান ইত্যাদি গান গেয়ে জনপ্রিয় হন। তিনি তার দরদভরা সুরেলা কণ্ঠে পল্লি গানের সুর যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তা আজও অদ্বিতীয়।  

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে আব্বাসউদ্দীন আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি যে সময় গান শুরু করেন সময়টা ছিল বাংলার মুসলমান সমাজের নবজাগরণের কাল। আব্বাসউদ্দীন নবজাগরণের শিল্পী। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য মুসলমান কবি-সাহিত্যিকরা তাদের রচনা দিয়ে মুসলিম চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। 

কুচবিহারে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আব্বাসউদ্দীনের প্রথম পরিচয় ঘটে। নজরুলও খুব স্নেহ করতেন আব্বাসউদ্দীনকে। কবি সকলের কাছে আব্বাসউদ্দীনকে পরিচয় দিতেন ‘আমার ছোট ভাই’ বলে। প্রায় বিশ বছর তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহচর্যে ছিলেন। আব্বাসউদ্দীন নজরুলের অনেকগুলো গান এরই মধ্যে রেকর্ড করে ফেলেছেন। তাই তাদের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। 

তার প্রথম রেকর্ডের গান ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল মরে গো’ ও অপর পিঠে ‘স্মরণ পায়ের ওগো প্রিয়’ বাজারে বের হবার পর পরই সাড়া পড়ে যায়। আব্বাস উদ্দিন ছিলেন প্রথম মুসলিম গায়ক যিনি আসল নাম ব্যবহার করে এইচ এম ভি থেকে গানের রেকর্ড বের করতেন। রেকর্ডগুলো ছিল বাণিজ্যিকভাবে ভীষণ সফল। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের ইসলামি ভাবধারায় রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। 

আব্বাসউদ্দীন ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিপিআই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন। এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রীত্বের সময় তিনি রেকর্ডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। চল্লিশের দশকে আব্বাসউদ্দিনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন। আব্বাস পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে আব্বাসউদ্দীন আহমেদ ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সঙ্গীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন।

আব্বাসউদ্দীন আহমেদ ছিলেন একজন অভিনেতাও। তিনি মোট ৪টি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এই ৪টি সিনেমা হলো ‘বিষ্ণুমায়া’ (১৯৩২), ‘মহানিশা’ (১৯৩৬), ‘একটি কথা’ এবং ‘ঠিকাদার’(১৯৪০)। ঠিকাদার সিনেমাতে আব্বাসউদ্দীন একজন কুলির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এসব সিনেমাতে তিনি গানও করেছিলেন। তখনকার দিনে মুসলমান ব্যক্তির সিনেমা করা ছিল একটা ব্যতিক্রম ঘটনা।

আব্বাসউদ্দীনের রেকর্ড করা গানের সংখ্যা প্রায় সাতশত। তার লেখা ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ (১৯৬০) একটি মূল্যবান তথ্যসমৃদ্ধ আত্মচরিত একমাত্র গ্রন্থ। সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (১৯৮১) ভূষিত হন। 

শিল্পী আব্বাসউদ্দীন পিতা হিসেবেও ছিলেন সফল। তার বড় ছেলে ড. মোস্তফা কামাল বার এট ল’ বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতি ছিলেন। মেজো ছেলে মোস্তফা জামান আব্বাসী একজন প্রথিতযথা কণ্ঠশিল্পী ও লেখক। একমাত্র মেয়ে ফেরদৌসী রহমানের নাম কারোরই অজানা নয়। আধুনিক, খেয়াল, গজল, ভাইয়াইয়া, ঠুংরী প্রভৃতি গানে স্বনামখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের সমান দখল রয়েছে।

পল্লীগানের এই সম্রাট ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর অগণিত সঙ্গীতপ্রেমীদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে চিরবিদায় নেন। মাত্র ৫৮ বছরের সঙ্গীত কেরিয়ারে শিল্পী আব্বাসউদ্দীন যে অবদান রেখে গেছেন, তা যুগ যুগ ধরে বাঙালি স্মরণে রাখবে। 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        









copyright © 2020 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers