শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ৮ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৩ জিলহজ ১৪৪২

শিল্প-সংস্কৃতি

শুদ্ধ সঙ্গীতচর্চার অনন্য পথিকৃৎ সুবীর নন্দী

নিউজজি প্রতিবেদক ৭ মে, ২০২১, ০১:০৪:২১

  • ছবি: নিউজজি২৪

ঢাকা: বাংলা গানের অন্যতম সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী সুবীর নন্দী। তিনি আধুনিক বাংলা গানের এক কিংবদন্তী শিল্পী, সুরের বরপুত্র। কয়েক দশকে তিনি যত গান করেছেন, সেসবের অধিকাংশই পেয়েছে আকাশ-সমান জনপ্রিয়তা। সুদীর্ঘ সময় ধরে একই রকম সতেজ থাকা এই চিরসবুজ কণ্ঠশিল্পীর নিজের তুলনা নিজেই। 

আধুনিক বাংলা গানের জাগরণ পর্ব বলা হয় গত শতকের ষাটের দশককে। স্বাভাবিকভাবেই তখন আমাদের দেশে ছিল ভারতীয় বাংলা আধুনিক গানের শিল্পীদের বিস্তর প্রভাব। ঠিক তেমনি সময়ে আবির্ভাব ঘটে সুবীর নন্দীর মতো কয়েকজন গুণী শিল্পীর যারা নিজেদের সঙ্গীত প্রতিভা ও সাধনাকে কাজে লাগিয়ে সূচনা করেছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের নতুন এক অধ্যায়ের। বাংলা গানকে প্রতিষ্ঠা করেছেন গণমানুষের অন্তরীক্ষে। 

১৯ নভেম্বর কিংবদন্তী এই সঙ্গীতশিল্পীর জন্মদিন। ১৯৫৩ সালের এইদিনে সুবীর নন্দী সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার নন্দীপাড়ায় সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার নানাবাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাদেআলিশা গ্রামে। পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসক ও সঙ্গীতপ্রেমী।

আর মা পুতুল রানীও গান গাইতেন। মায়ের কাছে সঙ্গীতে হাতেখড়ি হলেও ছোটবেলা থেকেই সুবীর নন্দী ভাই-বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে। তবে তিনি লোকগানে তালিম নিয়েছেন বিদিত লাল দাসের কাছে। একক কিংবা দ্বৈত, সব ধরনের গানেই সুবীর নন্দী ছিলেন সাবলীল।

বাবার চাকরি সূত্রে তার শৈশবকাল চা বাগানেই কেটেছে। পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত ছিলেন সেখানেই। পড়াশোনার শুরুটা চা বাগানে খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি স্কুলে। পরবর্তীতে পড়াশোনার অধিকাংশ সময় তার কেটেছে হবিগঞ্জ শহরে। পড়েছেন হবিগঞ্জ গভঃ হাইস্কুলে এবং তারপর হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে। কিশোর বয়সেই তিনি সিলেট বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়ে যান, সেখানে প্রথম গান গেয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে।

প্রথমে শুধুমাত্র সিলেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৭২ সাল থেকে তার ঢাকায় আসা-যাওয়া শুরু হয়। গানের জগতে মূল ধারার সঙ্গে সুবীর নন্দীর যাত্রা শুরু হয়- ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিং-এর মধ্য দিয়ে। প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’ -এর গীত রচনা করেন মোহাম্মদ মুজাক্কের এবং সুরারোপ করেন ওস্তাদ মীর কাসেম। প্রথমদিকে নজরুলগীতি নিয়ে মনোযোগী হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ঝুঁকে পড়েন বাংলা আধুনিক গানের দিকে।

তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে আধুনিক বাংলা গানের জোয়ারের মধ্যে। তাই স্বাভাবিকভাবেই উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী পঙ্কজ মল্লিক, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, জগজিৎ সিং-দের ভক্ত ছিলেন তিনি। এদের গান শিল্পী হওয়ার ক্ষেত্রে সুবীর নন্দীকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এবং প্রভাবিত করেছে।

সুবীর নন্দীর কণ্ঠ ছুঁয়েই গ্রামের ধূলোমাখা কন্যা হয়ে উঠেছে সোনার কন্যা। তার কণ্ঠেই প্রাণ পেয়েছে ‘দিন যায় কথা থাকে’র মতো গান। কিংবা প্রেম-বিরহে কাতর মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে সুবীর নন্দীর গান। অসম্ভব গুণী এই শিল্পী গেয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী স্যাড রোমান্টিক গান।

‘আমার এ দুটি চোখ পাথরতো নয়, তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়’ কিংবা ‘কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো সেকথা তুমি যদি জানতে’ কিংবা ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে, একটি কথাই শুধু জেনেছি আমি, পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’। তিনি গেয়েছেন- ‘পাথরের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝরণা বলো...’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম’ কিংবা ‘প্রেমের নাম বেদনা সে কথা বুঝিনি আগে’। ভালোবাসার এমন আবেগঘন প্রকাশ আর কার গানে পাবে মানুষ? প্রেম যতদিন থাকবে, মানুষের মধ্যে আবেগ যতদিন থাকবে সুবীর নন্দীর কণ্ঠের আয়ু ঠিক ততদিনই।

সুবীর নন্দী শুধু গায়কই নন, ছিলেন একজন সঙ্গীত-সাধকও। কণ্ঠ নয়, আত্মা গান গায়। তা সুরশ্রাব্য হয় মনের পবিত্রতা দিয়ে সাধনা করলে। সেই কাজটি করেছেন তিনি। এক কথায়, সঙ্গীত যে একটা গভীর সাধনার ব্যাপার সেটা সুবীর নন্দীর মতো শিল্পীকে দেখলেই বোঝা যায়।  সুবীর নন্দী আধুনিক গানের স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট শৈলী নির্মাণ করেছিলেন। গভীর দরদ আর মমতা দিয়ে গান গাইতেন তিনি। সে জন্য তার গান সবার মনে সাড়া জাগায়। গানের কথা উপলব্ধি করে সুরের সাগরে ঝড় তুলতেন।   

বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাকে আসেন সুবীর। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় আজিজুর রহমান অশিক্ষিত। সেই সিনেমায় সাবিনা ইয়াসমিন আর সুবীর নন্দীর কণ্ঠে ‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’ গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ধীরে ধীরে তার কণ্ঠে রোমান্টিক আধুনিক গান ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। 

এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’, ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়া’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’, ‘কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে’, ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়’, একটা ছিল সোনার কইন্যা’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’র মত গানগুলো সুবীর নন্দীকে পৌঁছে দিয়েছে ভক্ত-শ্রোতাদের হৃদয়ে। মানুষের মুখে মুখে ভেসে বেড়াতে থাকে সুবীর নন্দীর এসব গানগুলো।  

সুদীর্ঘ কেরিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন আব্দুস সামাদ পরিচালিত সূর্যগ্রহণ চলচ্চিত্রে। 

১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম “সুবীর নন্দীর গান” ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। তিনি গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন ব্যাংকে। চলচ্চিত্রের সঙ্গীতে তার অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করেন।

তিনি মহানায়ক (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪) ও মহুয়া সুন্দরী (২০১৫) চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে পাঁচবার এই পুরস্কার লাভ করেন। সঙ্গীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালে তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া ১৯৭৭, ১৯৮৪, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে বাচসাস পুরস্কারসহ বিভিন্ন সময় প্রচুর পুরস্কার-সম্মাননা লাভ করেন গুণী এই সঙ্গীতশিল্পী। 

সুবীর নন্দীর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে– দিন যায় কথা থাকে... , হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে... , বন্ধু তোর বরাত নিয়া... , তুমি এমনই জাল... , বন্ধু হতে চেয়ে তোমার... , পাখি রে তুই... , তোমারই পরশে... , কতো যে তোমাকে... , আমার এ দুটি চোখ... , পাহাড়ের কান্না দেখে... , কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়... , নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে... ।

চলচ্চিত্রে নন্দীর গাওয়া উল্লেখযোগ্য গান হল- ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’, ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’, একটা ছিল সোনার কইন্যা’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’। 

তার প্রকাশিত প্রথম গানের অ্যালবাম সুবীর নন্দীর গান (১৯৮১)। এছাড়া তার অন্যান্য অ্যালবামগুলো হল প্রেম বলে কিছু নেই, ভালোবাসা কখনো মরে না, সুরের ভুবনে, গানের সুরে আমায় পাবে (২০১৫) প্রকাশিত হয় এবং ভক্তিমূলক প্রণামাঞ্জলী।

সুবীর নন্দী দীর্ঘদিন ফুসফুস, কিডনি ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। গত ১৪ই এপ্রিল তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। ৩০ এপ্রিল তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৫ ও ৬ই মে পরপর দুইদিন হার্ট অ্যাটাকের পর তিনি ২০১৯ সালের ৭ই মে ৬৫ বছর বয়সে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। 

সুবীর নন্দী বাংলা সঙ্গীতের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শুধু এই প্রজন্মেরই নন, তিনি তার প্রজন্মেরও অনেক শিল্পীর অনুপ্রেরণা। যতদিন বাংলা গানের সৌন্দর্য নিয়ে কথা হবে, ততদিন সুবীর নন্দী থাকবেন স্বকীয় অবদানের জন্য বেঁচে থাকবেন সঙ্গীতপ্রেমী বাঙালির মাঝে। তার সুর ও কণ্ঠ তো কখনও হারিয়ে যাবার নয়। কালজয়ী এই সুর-কণ্ঠ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যাবে প্রেরণার বাণী নিয়ে। পরপারে ভালো থাকুন প্রিয়শিল্পী সুবীর নন্দী।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers