শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ৮ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৩ জিলহজ ১৪৪২

শিল্প-সংস্কৃতি

রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী জাহেদুর রহিমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিউজজি ডেস্ক ১৮ জুন, ২০২১, ১২:১৮:২২

  • রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী জাহেদুর রহিমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ঢাকা: আলোকিত এক শিল্পীর নাম জাহেদুর রহিম। আমাদের আলোকিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন ছিলেন তিনি। আমাদের প্রাণের প্রিয় জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’র চরণ স্মরণে এলেই কবিগুরু রবি ঠাকুরের পাশপাশি আমার মনে ভাসে যে প্রিয় মুখখানি, তিনিই আসলে শিল্পী জাহেদুর রহিম।  

রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী জাহেদুর রহিমের (জন্ম : ১৯৩৫-প্রয়াণ : ১৮ জুন, ১৯৭৮) জন্ম বগুড়া শহরে হলেও তার পৈতৃক নিবাস বৃহত্তর পাবনা জেলার (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ) শাহজাদপুর থানার লোচনাপাড়া গ্রামে। পরে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করেন। তার পিতার নাম আবদুর রহিম। জাহেদুর রহিমের ডাক নাম বাবু। তিনি ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তার সঙ্গীত শিক্ষার শুরু আতিকুল ইসলামের নিকট বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। তার অসাধারণ ভরাট গলা এবং সঙ্গীতে দক্ষতার জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। সে সময় তার বন্ধুমহল গানের জন্য তাকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলতো।

পেশাগত জীবনে তিনি প্রথমে ফিলিপস কোম্পানি এবং পরে শিক্ষা বিভাগে চাকরি করেন। কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ায় শেষ পর্যন্তু তিনি সঙ্গীত জগতেই প্রবেশ করেন। ১৯৬১ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে তিনি একাডেমীতেই শিক্ষকতা করেন এবং রবীন্দ্রনাথের শ্যামা ও চন্ডালিকা নৃত্যনাট্যে কণ্ঠ সঙ্গীতে অংশ নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ছায়ানট, অগ্নিবীণা, মূর্ছনা, আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত নিকেতন, নজরুল পরিষদ প্রভৃতি সঙ্গীত বিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রে সঙ্গীত প্রযোজক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘নিজস্ব শিল্পী’ হিসেবে চাকরি করেন। ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন জেনারেল জিয়ার সামরিক সরকার তাকে উক্ত পদ থেকে অবৈধভাবে বরখাস্ত করে। 

জাহেদুর রহিম ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। ষাটের দশকে যখন পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তখন যে ক’জন নির্ভীক রবীন্দ্রভক্ত এর বিরোধিতা করেন, জাহেদুর রহিম তাঁদের অন্যতম। সরকারের ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে সভা-সমিতি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করে তিনি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। ষাটের দশকের শুরুতেই পাকিস্তানি সামরিক সরকার রবীন্দ্রনাথের গানের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করলেও তিনি বিভিন্ন জমায়েতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, মিছিলে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন নির্ভয়ে, পাকিস্তান সরকারের হুমকি উপেক্ষা করে। সে সময় রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’কে তিনি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করে তোলেন। রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্য দিয়ে ষাটের দশকে বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদের মধ্যে জাহিদুর রহিম-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

দরাজ কণ্ঠের অধিকারী জাহেদুর রহিম অতি অল্পকালের মধ্যেই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রথম রেকর্ড বের হয়। তিনি ছায়ানট প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন। ভারতে অনুষ্ঠিত বঙ্গ সংস্কৃতি মেলায় তিনি বহুবার অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি রাশিয়া ও ভারত সফর করেন। রেডিও ও টেলিভিশনে তিনি নিয়মিত রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করতেন। 

উদীচী’র সাথেও জাহেদুর রহিম গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। আমরা জানি, বাংলাদেশে উদীচী শুধুই একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়। উদীচী একটি আন্দোলন। উদীচী কেবল সংস্কৃতিচর্চা করে না, গণমানুষের সংস্কৃতিচর্চার পথও নির্দেশ করে। গণনাট্য আন্দালনের সময় যেমন ব্যাপক সংখ্যক বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, বাংলাদেশের উদীচীর ক্ষেত্রেও কতক পরিমাণে সেটাই সম্ভব হয়েছে। প্রথম থেকেই এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন বা সহায়তা করেন আবুল ফজল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শেখ লুৎফর রহমান, আনিসুজ্জামান, সনজিদা খাতুন, সুখেন্দু চক্রবর্তী, আলতাফ মাহমুদ, জাহেদুর রহিম, আব্দুল লতিফ, জহির রায়হান, অজিত রায়, জিতেন ঘোষ, জ্ঞান চক্রবর্তী, অনিমা সিংহ, হাসান ইমাম ও পান্না কায়সার প্রমুখ।

জাহেদুর রহিমের কথা বলতে গেলে আবশ্যিকভাবে চলে আসে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’-এর প্রতিষ্ঠার ইতিকথাও। কারণ জাহেদুর রহিম ছিলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। আমরা জানি, সংস্কৃতিচর্চায় দেশীয় ঐতিহ্য ও প্রকৃতিমুখী হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময়ে রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী পালন করার ঐকান্তিক ইচ্ছায় পাকিস্তানি শাসনের প্রতিকূল পরিবেশে কিছু বাঙালি একত্র হয়েছিলেন নিজেদের সংস্কৃতির প্রধান ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষপূর্তির উৎসব করার জন্যে। তমসাচ্ছন্ন পাকিস্তানি যুগে কঠোর সামরিক শাসনে পদানত স্বদেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্রভাবনা অবলম্বন করে ছায়ানট যাত্রা শুরু করে। বিশ্বে শতবার্ষিকীর আয়োজন বাংলার এ-প্রান্তের সংস্কৃতি-সচেতন মানুষের মনেও চাঞ্চল্য জাগায়। সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস এনে দেয় রবীন্দ্রশতবার্ষিকীর সফল উদ্যোগ। বহু অনুপ্রাণিত কর্মী সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাবার লক্ষ্যে একটি সমিতি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। ছায়ানট সে উদ্যোগের ফল। সঙ্গীতকে অবলম্বন করেই বাঙালির সংস্কৃতি সাধনার সমগ্রতাকে বরণ ও বিকশিত করতে উদ্যোগী হয় ছায়ানট। সঙ্গীত শিক্ষাদান কার্যক্রমের সুবাদে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কীর্তিমান গুণী শিল্পীরা সমবেত হন ছায়ানটে; পর্যায়ক্রমে বিকশিত করতে থাকেন অগণিত নবীন প্রতিভা। বাঙালির শাশ্বত সংস্কৃতিরূপ প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় নিয়ে ছায়ানট পরিবেশিত অনুষ্ঠানমালা জাতির প্রাণে জাগায় নতুন উদ্দীপনা, সঙ্গীত-সংস্কৃতির চর্চাসূত্রে জাতিসত্তার চেতনা বলবান হতে থাকে। ছায়ানটের উদ্যোগে জাতির শৈল্পিক ও মননশীল মেধার সম্মিলন ও অনুশীলন জাতিকে যোগায় বিকাশের বিবিধ অবলম্বন। সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির পথপরিক্রমণের গৌরবের অংশ ছায়ানট। স্বাধীনতার পর সংস্কৃতি ও সঙ্গীতচর্চাকে আরও ব্যাপক ও নিবিড় করে তোলার সৃষ্টিশীল সাধনায় নিমগ্ন রয়েছে ছায়ানট। জাহেদুর রহিমের স্মৃতিকে বুকে নিয়ে তাই ছায়ানট আমাদের কাছে হয়ে ওঠে এক শিল্প সাধকের স্বপ্নময় অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

উন্নয়ন ও মিডিয়াকর্মী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর শিল্পী জাহেদুর রহমানকে নিয়ে লিখেছিলেন আবেগময় কিছু কথা। সেখান থেকে কিছু অংশ পাঠ করলে শিল্পীকে বুঝতে, জানতে বিশেষ সহযোগিতা করবে বলেই বিশ্বাস। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর লিখেছেন, ‘এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গন জাহিদুর রহিমকে প্রায় ভুলেই গেছে। অথচ ষাট ও সত্তর এর দশকে ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জাহিদুর রহিম ছিলেন এক অনন্য নাম। তার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া ঢাকার কোনো রুচিসম্পন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কল্পনাই করা যেত না। বিশেষ করে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় সম্মেলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, সংস্কৃতি সংসদ, আবাসিক হল, বিভিন্ন জেলায় ছাত্র সম্মেলন, প্রেসক্লাবের অনুষ্ঠান, ২৫ বৈশাখ, ২২ শ্রাবণ, বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এমন কোনো মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান হতো না যেখানে জাহিদুর রহিম রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেননি। তার ভরাট, উদাত্ত গলা এখনও অনেকের স্মৃতিতে অনুরণন তোলে। দীর্ঘদেহী জাহিদুর রহিমের সর্বদা বিশেষ পোশাক (সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি), তার ব্যক্তিত্ব, মৃদুভাষা, ভরাট কণ্ঠ সবই সংস্কৃতিমনা যে কোনো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। তখন ঢাকায় টেলিভিশন এত রমরমা ব্যাপার ছিল না। ডিআইটির (বর্তমান রাউজক ভবন) ক্ষুদ্র পরিসরে ততোধিক ছোট স্টুডিও থেকে মাসে মাত্র কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান পরিবেশিত হতো। সামগ্রিক টিভি অনুষ্ঠান প্রচারের সময়সীমাও ছিল কম। তাই টিভির মাধ্যমে জাহিদুর রহিমের তেমন প্রচার ঘটেনি। যতটা ঘটেছিল মঞ্চে। তবে প্রায়ই জাহিদুর রহিমের ভরাট কণ্ঠ শোনা যেত রেডিওতে। তখন রেডিও ছিল জনপ্রিয় গণমাধ্যম। রেডিওতে অনেক রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্প্রচার হতো। রবীন্দ্রসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করার পেছনে রেডিওর অবদানের কথা এখন কেউ স্মরণ করে না।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের মতে, ‘মঞ্চে ও বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে জাহিদুর রহিম ও আরও কয়েকজন শিল্পী-শ্রোতার মন জয় করে নিয়েছিলেন। ১৯৬৫-১৯৭০ এই সময়কাল আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছিল নানা প্রতিকূলতা। এ প্রজন্মের অনেকে এ কাহিনি জানে না। পাকিস্তান সরকার এক পর্যায়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত বেতারে ও টিভিতে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল (রবীন্দ্রনাথ হিন্দু বা ভারতীয় লেখক এই অভিযোগে)। তখন আবদুল আহাদ, কলিম শরাফী, ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, অজিত রায়, আতিকুল ইসলাম, ফজলে নিযামী, জাহিদুর রহিম ও আরও অনেকে অনেকটা প্রতিবাদী ভূমিকা হিসেবে মঞ্চে ব্যাপকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। মঞ্চস্থ করেছেন রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য। অনেক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিসেবী, সাংবাদিক বাফা, ছায়ানট, ঐক্যতান ইত্যাদি সংগঠনের ব্যানারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পাকিস্তান সরকারের বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী ভূমিকার সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি সে সময় প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে দরাজ গলায় গাইতেন জাহিদুর রহিম। সেই স্মৃতি ভোলার নয়। ১৯৭৮ সালে জাহিদুর রহিম অকালে, প্রায় আকস্মিকভাবেই মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার অনুরাগীরা (বিশেষ করে ছায়ানট), দেশব্যাপী যে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতার (কিশোর, তরুণদের মধ্যে) আয়োজন শুরু করেছিল তার নাম ছিল : ‘জাহিদুর রহিম স্মৃতি পরিষদ’। এক বছর এ নামেই এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিন্তু পরে এ নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ হয় ‘জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ’। কিন্তু প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের এখনও ‘জাহিদুর রহিম স্মৃতি পদক’ই দেয়া হয়ে থাকে। এ পদকের বাইরে আনুষ্ঠানিকভাবে জাহিদুর রহিমকে আর স্মরণ করা হয় না। সংস্কৃতি জগতের অনেক দিকপালই এখন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের বাইরে তাদের তেমন কেউ স্মরণ করে না। ব্যতিক্রম খুব কম।’

‘আমার সোনার বাংলা’ যেভাবে জাতীয় সংগীত হলো’ রচনায় মুহম্মদ সবুর জানাচ্ছেন, ‘সত্তর সালের গোড়ায় বঙ্গবন্ধু জাহিদুর রহিমকে দায়িত্ব দেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের রেকর্ড প্রকাশের জন্য। কলিম শরাফী তখন ই এম আই গ্রামোফোন কোম্পানির ঢাকার কর্ণধার। ১৯৬৯ ও ৭০ সালের মধ্যে এই কোম্পানি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের দুইশ’ গান রেকর্ডে ধারণ করে। প্রথম ১২টি গানের একটা গুচ্ছ গেয়েছিলেন সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, রাখী চক্রবর্তী, আফসারি খানম, বিলকিস নাসিরউদ্দিন ও কলিম শরাফী। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের রেকর্ড প্রকাশে ছায়ানটের শিল্পীরাও এগিয়ে আসেন। কলিম শরাফীর ব্যবস্থাপনায়, আবদুল আহাদের পরিচালনায়, সনজীদা খাতুনের বাসায় তারই যত্ম-আত্তিতে খাটুনিতে তৈরি হয় গানটি। সম্মিলিত কণ্ঠে ছিলেন, জাহিদুর রহিম, অজিত রায়, ইকবাল আহমদ, ফাহমিদা খাতুন, জাহানারা ইসলাম, হামিদা আতিক ও নাসরীন আহমদ প্রমুখ। সর্বত্র বাজতে থাকে এই রেকর্ড। অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকালে বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের কণ্ঠে এই গান ধ্বনিত হতো। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিল্পী কলিম শরাফী রমনা রেসকোর্সে লাখো লাখো জনতার উপস্থিতিতে সোনার বাংলাসহ রবীন্দ্রসংগীতের এক সেট গানের রেকর্ড উপহার দিয়েছিলেন সাড়ে সাতকোটি মানুষের বিজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে।’

মুহম্মদ সবুর ‘আমার সোনার বাংলা’ যেভাবে জাতীয় সংগীত হলো ’ রচনায় দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আরো লিখছেন, ‘দু’টি শক্তি এখানে মুখোমুখি। একটি শক্তি সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ হিংসার দর্শন দ্বারা পরিচালিত। অপরটি ভাষা আন্দোলনের পধ ধরে যে অসাম্প্রদায়িক, মননশীল, উদার মানবিকতার বিকাশ ঘটেছে তার পক্ষে। যদিও বাংলাদেশের অভ্যূদয় হয়েছে ধর্মীয় জাতীয়তাবোধকে বর্জন করে। বাংলাদেশে প্রকাশ্য রবীন্দ্রবিরোধিতা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর। সেই সঙ্গে বিতর্কিত করা হয় বাঙালি জাতীয়তাবোধকে। বঙ্গবন্ধুর জনসভার বাঁধা গায়ক শুধু নয়, জাহিদুর রহিম ছিলেন এদেশের প্রাগ্রসর শিল্পী। স্বাধীনতার পর স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে বাংলাদেশ বেতারে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বরে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ‘অপমানের দাহ তার পক্ষে দুঃসহ হলো’। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন ষাটের দশক থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গায়ক জাহিদুর রহিম। যাকে বঙ্গবন্ধু ডাকতেন ‘বাবু’ নামে। আমাদেরও জানা ছিল, তাই ‘বাবুভাই’ সম্বোধন পেতেন।’ 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers