শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ৮ শ্রাবণ ১৪২৮ , ১৩ জিলহজ ১৪৪২

শিল্প-সংস্কৃতি

নাট্যকার ও চিন্তানায়ক জাঁ পল সার্ত্রের জন্মদিন আজ

নিউজজি ডেস্ক ২১ জুন, ২০২১, ১৭:১৪:৫২

  • নাট্যকার ও চিন্তানায়ক জাঁ পল সার্ত্রের জন্মদিন আজ

ঢাকা: ফরাসি অস্তিত্ববাদের কথা প্রথম যিনি বলেন, তিনি জাঁ পল সার্ত্রে। এ অস্তিত্ববাদ নান্দনিক বিষয়কে প্রাধান্য দেয়। সার্ত্রে সামাজিক সংস্কারবঞ্চিত লোক। তিনি প্রথম জীবনে হাইডেগারের অনুসারী হতে চেয়েছিলেন। সামাজিক সমস্যা সমাধানে তাঁর কথা হলো মানুষের সত্তা বা অধিবিদ্যক ধারণার আদতে কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ তা মানুষের জীবনে পরিপূর্ণভাবে সুখ দেয় না।
 
মানুষের জন্য দরকার নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করা। অস্তিত্ব স্বীকার হলেই মানুষের জীবনে সত্য অর্জিত হয়। কারণ মানুষ সব সময়ই মূলত স্বাধীন। স্বাধীনতাই মানুষকে সাহায্য করে সবকিছুকে চিনতে, ভাবতে ও অর্জন করতে।
 
সার্ত্রে তার নানা সাহিত্যকর্মে, উপন্যাসে দেখিয়েছেন একটি সমগ্রের বিবেচনাহীনতার কাছে ব্যক্তিমানুষ কতই না অসহায়! তিনি মনে করেন, এই মানবতাবাদ পৃথিবীতে অস্তিত্বশীল মানুষের জন্য হতে পারে চূড়ান্ত মানবতার। ব্যক্তি যদি তার অস্তিত্ব বিষয়ে সচেতন থাকে, তবে তাকে শোষণ করা সহজ নয়।
 
অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, চিন্তানায়ক এই মানুষটির জন্ম ফ্রান্সের প্যারিস শহরে, ১৯০৫ সালের ২১ জুন। ফরাসি নৌবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন তাঁর বাবা জ্যঁ ব্যাবিস্টে সার্ত্রে। যদিও সার্ত্রের ১৫ মাস বয়সে মারা যাওয়া এই বাবা সম্পর্কে কখনোই উল্লেখ করার মতো কিছু আসেনি সার্ত্রের লেখায়।
 
অন্যদিকে ১৯৫২ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী আলবার্ট সোয়াইৎজারের ভাইয়ের মেয়ে আনেমারি তাঁর মা। শৈশবে একটি বড় সময় কেটেছে যাদের সঙ্গে সেই মা এনি ম্যারি এবং নানা চার্লস শোয়েটজারের প্রভাবকেই জীবনে বড় বলে মেনেছেন সার্ত্রে।
 
যদিও সার্ত্রের বয়স যখন নয় বছর, তখন দ্বিতীয় বিয়ের কারণে মায়ের সঙ্গেও খানিকটা দূরত্ব বাড়ে সার্ত্রের। সেই সঙ্গে আশৈশব স্কুল ও কলেজের মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত সার্ত্রের আচরণে অনিশ্চয়তা এবং জেদের বিষয়গুলোও স্পষ্ট হতে থাকে।
 
জ্যঁ পল সার্ত্রের জীবন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। একদিকে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির তেমন তোয়াক্কা করেননি। অপরদিকে যখন যা ঠিক বলে মনে করেছেন তাই-ই অকপটে ব্যক্ত করেছেন। তাঁর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের ওপর আলোকপাত করে পাওয়া যায় তাঁর জীবনের বিশাল ব্যাপ্তি ও পরিধির সন্ধান।
 
জ্যঁ পল সার্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় প্যারিস শহরের লিসে দ্য ল’ রোসেইয়া এবং লিসে লেগ্রাঁদ স্কুলে। এরপর দর্শনশাস্ত্র পড়ার জন্য ভর্তি হন ইকোলে নরমালে সুপিরিউর কোর্সে। সাফল্যের সঙ্গে কোর্স সমাপ্ত করে হাভ্র, লাঁও এবং নয়নিতে উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
 
মূলত কৈশোরের মাঝামাঝি সময় থেকেই দর্শনের প্রতি আগ্রহ অনুভব করতে থাকেন সার্ত্রে। স্বীয় আগ্রহ আর কৌতূহল থেকে প্যারিসের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একোলি নরমাল সুপেরিয়ের থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রিও অর্জন করেন তিনি।
 
এ ছাড়া ফ্রান্স ও বিশ্বের খ্যাতনামা একাধিক দার্শনিকের সংস্পর্শেও ক্রমে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে থাকেন সার্ত্রে। সেই সঙ্গে চলতে থাকে কান্ট, হেগেল ও হেইডেগারের মতো দার্শনিকদের তত্ত্ব থেকে ধারণা লাভের প্রক্রিয়াটিও।
 
এরই মাঝে ১৯২৯ সালে সার্ত্রের পরিচয় ঘটে সেই সময়কার আরেক আলোচিত লেখিকা সিমন দ্য ব্যুভেয়ারের সঙ্গে, যাঁর সঙ্গে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত একটি চমৎকার সম্পর্ক বজায় ছিল তাঁর।
 
এরপর সার্ত্র ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর মিসর, গ্রিস, ইতালি ও জার্মানি ঘুরে বেড়ান। প্রাচীন সভ্যতার এসব নগরী ঘুরে তিনি দার্শনিক জিজ্ঞাসার বিভিন্ন তথ্য, উপাত্তের সন্ধানে ব্যাপৃত থাকেন।
 
১৯৩১ সালে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে লা হার্ভেতে যোগ দেন সার্ত্রে। আর এর ঠিক পরের বছরেই বৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে দর্শনশাস্ত্রের ওপর উচ্চতর পড়াশোনা করতে যান তিনি। এ সময় সমকালীন ইউরোপের অনেক বড় মাপের দার্শনিকদের সঙ্গেও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে ওঠে তাঁর।
 
যদিও সার্ত্রের জীবন ও কর্মের ওপর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এ সময় ফরাসি সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে একজন ‘মেটেরোলজিস্ট’ হিসেবে প্রত্যক্ষভাবেই যুদ্ধে জড়িয়ে যান তিনি।
 
তাঁর দার্শনিকতা ও জীবন জিজ্ঞাসা আরো ব্যাপক আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। ফলে একদিকে তিনি ১৯৩৫ সালে প্যারিসের লিসে কঁদরসে শিক্ষকতা শুরু করেন, অন্যদিকে এডমুন্ড হুসরল ও মার্টিন হাইত্তোগারের কাছে দর্শনশাস্ত্র পাঠ করতে থাকেন। এভাবেই চলতে থাকে তাঁর দর্শনচর্চা।
 
কিন্তু এর মধ্যে বেজে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। এ সময় তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। নাৎসিদের হাতে বন্দিও হন তিনি। জার্মানদের হাতে যুদ্ধবন্দি থাকা অবস্থাতেই রচনা করেন তাঁর প্রথম নাটক। যদিও অসুস্থতার কারণে বন্দি হওয়ার বছরখানেক পরেই সার্ত্রেকে মুক্তি দেয় নাৎসি বাহিনী।
 
তবে যুদ্ধ এবং যুদ্ধ চলাকালে তাঁর পর্যবেক্ষিত বাস্তবতা গভীর ছাপ ফেলে যায় নিজের জীবন ও দর্শনে। এ সময় প্যারিসে ফিরে স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপেও (নাৎসিবিরোধী দলে) নিজেকে সম্পৃক্ত করেন সার্ত্রে।
 
সেই সঙ্গে ক্রমান্বয়ে বেগবান হতে থাকে সার্ত্রের স্বতন্ত্র লেখনীও। বিশেষ করে ১৯৪৪ সালে প্যারিসে যুদ্ধাবসানের সময়ে জোরদার লেখনী দিয়ে ক্রমেই তাঁর দার্শনিক চিন্তাধারার সঙ্গে অন্যদের পরিচয় করিয়ে দেন সার্ত্রে।
 
এরপর তিনি আমেরিকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেন। তাঁর এসব বক্তৃতা খুবই প্রশংসিত হয় এবং তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই পাশ্চাত্য জগতের এ দার্শনিক চিন্তানায়ক সারা বিশ্বে খ্যাতির শিখরে আরোহণ করেন।
 
মার্কসবাদ ঘেঁষা তাঁর দার্শনিক মতবাদ তাঁর মনোভঙ্গিও তদানুরূপ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ল ত্রে এত্ল্য নিয়াত’ বা ‘বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালে।
 
এরপর তাঁর নিজস্ব দার্শনিক মতবাদ ‘লেস্ শেমিনস্ দ্য লা লিবার্তে’ তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত। সার্ত্রের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ ‘ক্রিতিক দ্য লা রেসঁ দিয়া লেক্তিক’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৭১ সালে তাঁর আত্মজীবনী ‘ফ্লরেয়ার’ প্রকাশিত হলে সারা বিশ্বে বিস্ময়কর আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
 
ব্যক্তিজীবনে সমাজতান্ত্রিক কোনো দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলেও নানা সময়ে তাঁর লেখনীতে খুঁজে পাওয়া যায় এ ধারার প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি। এ ছাড়া নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বিশ্বাস ও স্পষ্ট ভাষণের কারণে নানা সময়ে বহু সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে সার্ত্রেকে।
 
এমনকি আলজেরিয়ায় ফরাসি আগ্রাসন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধেরও কট্টর সমালোচক ছিলেন সার্ত্রে। অন্যদিকে নানা সময়ে সার্ত্রের যে লেখনীগুলো তাঁকে বিশ্বদরবারে স্বতন্ত্র পরিচিতি এনে দিয়েছে- এর মধ্যে রয়েছে ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত সার্ত্রের প্রথম উপন্যাস ‘লা নাজি’, ‘দ্য মুর’, ‘ব্যারিওনা’ (প্রথম নাটক), ‘দ্য ফ্লাইজ’, ‘নো এক্সিট’, ‘দ্য এজ অব রিজন’, ‘দ্য রেসপেক্টফুল প্রস্টিটিউট’, ‘দ্য ভিক্টরস’, ‘দ্য চিপস্ আর ডাউন’, ‘ইন দ্য ম্যাস’, ‘ডার্টি হ্যান্ডস’, ‘ট্রাবলড পি’, ‘দ্য ডেভিল অ্যান্ড দ্য গুড লর্ড’, ‘কিন’, ‘দ্য কনডেমড অব আলটোনা’, ‘দ্য ট্রোজান ওম্যান’, ‘দ্য ফ্রড সিনারিও’ প্রভৃতি।
 
মূলত উল্লিখিত সবগুলোই ছিল সার্ত্রের লেখা উপন্যাস, নাটক ও ছোটগল্পের তালিকা। আর এসবের বাইরে দার্শনিক যেসব প্রবন্ধ ও সমালোচনা দিয়ে সার্ত্রে বিশ্ববাসীর নজর কাড়েন, তার মধ্যে রয়েছে ‘ইমাজিনেশন : এ সাইকোলজিক্যাল ক্রিটিক’, ‘দ্য ট্রানসেন্ডেন্স অব দ্য ইগো’, ‘স্কেচ ফর এ থিওরি অব দ্য ইমোশন্স’, ‘দি ইমেজিনারি’, ‘বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস’, ‘এক্সিসটেনসিয়ালিজম ইজ এ হিউম্যানিজম’, ‘সার্চ ফর এ মেথড’, ‘ক্রিটিক অব ডায়ালেকটিক্যাল রিজন’, ‘এন্টি সেমাইট অ্যান্ড জিউ’, ‘বদলেয়ার’, সিচুয়েশন সিরিজ (ওয়ান টু টেন), ‘ব্ল্যাক অরফিউজ’, ‘দ্য হেনরি মার্টিন অ্যাফেয়ার’ প্রভৃতি।
 
এ ছাড়া সার্ত্রের লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সার্ত্রে বাই হিমসেল্ফ’, ‘দ্য ওয়ার্ডস’, ‘উইটনেস টু মাই লাইফ কোয়াইট মোমেন্টস ইন এ ওয়ার’ এবং ‘ওয়ার ডায়েরিস’।
 
ব্যক্তি মানুষের হয়ে কলম ধরার কারণে বহুবারই পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন সার্ত্রে। এমনকি তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছে বেশ কয়েকবার।
 
আগেই বলা হয়েছে, জঁ-পল সার্ত্রে ছিলেন প্রথাবিরোধী লোক। তিনি বিয়ে করেননি, বিখ্যাত ফরাসি নারীবাদী লেখিকা সিমন দ্য ব্যুভেয়ারের সঙ্গে বসবাস করেছেন আজীবন। সার্ত্রে ও বান্ধবী ব্যুভেয়ার  মিলে ‘লেস ভেজপস মোদারনেস’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করতেন।
 
এ পত্রিকাটি সে সময় দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। সার্ত্রের বহুমুখী সাহিত্য প্রতিভার জন্য ১৯৬৪ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বেঁকে বসেন সার্ত্রে। যথাসময়ে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়নি। এই অভিযোগ তুলে তিনি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ঘোষণা দেন, প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পুরস্কারের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই।
 
এই মন্তব্য করার পর সার্ত্রে ঘোষণা দেন, ‘আমার কোনো পুরস্কারের দরকার নেই।’ প্রত্যাখ্যান করেন নোবেল পুরস্কার। এমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা। অবশেষে ফুসফুস সংক্রান্ত জটিলতা এবং শারীরিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ১৯৮০ সালের ১৫ এপ্রিল ৭৪ বছর বয়সে জন্মস্থান প্যারিসেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান দার্শনিক, চিন্তানায়ক।

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers