সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ , ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

শিল্প-সংস্কৃতি

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আমাদের মধুকণ্ঠ চেনালেন

লুৎফর হাসান  ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১২:২২:৩২

127
  • হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আমাদের মধুকণ্ঠ চেনালেন

হেমন্তের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ট্রেনে। বিস্তৃত যমুনার চর পেরিয়ে কাশবনের পাশ ঘেঁষে পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম সিরাজগঞ্জ। ভুয়াপুরের মাটিকাটা ট্রলার ঘাট থেকে সেই উনিশশ আটানব্বই সালে। প্রখর রোদ মাড়িয়ে আমরা পৌঁছলাম সন্ধ্যায়। রাতের ট্রেনে আমাদের গন্তব্য রাজশাহী। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের প্রাক-প্রাথমিক জীবন। তখনও যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর উদ্বোধন হয়নি। ট্রেনে উঠলাম তাই সিরাজগঞ্জ থেকে। ট্রেন ছাড়তেই এটা ওটা ঘোষণা। তারপর বিমর্ষ চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে কু ঝিকঝিক। বেজে উঠলো গান ‘পথের ক্লান্তি ভুলে, স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো, বলো কবে শীতল হবো, কতদূর আর কতদূর বলো মা’। তখন আমাদের মাকে ছেড়ে বহুদূর যাবার নতুন পর্বের সূচনা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এই গান সেদিন বুকের মধ্যে গিয়ে কোথায় যে লাগলো, ব্যথাটা স্থায়ী হয়ে গেছে। গানটা এখনও আমাদের সঙ্গী। 

উনিশশ আটানব্বইয়ের তেইশ জুন যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর উদ্বোধন করলেন সেসময়ের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কয়েক দিন পর আমাদের নতুন যাত্রা। এবারের পথ অন্যদিকে। এদিকেই উঠলাম ট্রেনে। ট্রেন ছাড়তেই ধু ধু মাঠ পেরিয়ে যখনই সেতুর কাছাকাছি, জানালায় তখন বিস্তৃত যমুনা। বুকের মধ্যে কেমন এক গভীর শূন্যতা। হেমন্ত গাইছেন ‘ও নদী রে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’। তারপর পুরো সাড়ে ছয় বছর কতবার যে এই নদী পার হয়ে ট্রেনে আমাদের যাওয়া আসা আর প্রতিবার এখানে আসতেই হেমন্তের এই গান। আমাদের জীবনের এক নিয়মিত আয়োজন যেন তা। আজ এত বছর পর কোথাও যদি দেখি এই গান বাজছে, কেমন নস্টালজিয়ায় বিপন্ন হয়ে যাই। 

নস্টালজিয়ার থিমসং নির্বাচন করতে গেলে যে গানটা চলে আসে সামনের দিকে সেটাও তো হেমন্তের মধুকণ্ঠেই গাওয়া ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে’। এই গান বেজে উঠলে আমাদের মধ্যবয়সী মানুষগুলোর কষ্ট বেড়ে যায় কয়েকগুণ। রঙিন জীবন যে আমাদের কাছে নিকট অতীত, যা কিছুতে ডুবে ছিলাম যেন এখনও তার স্বাদ লেগে আছে, কিন্তু নতুন করে উঁকি দেবারও সুযোগ নেই। সেই জীবনের কথা ভাবতে গেলেই বারবার প্রতিবার গুনগুন ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে’। 

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন এক গান। তাতে হেমন্তের সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছিলেন শ্রাবন্তী মজুমদার। সেই এক গান যেন প্রতিদিন কোথাও না কোথাও আমাদের মতো কন্যা সন্তানের বাবারা গুনগুন করছেই। আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়। এই চিরকালীন আবেদন, এমন পবিত্র ভালোবাসার গান আর দুইটিও কি আছে জগতে? আয় খুকু আয় – যেন শুধু গান নয়, এ যেন ছোট মেয়ের দিকে বাবার দূর্বার ছুটে যাওয়া, এ যেন বুড়ো বাবার ধূসর চোখের দিকে তাকিয়ে মেয়ের কেঁপে ওঠা। হেমন্ত কোথাও কোথাও চিরস্থায়ী হয়ে গেছেন। 

এই পথ যদি না শেষ হয় কিংবা এই রাত তোমার, এমন গানে প্রেম ভালোবাসা কতখানি উজ্জ্বল, তা কেবল জানে প্রতিটা বাঙালি প্রেমিক আর প্রেমিকা। ভালোবাসি শব্দের উচ্চারণের পর দুজনেই একা একা এরকম এক রাতের আশায় থাকে, যখন কেউ একজন কাঁধে মাথা রেখে গাইবে ‘এই রাত তোমার আমার’। যেন দুজন মিলে কোথাও ঘুরতে যাবে আর ফেরার পথে গাইবে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রতিটা প্রেমিক প্রেমিকার জীবনে প্রতিদিন অবদান রেখে যাচ্ছেন আড়ালে-অজান্তে। 

আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে – এরকম গান ভীষণ সত্য হয়ে যায় আমাদের বিচ্ছেদের কালে। হেমন্ত যেন আশ্রয় হয়ে ওঠেন পরিস্থিতি মেনে নেয়া ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার দুই পাগলপ্রাণ প্রেমিক প্রেমিকার জন্য। তারপর আসে একার জীবন, কিছুই থাকে ভাববার। আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই একলাটি এক রাত আর হেমন্তের সেই গান- আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা, আর কতকাল আমি রব দিশাহারা। জীবন কেটে যায়, আসে বোধ। তখনও যেন হেমন্ত আমাদের কণ্ঠের সারথী- বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও, মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও। 

উনিশশ ঊননব্বই সালের ছাব্বিশ সেপ্টেম্বর তিনি চলে গেছেন পরপারে, তাঁর সেই সুমধুর গানের মতো সুন্দর প্রস্থানে – আমিও পথের মতো হারিয়ে যাব, আমিও নদীর মতো আসব না ফিরে, আর আসব না ফিরে কোনোদিন। আমিও দিনের মতো ফুরিয়ে যাব, আসব না ফিরে, আর আসব না ফিরে কোনোদিন।   

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers