সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ , ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

শিল্প-সংস্কৃতি

নুসরাত ফতেহ আলি খান: কিং অব কাওয়ালি কিংবা সঙ্গীতের ওস্তাদ

নিউজজি প্রতিবেদক ১৩ অক্টোবর, ২০২১, ১২:১৬:৩০

63
  • নুসরাত ফতেহ আলি খান: কিং অব কাওয়ালি কিংবা সঙ্গীতের ওস্তাদ

তিনি এমন পরিবারের সন্তান, যারা দীর্ঘ ছয় শতাধিক বছর ধরে কাওয়ালি গানের চর্চা করে এসেছেন। কিন্তু কাওয়ালি সঙ্গীতের ধারাটিকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের কেউই সেভাবে সাফল্য পাননি। কেবল স্থানীয় পর্যায়েই পরিচিত ছিলেন তারা।

যিনি পরিবারের ঐতিহ্যকে নিয়ে গেলেন বিশ্ব দরবারে; রক, মেলোডি কিংবা পপ গানে ডুবে থাকা বিশ্ব শ্রোতাদের কাওয়ালি গানের সমুদ্রে ভাসিয়েছেন যিনি, তিনি নুসরাত ফতেহ আলি খান। উপমহাদেশের কিংবদন্তি সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব, ওস্তাদ। তিনি বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী রাহাত ফতেহ আলি খানের চাচা ও সঙ্গীতগুরু। 

পৃথিবীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের মধ্যে চতুর্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলি খানকে। পশ্চিমা সঙ্গীত বিশ্বে তিনি পরিচিত ‘অ্যা ভয়েস ফ্রম দ্য হ্যাভেন’ হিসেবে। অবিশ্বাস্য উঁচু স্কেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সঙ্গীত পরিবেশন করতে পারতেন এই নন্দিত শিল্পী। তার কণ্ঠের শক্তি এতোটাই প্রবল ছিল যে, পুরো সঙ্গীত বিশ্ব অবাক হয়ে কেবল তার পরিবেশনা দেখেছে, শুনেছে।

আজ ১৩ অক্টোবর। ওস্তাদের জন্মদিন। ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলি খানের জন্মদিন। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে এক আফগান মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ছিলেন ফতেহ আলি খান। যিনি একজন সঙ্গীততত্ত্বিক, গায়ক, বাদক, এবং কাওয়াল ছিলেন। ফতেহ আলি খানের পঞ্চম সন্তান এবং প্রথম পুত্র নুসরাত।

নুসরাত ফতেহ আলি খানের আসল নাম পারভেজ ফতেহ আলি খান। তবে তিনি সঙ্গীত জগতে আসার পর নুসরাত ফতেহ আলি খান নামে পরিচিতি লাভ করেন। তার বাবার ইচ্ছে ছিল, ছেলে নুসরাত চিকিৎসক হয়ে একটি সম্মানজনক সুন্দর ক্যারিয়ার গড়ুক। কারণ সে সময় কাওয়ালি শিল্পীরা তেমন মর্যাদা পেতেন না। তাদের আয় রোজগারও ছিল খুবই সামান্য। তাই নিজের পথে ছেলেকে আনতে চাননি ফতেহ আলি খান।

কিন্তু যার শরীরে বইছে কাওয়ালি রক্ত, যার কণ্ঠভরা জাদু; তিনি তো এই পথ ছেড়ে যাওয়ার কথা নয়। কাওয়ালি গানের প্রতি নুসরাতের অকৃত্রিম ভালোবাসা মুগ্ধ করে তার পিতাকে। সঙ্গীত নিয়ে ছেলের এমন আগ্রহের সুবাদে অবশেষে নুসরাতকে গানের ভুবনে আসার অনুমতি দেন তিনি।

১৯৭১ সালে নুসরাত ফতেহ আলি খানের চাচা মুবারক আলি খান মারা যান। তখন তাদের পারিবারিক কাওয়ালি গানের দলের প্রধান হিসেবে যুক্ত হন নুসরাত। সে সময় তাদের দলের নাম হয় ‘নুসরাত ফতেহ আলি খান, মুজাহিদ মুবারাক আলি খান অ্যান্ড পার্টি’।

নুসরাত আলি খানের প্রথম পরিবেশনা ছিল রেডিও পাকিস্তানের একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানে। ‘জশন-ই-বাহারা’ শীর্ষক একটি স্টুডিও রেকর্ডিংয়ে তিনি দলের সঙ্গে গান পরিবেশন করেন। তবে পাকিস্তানজুড়ে তার প্রথম সফলতা আসে ‘হক আলি আলি’ গান দিয়ে। এই গানে তিনি নিজের মতো করে সারগামের ইমপ্রোভাইজেশন করেন, যার ফলে ঐতিহাসিক গানটি শ্রোতাদের কাছে একটু ভিন্নভাবে পৌঁছে। আর গায়ক হিসেবে নুসরাত পেয়ে যান দেশজোড়া খ্যাতি।

পরবর্তী এক যুগ নুসরাত ফতেহ আলি খান নিজ দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৮৫ সালে নুসরাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি পান। সে বছর লন্ডনের ‘ওয়ার্ল্ড অব মিউজিক, আর্টস অ্যান্ড ডান্স’ উৎসবে গান পরিবেশন করেন তিনি। সেই পরিবেশনায় শ্রোতা এবং আয়োজকদের বিস্মিত করে দেন নুসরাত। যার সুবাদে পরবর্তীতে আরও তিনবার একই উৎসবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীতজ্ঞদের ক্ষেত্রে এটা বিরল ঘটনা।

১৯৮৫ ও ১৯৮৮ সালে নুসরাত প্যারিসে সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ১৯৮৭ সালে তিনি পঞ্চম এশিয়ান ট্রাডিশনাল পারফর্মিং আর্ট ফেস্টিভ্যাল-এ অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে নিউ ইয়র্কের ‘ব্লুকলিন অ্যাকাডেমি অব মিউজিক’-এ পারফর্ম করে আমেরিকান শ্রোতাদের মন জয় করেন নুসরাত।

বিশ্বখ্যাত সঙ্গীত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়া ছিল নুসরাত ফতেহ আলি খানের। আলম লোহার, নূর জেহান, এ আর রহমান, আশা ভোসলে, জাভেদ আখতার ও লতা মঙ্গেশকর-দের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল।

১৯৯৭ সালে নুসরাত ফতেহ আলি খানের ‘ইনটক্সিকেটেড স্পিরিট’ অ্যালবামটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে সেরা ট্রাডিশনাল ফোক অ্যালবাম ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়েছিল। একই বছর তার ‘নাইট সং’ অ্যালবামটি সেরা ওয়ার্ল্ড মিউজিক অ্যালবাম ক্যাটাগরিতে গ্র্যামি মনোনয়ন পায়।

নুসরাত ফতেহ আলি খানের বহু গান কালজয়ী হয়েছে। তার কণ্ঠে যেমন শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে, তেমনি সেসব গান যুগে যুগে নতুনদের কণ্ঠেও মানুষের মন জয় করেছে। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘মেরে রাশকে কামার’, ‘তুমহে দিল্লাগি’, ‘সোচতা হু কে’, ‘মাস্ত মাস্ত’, ‘হক আলি আলি’, ‘দামা দাম মাস্ত’, ‘রেহমাত কা ঝুমার’ ইত্যাদি।

সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন নুসরাত ফতেহ আলি খান। ১৯৮৭ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড ‘প্রাইড অব পারফর্মেন্স’ লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে নুসরাত অর্জন করেন ইউনেস্কোর মিউজিক প্রাইজ। ১৯৯৬ সালে মন্ট্রিল ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘গ্র্যান্ড প্রিক্স দেস আমেরিকাস’ পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। একই বছর তিনি ফুকুওকা এশিয়ান কালচার প্রাইজে আর্ট অ্যান্ড কালচার প্রাইজ অর্জন করেন।

২০০১ সালে নুসরাত ফতেহ আলি খানের নাম ওঠে গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে। সবচেয়ে বেশি কাওয়ালি গানের রেকর্ডিংয়ের জন্য তিনি এই খেতাব পান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ১২৫টির বেশি কাওয়ালি অ্যালবাম রেকর্ড করে গিয়েছেন।

নুসরাত ফতেহ আলি খান ছিলেন একজন স্থূলকায় মানুষ। শোনা যায়, তার ওজন ছিল ১৩৫ কেজি। এ কারণে তার শরীরে নানাবিধ রোগ দেখা দেয়। কিডনি জটিলতার জন্য তিনি লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট আচমকা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন নুসরাত। তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর। বলাই বাহুল্য, বেঁচে থাকলে কিংবদন্তি এই শিল্পী আরও বেশি সমৃদ্ধ করে যেতে পারতেন উপমহাদেশের সঙ্গীতকে।  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers