বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১ , ৯ শাওয়াল ১৪৪৫

শিল্প-সংস্কৃতি

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও নজরুল

নিউজজি ডেস্ক ২৫ মে, ২০২৩, ১১:৫৬:১৯

163
  • আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও নজরুল

ঢাকা: বিগত শতাব্দীর তৃতীয় দশকের শুরুতে বৃটিশ সরকার এদেশীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ ও ‘জাতীয় শিক্ষার’ নামে দেশব্যাপী  বিষবৃক্ষ রোপন করতে উঠে পড়ে লেগেছিল, নজরুলের মত বিচক্ষণ ও দেশপ্রেমিক মানুষের পক্ষে তা বুঝতে মোটেও কষ্ট হয়নি। কিন্তু নিজে বুঝলেই হবে না, সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততা থাকা আবশ্যক ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবিলায়। ফলে, যুগবাণীতে লেখা ‘জাতীয় শিক্ষা’ নামক যে প্রবন্ধ লেখেন তা সত্যি হৃদয়গ্রাহী। 

সত্যকে অস্বীকার করে এবং দেশীয় সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তাকে তিনি ‘ভন্ডামী’ কর্মকান্ড বলেছেন এবং এও বলেছেন এমন শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ‘মঙ্গল-উৎসবের কল্যাণ-প্রদীপ জ্বলিবেনা।’

প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার গলদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “শুনিয়াছি ‘বন্দে মাতারামের’ যুগে যখন স্বদেশি জিনিসের সওদা লইয়া দেশময় একটা হৈ হৈ ব্যপার , হৈ হৈ কান্ড পড়িয়া গিয়াছিল, তখন অনেক দোকানদার বা ব্যবসায়িকগণ বিলাতি জিনিসের ট্রেডমার্ক বা চিহ্ন দিব্যি চাঁচিয়া-ছুলিয়া উঠাইয়া দিয়া তাহাতে একটা স্বদেশি মার্কা মারিয়া লোকের নিকট বিক্রয় করিতেন।

এখন যে পদ্ধতিতে জাতীয় শিক্ষা আমাদের ভবিষ্যৎ আশা ভরসাস্থল নব-উদ্ভাবিত জাতীয় বিদ্যালয়ে দেওয়া হইতেছে, তাহাও ঠিক ঐ রকম শিক্ষারই ট্রেডমার্কা উঠাইয়া ‘স্বদেশী’ মার্কা লাগাইয়া দেওয়ার মত।”

শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের গলদ ছাড়াও বাইরের আরেকটি গলদ তিনি তুলে ধরেছেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকে সত্যিকারের মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে। বর্তমানে আমরা যেমন দেখি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে কি পরিমাণ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়, যা ভাবলেও গা শিয়রে ওঠে। কেননা, অন্ধকার পথে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা কখনই জাতির পথপ্রদর্শক হতে পারে না। 

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ করার ক্ষেত্রে যে অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হচ্ছে, তা শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল দুর্বল করে দিচ্ছে না, তা পুরো জাতিকে অস্থিরতার দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষক হতে হলে পড়াশোনার বাইরে বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন।

আর এ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বয়সও লাগে। কিন্তু দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ  করে মিছিল মিটিং করা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা ব্যতীত অন্য কোনও গঠনমূলক কাজ করানো যায় না। 

আর এমন উপলব্ধি আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় শত বছর পূর্বেই বুঝেছিলেন। তাই এমন নোংরা কাজের বিরুদ্ধে  তিনি সোচ্চার ছিলেন।

‘জাতীয় শিক্ষা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, “যাঁহারা জাতীয় বিদ্যালয়ে প্রফেসর বা অধ্যাপক নিযুক্ত হইতেছেন, তাঁহারা সকলেই কি নিজ নিজ পদের উপযুক্ত? কত উপযুক্ত লোককে ঠকাইয়া শুধু দুটো বক্তৃতা ঝাড়ার দরুন ইহারা অনেকেই নিজের রুটির জোগাড় করিয়া লইয়াছেন ও লইতেছেন।. . . পবিত্রতার নামে এমন জুয়াচুরিকে প্রশ্রয় দিলে আমাদের ভবিষ্যৎ একদম ফর্সা।” নজরুলের এমন অভিযোগগুলি আজ সমাজের সর্বস্তরে বিদ্যমান। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের কাছে বিসর্জন দিচ্ছি পুরো জাতিকে।

এর শেষ কোথায়? কারা এ সমস্যার সমাধান করবে? যে শিক্ষক জাতিকে পথ দেখাবে, সে শিক্ষক যদি নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত হন তবে জাতি কোন পথে যাবে?

কাজী নজরুল ইসলাম শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে বার বার সতর্ক  বাণী উচ্চারণ করেছেন। ‘জাতীয় শিক্ষার’ পর ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক প্রবন্ধেও তিনি কঠোর সমালোচনা করেন এসব কর্মকান্ডের।

পাশাপাশি উদ্বেগ-উৎকন্ঠার কথাও তুলে ধরেন। তার উদ্বেগ তিনি প্রকাশ করেন এভাবে, “পবিত্র কোন জিনিসে কীট প্রবেশ করিতে দেখিয়া চুপ করিয়া থাকাও অপরাধ।

এই জাতীয় বিদ্যালয়ে কাঁচা কাঁচা অধ্যাপক নিয়োগ লইয়া যে ব্যাপার চলিতেছে, তাহা হাজার চেষ্টা করিলেও চাপা দেয়া যাইবেনা; ‘মাছ দিয়া শাক ঢাকা যায় না’। কাঁচা অধ্যাপক মানে বয়সে কাঁচা নন, বিদ্যায় কাঁচা।

আমাদের আর সবই ভালো, কেবল বে-বন্দোবস্তিই হইতেছে ‘গুণ-রাশিনাশি।’ গোঁদের উপর বিষ ফোঁড়া! তদুপরি আবার আমাদের একগুঁয়েমিও আছে।”

সত্যিকার অর্থে যে সব অভিযোগ-অনুযোগ এখানে উপস্থাপন করেছেন, তার প্রতিটি এখনো আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে এর আকার আরো তীব্র।

এই একগুঁয়েমি প্রসঙ্গে বন্ধুর স্বার্থ বা প্রতিবেশির স্বার্থ বা দলীয় অবস্থান ঠিক থাকবে না বলে নজরুল দাবি করেন । এ সম্পর্কে নজরুল একগুঁয়েমিকে পরিহার করার আহবান জানিয়ে বলেন, “বন্ধুর মর্যাদার চেয়ে সত্যের মর্যাদা অনেক উপরে।”

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন