শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ , ১৮ রমজান ১৪৪৭

শিল্প-সংস্কৃতি

​আব্দুল জব্বার: সুরের স্থাপত্যে একটি মানচিত্র

বাহাউদ্দিন গোলাপ ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২০:২১:১৪

305
  • ​আব্দুল জব্বার: সুরের স্থাপত্যে একটি মানচিত্র

শিল্প যখন বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে যূথবদ্ধ প্রাণের স্পন্দন হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর কোনো সাধারণ ব্যক্তি থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন একটি ইতিহাসের কণ্ঠস্বর। আব্দুল জব্বার ছিলেন সেই বিরল সংগীতিক কারিগর, যিনি সুরের এক অখণ্ড স্থাপত্যে বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আর মানবিক আর্তিগুলোকে গেঁথেছিলেন। ১৯৩৮ সাল—যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূর্য অস্তমিত হওয়ার পথে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণদামামা বাজছে, ঠিক সেই বৈশ্বিক ক্রান্তিলগ্নে কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলের শ্রমিক জীবনের প্রসববেদনা নিয়ে তাঁর জন্ম। তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল লালনের মরমী সুফিবাদ আর মীর মশাররফের দ্রোহী ঐতিহ্যের এক সূক্ষ্ম সংমিশ্রণ। ওস্তাদ ওসমান গণি ও ওস্তাদ লুৎফুল হকের ধ্রুপদী দীক্ষা তাঁকে সুরের ব্যাকরণ শিখিয়েছিল সত্য, কিন্তু শৈশবের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তপ্ত আবহাওয়া তাঁকে শিখিয়েছিল সেই সুরকে অধিকার আদায়ের মারণাস্ত্র করতে। কুষ্টিয়ার স্থানীয় পাঠশালা থেকে উচ্চাঙ্গ সংগীতের ধ্রুপদী আখড়া পর্যন্ত তাঁর সেই শৈল্পিক অভিযাত্রা আসলে ছিল এক মহাজাগতিক প্রস্তুতি, যা তাঁকে উত্তরকালে একটি অবদমিত জাতির সাংস্কৃতিক চেতনার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে গড়ে তুলছিল।

​আব্দুল জব্বারের শিল্পীসত্তার প্রকৃত রূপান্তর ঘটে রাজপথের লড়াইয়ে। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি অগ্নিগর্ভ মিছিলে তিনি ছিলেন জনতার বজ্রস্বর। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই মহাকাব্যিক কণ্ঠ, যা রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে বারুদের মতো কাজ করত। তাঁর গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি হয়ে উঠেছিল ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা আর অনাগত স্বাধীনতার শপথ। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি ছিল যুদ্ধের অলিখিত রণসংগীত, যা প্রতিটি বাঙালির ধমনিতে সাহসের রক্তপ্রবাহ তৈরি করত। এছাড়া ‘মুজিববাইয়া যাওরে’-র মতো গানে তিনি যে গণজাগরণ ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত প্রিয়; যা শুনে বঙ্গবন্ধু পরম স্নেহে বলতেন—“তোর গান শুনলে আমার রক্ত গরম হয়ে যায়।" কেবল স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি কলকাতার তপ্ত রাজপথে ট্রাকে চড়ে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে হারমোনিয়াম হাতে গান গেয়ে সংগ্রহ করেছিলেন তৎকালীন ১২ লাখ টাকা। এই বিশাল অর্থ তিনি ব্যক্তিগত জীবনের কোনো মোহে ব্যয় না করে নিঃসংকোচে প্রবাসী সরকারের ত্রাণ তহবিলে তুলে দেন। চিলির সামরিক জান্তার সামনে ভিক্টর জারা কিংবা মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনে বব ডিলান যে সাহসিকতায় সুরকে মারণাস্ত্র করেছিলেন, আব্দুল জব্বার বাংলার জনপদে ঠিক সেই মহাকাব্যিক ভূমিকারই এক বৈশ্বিক সংস্করণ। বিশ্ব গণমাধ্যম তখন তাঁর কণ্ঠকে ‘মুক্তিকামী মানুষের অবিনাশী কণ্ঠস্বর’হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং তাঁর এই ত্যাগ ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’(Cultural Nationalism) সৃষ্টিতে দক্ষিণ এশিয়ায় এক অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে।

মুক্ত স্বদেশের দিগন্তে যখন বিজয়ের নিশান উড়ল, আব্দুল জব্বার তখন চলচ্চিত্রের রূপালী পর্দায় তাঁর কণ্ঠের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর অর্জনের খতিয়ান ছিল বিস্ময়কর। ১৯৮০ সালে তিনি অর্জন করেন দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’, ১৯৯৬ সালে পান ‘একুশে পদক’। এছাড়া তিনি শ্রেষ্ঠ প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০০৬ সালে বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় তাঁর তিনটি গান—‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ এবং ‘তুমি কি দেখেছ কভু’—অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রমাণ করে যে, তাঁর কণ্ঠ বিশ্ব সংগীতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ঘটনা ছিল মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র পাড়া থেকে আসা বিপুল প্লেব্যাকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা; কেবল দেশের প্রতি টান ও বাংলা ভাষার প্রতি মমত্ববোধ থেকে তিনি সেই প্রলোভন ত্যাগ করেছিলেন। মুম্বাইয়ের এক অনুষ্ঠানে যখন কিংবদন্তি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁকে ‘বাংলার সম্পদ’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন, তখন তা বিশ্ব দরবারে তাঁর শৈলক্ষিক আভিজাত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

​​তাঁর গায়কীর শৈল্পিক ও কারিগরি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতের ‘তান’ ও ‘গমক’-এর সাথে পাঞ্জাবি ঘরানার ‘পশতু টোন’-এর এক দুর্লভ সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠের সেই বিশেষ 'রেজোন্যান্স' ও উচ্চ কম্পাঙ্কের ‘ভোকাল ব্যারিটোন’ আধুনিক বাংলা গানে এক নতুন উচ্চতা যোগ করেছিল। বিশেষ করে উচ্চাঙ্গ সংগীতের 'মিড়' ও সূক্ষ্ম কারুকাজকে তিনি যেভাবে আধুনিক পপ-মেলোডিতে অনুবাদ করেছিলেন, তা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রের ‘ওরে নীল দরিয়া’র সেই মহাজাগতিক হাহাকার, ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ -এর সেই অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন কিংবা ‘পিচ ঢালা পথ’ চলচ্চিত্রে তাঁর সেই নাগরিক আবেগ—প্রতিটি সৃষ্টিতে বাঙালির প্রাত্যহিক দীর্ঘশ্বাস এক নান্দনিক উচ্চতায় উন্নীত হয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সুর কেবল শ্রুতিমধুর হলেই চলে না, তাকে হতে হয় সময়ের আয়না।

​​তবে এই বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির মধ্যগগনে থাকা শিল্পীর জন্য নিয়তি জমিয়ে রেখেছিল এক নিষ্ঠুর পরিহাস। যে কণ্ঠটি একটি স্বাধীন মানচিত্রের জন্য সারা বিশ্ব কাঁপিয়েছিল, জীবনের গোধূলিবেলায় সেই কণ্ঠকেই লড়তে হয়েছে ব্যাধি আর চরম দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে। এই ট্র্যাজেডি কেবল রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা নয়, বরং তা ছিল সার্বিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। দারিদ্র্য এখানে কেবল অর্থকষ্ট ছিল না, তা ছিল এক ধরণের ‘দার্শনিক নিঃসঙ্গতা’। আব্দুল জব্বারের শেষ জীবনের চরম অবহেলা ও নিদারুণ অভাব আমাদের সামগ্রিক কৃতজ্ঞতাবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি প্রমাণ করে যে, আমরা কেবল উৎসবের শিল্পীকেই চিনি, তাঁর দুঃসময়ের দীর্ঘশ্বাসে পাশে দাঁড়াতে জানি না। তাঁর এই ট্র্যাজিক বিদায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, শিল্পের কদর কেবল করতালিতে নয়, বরং শিল্পীর মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব রক্ষার মাঝেই নিহিত।

​আব্দুল জব্বার নামক সেই সুরের মহীরুহ আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও, তাঁর গানে ফুটে ওঠা দ্রোহ আর জীবনদর্শন প্রতিটি বাঙালির রক্তকণিকায় প্রবহমান। আজ সংগীত যখন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যান্ত্রিকতায় বন্দি, তখন আব্দুল জব্বারের প্রাসঙ্গিকতা এক অপরিহার্য ‘অর্গানিক’ শক্তির নাম। তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন যে, রাষ্ট্রীয় সম্মানের চেয়ে রাষ্ট্রীয় ‘যত্ন’ এবং সামাজিক ‘বোধ’ অনেক বেশি মূল্যবান। যতক্ষণ এই জনপদে অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে কোনো কণ্ঠ সোচ্চার হবে, আব্দুল জব্বারের সেই বজ্রকণ্ঠই হবে আমাদের অবিনাশী মশাল। ইতিহাস তাঁকে ভুলে যেতে পারে না, কারণ তিনি গান দিয়ে কেবল মনোরঞ্জন করেননি, তিনি সুর দিয়ে একটি জাতির অস্তিত্বের ইমারত গড়েছেন। আগামীর প্রতিটি প্রজন্ম যখনই সংকটে পড়বে, তাঁর সেই ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ হবে আমাদের চেতনার ধ্রুবতারা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী।  

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন