শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ , ১৮ রমজান ১৪৪৭

শিল্প-সংস্কৃতি

শাহ আবদুল করিম ভাটির বরপুত্র

বাহাউদ্দিন গোলাপ ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২০:২৩:১৬

208
  • শাহ আবদুল করিম ভাটির বরপুত্র

কালনীর পলি-ধোয়া জনপদে যে সুর একদিন অবাধ্য ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছিল সুনামগঞ্জের মেঠোপথে, সেই সুর আজ কেবল লোকজ স্পন্দন নয়, বরং এক বিশ্বজনীন মানবিক ইশতেহার। ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, বসন্তের প্রথম প্রহরে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজান ধল গ্রামে যখন তিনি ভূমিষ্ঠ হন, তখন বাংলার গ্রামাঞ্চল ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের গোধূলি লগ্নে জমিদার, জোতদার আর মহাজনদের নিগূঢ় শৃঙ্খলে আবদ্ধ। দুর্গম ভাটি অঞ্চলের সেই সংগ্রামী সময়ে মানুষের জীবন ছিল প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার এক করুণ আখ্যান। কালনী নদী আর হাওরের অবারিত জলরাশির তীরে যে মানুষগুলো জন্মাতো, তাদের জীবনে শিক্ষার আলো ছিল সুদূরপরাহত এক বিলাসিতা, আর দারিদ্র্য ছিল ললাটের অনিবার্য  লিখন। সেই ঘোর অমানিশার কালে এক নিঃস্ব কৃষক পরিবারে তাঁর আবির্ভাব যেন এক অবাধ্য প্রদীপের প্রজ্বলন—যা প্রথাগত তেলের আধারে নয়, বরং হৃদয়ের গূঢ় ব্যাকুলতায় জ্বলে উঠেছিল। শৈশব থেকেই অভাব ছিল যাঁর ছায়ার মতো সঙ্গী, সেই রাখালি জীবনই ছিল তাঁর অস্তিত্বের প্রথম পাঠশালা। ভাটি অঞ্চলের বর্ষাকালীন অন্তহীন বিচ্ছিন্নতা আর মেঠোপথের ধুলো তাঁর মনে যে আধ্যাত্মিক একাকীত্ব বুনে দিয়েছিল, তা-ই বাউল শাহ ইব্রহিম মাস্তান বকশ ও রশিদ উদ্দিনের মতো মহাজনদের দীক্ষায় এক মহাজাগতিক দর্শনে রূপ নেয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুয়ার রুদ্ধ থাকলেও ১২ বছর বয়সে গ্রামের এক নৈশবিদ্যালয়ে মাত্র কয়েক রাতের সেই মিতালিই ছিল তাঁর অক্ষরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়; যা পরবর্তীকালে তাঁকে স্বশিক্ষিত এক প্রাজ্ঞ বুদ্ধিজীবীতে রূপান্তরিত করে।

​শাহ আবদুল করিমের যাপনচিত্র ছিল মূলত ‘মনুষ্যত্ব’ ও ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র এক সুসংহত রূপ। ১৯৪৭-এর দেশভাগের অস্থির সময়ে উজান ধল গ্রামে স্থায়ী হয়ে তিনি যখন তাঁর সহধর্মিণী আফতাবুন্নেসা বিবি—যাঁকে তিনি ভালোবেসে ‘সরলা’ ডাকতেন—তাঁর হাত ধরেন, তখন থেকেই শুরু হয় এক মহত্তর সংগীত ও অস্তিত্ববাদী লড়াই। সরলা বিবি কেবল তাঁর জীবনসঙ্গী ছিলেন না, ছিলেন তাঁর সৃষ্টির আদি ও অন্তের প্রেরণা। ১৯৫২ সালে সরলার অকাল প্রয়াণ শাহ আবদুল করিমের জীবনে যে অসহনীয় রিক্ততা তৈরি করেছিল, তা-ই তাঁর গানে এক গভীর মরমি ও দার্শনিক বিরহী সুরের জন্ম দেয়। সহজ কথায় গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যাকে ‘সাবঅল্টার্ন’ বা সমাজের একেবারে নিচুতলার অবহেলিত কণ্ঠস্বর বলেছেন, শাহ আবদুল করিম ছিলেন সেই কণ্ঠস্বরের এক অনন্য রূপকার। স্পিভাক সংশয় প্রকাশ করেছিলেন যে নিম্নবর্গের মানুষ কি নিজের কথা নিজে বলতে পারে? শাহ আবদুল করিম সেই সংশয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে সাধারণ প্রান্তিক মানুষ কেবল শোষিত হয় না, বরং সুরের আধারে নিজ প্রজ্ঞায় নিজেই নিজের মহাকাব্য রচনা করতে পারে। সহজ কথায় আন্তোনিও গ্রামশির ভাষায় তিনি ছিলেন এক ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বা ‘স্বজাত বুদ্ধিজীবী’ —যিনি পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়াই নিজের জীবন আর মাটি থেকে অর্জিত প্রজ্ঞা দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের পথ দেখিয়েছেন।

​১৬০০-এর অধিক গানের সুবিশাল সম্ভার নিয়ে শাহ আবদুল করিমের পদাবলী কেবল সুরের মূর্ছনা নয়, বরং তা মানবজীবনের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। তাঁর গানের নিগূঢ় তত্ত্ব ও গণচেতনা বিবর্তিত হয়ে সংরক্ষিত হয়েছে ১৯৪৮-এর ‘আফতাব সঙ্গীত’, ১৯৫৪-এর ‘গণ সঙ্গীত’, ১৯৮১-এর ‘কালনীর ঢেউ’, ১৯৯০-এর ‘ধলমেলা’, ১৯৯৮-এর ‘ভাটির চিঠি’ এবং ২০০১-এর ‘কালনীর কূলে’—এই ছয়টি কালজয়ী আকর গ্রন্থে। তাঁর সংগীত দর্শনে দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিকতা একাকার হয়ে গেছে; যেখানে ‘কোন মিস্তরি নাও বানাইলো’ কিংবা ‘গাড়ি চলে না’ গানের মাধ্যমে তিনি নশ্বর শরীরকে মহাজাগতিক গতির এক শৈল্পিক রূপক হিসেবে তুলে ধরেছেন। “গাড়ি চলে না চলে না, চলে না রে...”—এই হাহাকারের আড়ালে তিনি আসলে মানবাত্মার সেই সীমাবদ্ধতাকেই ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে প্রাণভোমরা একদিন খাঁচা ছেড়ে অজানায় পাড়ি দেয়। সহজ কথায় কার্ল ইয়ুং যাকে সমষ্টিগত মনের অবচেতন ভাবনা বলেছেন, শাহ আবদুল করিমের এই রূপকগুলো ঠিক তেমনি সব মানুষের হৃদয়ের চিরন্তন হাহাকারকে ধারণ করে। আবার ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’ কিংবা ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’ গানে ব্যক্তিক বিরহকে তিনি উন্নীত করেছেন পরমাত্মার অন্বেষণে। সহজ কথায় সিমন দ্য বোভোয়ার-এর অস্তিত্ববাদী দর্শনে নারী সত্তার যে স্বকীয়তার কথা বলা হয়েছে, শাহ আবদুল করিমের গানে নারী ঠিক তেমনি এক শক্তিশালী সক্রিয় সত্তা—যা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যে নারীর স্বতন্ত্র ও বলিষ্ঠ অবস্থান বা ‘লোকজ নারীবাদের’ এক অনন্য দলিল।

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানে তিনি যেভাবে ফেলে আসা অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর আধুনিক যান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তা সমাজতাত্ত্বিক বিচারে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী দলিল। তাঁর গানের সুরের ‘মিনিমালিজম’ বা অতি সাধারণ অথচ গভীর ভারসাম্য লোকজ সংগীতকে এক ধ্রুপদী গাম্ভীর্য দান করেছে। পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতির সাথে মানুষের মানসিক সম্পর্কের যে গান শাহ আবদুল করিম বেঁধেছেন, তাকে বিশ্বসাহিত্যের ‘ইকোপোয়েটিকস’ বা পরিবেশবাদী কবিতার দৃষ্টিভঙ্গিতে অনায়াসেই সংজ্ঞায়িত করা যায়। তিনি যে কেবল মরমি সাধক ছিলেন না; তেভাগা আন্দোলন থেকে ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর সরাসরি আমন্ত্রণে গান পরিবেশন এবং রাজনৈতিক চেতনার সাথে তাঁর সুরের মেলবন্ধন তাঁকে বাংলার ‘পল রবসনের’ উচ্চতায় আসীন করে। সহজ কথায় মিশেল ফুকো-এর ‘ক্ষমতা ও জ্ঞান’ তত্ত্বের নিরিখে তাঁর গানগুলো ছিল শোষিত মানুষের সংগৃহীত প্রজ্ঞার এক বিদ্রোহী প্রকাশ যা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। বিশেষ করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রচারের গান গাওয়ায় তাঁকে হুলিয়া ও প্রশাসনিক মামলার শিকার হয়ে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। এমনকি নিজ গ্রামের মৌলবাদী ও রক্ষণশীল শক্তির সামাজিক বর্জন, ফতোয়া এবং বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলার হুমকির মুখেও তিনি তাঁর অসাম্প্রদায়িক একতারা ছাড়েননি; যা তাঁকে এক অকুতোভয় সাংস্কৃতিক যোদ্ধার মর্যাদা দেয়।

​১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শাহ আবদুল করিমের ভূমিকা ছিল এক সাহসী সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যোদ্ধার মতো। রণক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে না নিলেও তাঁর ‘একতারা’ ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক শাণিত কামান। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে এবং মুক্তাঞ্চলে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে রাখতেন। “হিংসা দ্বেষ ভুলিয়া যাও রে বাঙালি সব এক হও রে” কিংবা “দিন কাল থাকতে ধরো রে অস্ত্র / শত্রু মারিতে রে”—এই শক্তিশালী গণসংগীতগুলোর মাধ্যমে তিনি মুক্তিকামীদের সংগঠিত করেছিলেন। তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করেছেন। একাত্তরের সেই সংকটকালে শাহ আবদুল করিমের গান ছিল বাংলার মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে হাওর ও ভাটি অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় তাঁর সুর পৌঁছে গিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসের রসদ হয়ে। যুদ্ধের ময়দানে তাঁর গান যে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের সৃষ্টি করেছিল, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।

শাহ আবদুল করিমের অর্জন ২০০১ সালের একুশে পদক কিংবা ২০০০ সালে দৌলতপুর সাহিত্য পরিষদের ‘আবদুর রউফ চৌধুরী পুরস্কারে’ সীমাবদ্ধ নয়। তিনি জীবনভর অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন যার মধ্যে রাহী ট্রাস্ট অ্যাওয়ার্ড এবং সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড উল্লেখযোগ্য।

তবে তাঁর আসল প্রাপ্তি হলো বাউল দর্শনকে ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল হেরিটেজ’ হিসেবে ২০০৫ সালে বৈশ্বিক মঞ্চে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। বাংলা একাডেমি কর্তৃক তাঁর ১০টি গানের ইংরেজি অনুবাদ একজন বাউল শিল্পীর জন্য এক বিরল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বব ডিলান বা লেনার্ড কোহেনের গানের কাব্যিক গভীরতার সাথে শাহ আবদুল করিমের পদাবলীর যে সাদৃশ্য, তা মনে করিয়ে দেয় যে শিল্পের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। বরং বর্তমানের পুঁজিবাদী একাকীত্বের বিপরীতে তাঁর “সহজ মানুষ পাইবা কিতা সেই মানুষের কাছে যাও”—এই আহ্বান এক বিশ্বজনীন প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এমনকি আধুনিক যন্ত্রসংগীত ও ফিউশন ধারায় তাঁর গানের পুনর্জন্মের প্রতি তাঁর যে আধুনিক ও উদার সমর্থন ছিল, তা প্রমাণ করে যে শাহ আবদুল করিমের সুর সমকালীন ও চিরস্থায়ী।

২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শাহ আবদুল করিমের নশ্বর দেহের অবসান ঘটলেও, বর্তমানের যান্ত্রিক সভ্যতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তিনি এক অপরিহার্য ‘ডিজিটাল হিউম্যানিজম’ বা মানবিক প্রযুক্তির পথপ্রদর্শক। প্রযুক্তির আকাশ ছুঁয়েও আত্মিক প্রশান্তির জন্য আমাদের ফিরে আসতে হয় তাঁর সেই শেকড়সন্ধানী দর্শনেই। শাহ আবদুল করিম আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে রিক্ততাকে পূর্ণতায় রূপান্তর করতে হয়; তিনি কেবল একজন চারণ কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক আধুনিক মহাকাব্যিক রূপকার, যাঁর জীবন ছিল এক জীবন্ত বিদ্রোহ আর গান ছিল শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্র। আজও সুনামগঞ্জের ধলমেলা প্রাঙ্গণে তাঁর দর্শন অগণিত মানুষের আত্মার খোরাক জোগায়। কালনীর ঢেউ হয়তো একদিন শান্ত হয়ে যাবে, সময়ের ধুলোয় মুছে যাবে অনেক উজ্জ্বল নাম, কিন্তু শাহ আবদুল করিমের একতারার সেই উদাসীন অথচ মায়াবী ঝংকার চিরকাল মানুষের মুক্তির শাশ্বত সংগীত হয়ে মহাকালের বুকে অনুরণিত হবে। সময়কে অতিক্রম করে তিনি আজ এক অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা; যার সুর আমাদের হৃদয়ে এই ধ্রুব সত্যটিই মনে করিয়ে দেয় যে, মাটি ছেড়ে মানুষ যত দূরেই যাক, আসল ঠিকানা তার শেকড়েই নিহিত। তিনি মহাকালের এক অক্ষয় দলিল, যার পদাবলী যুগে যুগে আমাদের অস্তিত্বের গহীনে অপরাজেয় মানবিক সুরের কম্পন সৃষ্টি করে যাবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন