মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

শিল্প-সংস্কৃতি

সেলুলয়েডের ধ্রুপদী মহাকাব্য: সত্যজিৎ ও আমাদের সময়

বাহাউদ্দিন গোলাপ ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ২০:৫৯:৪৬

453
  • সেলুলয়েডের ধ্রুপদী মহাকাব্য: সত্যজিৎ ও আমাদের সময়

১৯২১ সালের ২রা মে কলকাতার গড়পার রোডের বনেদি রায় পরিবারে যখন সত্যজিৎ রায়ের জন্ম হলো, তখন বেঙ্গল রেনেসাঁর সেই আলোকদীপ্ত যুগটি অস্তগামী, কিন্তু তার অবশিষ্টাংশ তখনো বাংলার মনন গঠন করছে। উপেন্দ্রকিশোর ও সুকুমারের উত্তরাধিকার তাঁর রক্তে যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও শিল্পবোধ বুনে দিয়েছিল, তা শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসুর সান্নিধ্যে এসে এক নতুন মাত্রা পায়। তবে সত্যজিতের আধুনিকতা কেবল বংশগত ছিল না, তা ছিল এক সচেতন অর্জন। লন্ডনে থাকাকালীন ৯৯টি চলচ্চিত্র দেখার মধ্য দিয়ে তাঁর যে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটে, তা তাঁকে বিজ্ঞাপন জগতের টাইপোগ্রাফি বা 'রে রোমান' ফন্টের জ্যামিতিক নিখুঁততা থেকে সেলুলয়েডের এক অনির্দেশ্য বাস্তবতায় টেনে আনে। ১৯৫৫ সালের ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পাওয়ার পর বিশ্ব চলচ্চিত্র মানচিত্র যে বিস্ময়ের সম্মুখীন হয়েছিল, তা কেবল দারিদ্র্যের নান্দনিক চিত্রায়ন ছিল না; বরং তা ছিল পশ্চিমা রিয়ালিজমের সাথে প্রাচ্যের ধ্রুপদী দর্শনের এক জটিল ডায়ালেক্টিক সংঘাত।

​সত্যজিতের হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদ প্রায়শই সমালোচকদের দ্বারা উচ্চকিত হলেও, তাঁর কাজের ভেতরে থাকা ‘নেহেরুভিয়ান মডার্নিজম’ বা আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা সূক্ষ্ম ব্যবচ্ছেদের দাবি রাখে। আকিরা কুরোসাওয়ার সেই বিখ্যাত উক্তি—“সত্যজিতের সিনেমা না দেখা মানে সূর্য-চাঁদ না দেখা”—একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হলেও, সত্যজিতের ক্যামেরা কেবল চাঁদ দেখায়নি, বরং গ্রামীণ ভারতের ধূসর বাস্তবতাকে এক উচ্চবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ ইমেজের চোখ দিয়ে অবলোকন করেছে। বিভূতিভূষণের গদ্যকে যখন তিনি দৃশ্যকাব্যে রূপ দিলেন, তখন সুব্রত মিত্রের ‘বাউন্স লাইটিং’ বা রবিশঙ্করের সেতারের সুর গ্রামীণ দারিদ্র্যকে এমন এক সুষমা দান করেছিল, যা পরবর্তীকালে নারগিস দত্তের মতো সমালোচকদের দ্বারা ‘দারিদ্র্য রপ্তানির’ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। তবে এই বিতর্কই সত্যজিতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে—তিনি দেখিয়েছেন দারিদ্র্য যখন মানুষের মর্যাদাকে গ্রাস করতে চায়, তখনো শিল্পের লেন্স তাকে মহিমান্বিত করতে পারে, কিন্তু তা কদর্যতাকে আড়াল করে নয় বরং সত্যকে উন্মোচন করে।

​​বিশ্বসাহিত্যের সাথে সত্যজিতের চলচ্চিত্রের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি চেকভীয় বিষাদ আর দস্তয়েভস্কির মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে যেভাবে আত্মস্থ করেছিলেন, তা ভারতীয় চলচ্চিত্রে বিরল। ‘চারুলতা’র সেই একাকী মধ্যাহ্ন কেবল রবীন্দ্রসাহিত্যের অলঙ্করণ নয়, বরং তা ছিল জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ বা আধুনিক একাকীত্বের এক বৈশ্বিক রূপান্তর। সত্যজিতের চলচ্চিত্রে নারীর যে মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি আমরা দেখি—হোক তা ‘মহানগর’-এর আরতি কিংবা ‘দেবী’র দয়াময়ী—তা কেবল সামাজিক সংস্কার নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে এক নীরব বৈপ্লবিক বিস্ফোরণ। তিনি তাঁর লেন্সে নারীর কেবল অবয়ব নয়, বরং তাঁর অস্তিত্বের গভীর সংকটকে ধারণ করেছেন। শব্দকল্পের ব্যবহারে ট্রেনের কু ঝিকঝিক থেকে শুরু করে নির্জন দুপুরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাককে তিনি যেভাবে চলচ্চিত্রের ব্যাকরণে যুক্ত করেছেন, তা দেখায় যে তিনি কেবল ছবির পরিচালক ছিলেন না, ছিলেন এক অসামান্য শব্দ-স্থাপতিও বটে।

​সত্যজিতের রাজনৈতিক দর্শনের বিবর্তন তাঁর ‘ক্যালকাটা ট্রিলজি’ বা কলকাতা ত্রয়ী—‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জনঅরণ্য’—এর মধ্য দিয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ধরা পড়ে। সামন্ততান্ত্রিক অবক্ষয়ের দলিল ‘জলসাঘর’ থেকে যখন তিনি ১৯৭০-এর দশকের উত্তাল নাগরিক অস্থিরতায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁর ক্যামেরা আর নিরপেক্ষ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ব্যর্থতার এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ। ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’তে তিনি যেভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর ভারতীয় বিলাসিতার দ্বৈরথ দেখিয়েছেন, তা পোস্ট-কলোনিয়াল বা উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের এক প্রামাণ্য দলিল। তাঁর রাজনৈতিক রূপক ‘হীরক রাজার দেশে’ আজও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক শাণিত মগজাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে সত্যজিৎ কেবল একজন শিল্পী নন, বরং একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে রাষ্ট্রের কাঠামো ও ব্যক্তির স্বাধীনতার যে সংঘাত চিত্রিত করেছেন, তা বর্তমান সময়ের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

​আন্তর্জাতিক মানের বিশ্লেষণে সত্যজিতের ‘এলিটিজম’ বা আভিজাত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু তাঁর মিতব্যয়িতা আর টেকনিক্যাল ডিসিপ্লিন বা জ্যামিতিক শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁর ‘লাল খাতা’ বা স্কেচ বুক যেখানে তিনি প্রতিটি ফ্রেম আগে থেকেই এঁকে নিতেন, তা আজকের ভিএফএক্স-নির্ভর বিশৃঙ্খল চলচ্চিত্রের যুগে এক পরম শৃঙ্খলা। মার্টিন স্কোরসেজি থেকে শুরু করে স্টিভেন স্পিলবার্গ পর্যন্ত সকলেই তাঁর সেই ‘ভিশনারি’ সত্তার কাছে ঋণী। সত্যজিতের সাহিত্যিক সত্তা, বিশেষ করে ফেলুদা বা প্রফেসর শঙ্কু, কেবল শিশুতোষ বিনোদন নয়; তা ছিল যুক্তিবাদ আর বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার এক নীরব পাঠশালা। ১৯৯২ সালে শয্যাশায়ী অবস্থায় অস্কারের লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট গ্রহণ করার মুহূর্তটি ছিল প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমাদের নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার এক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রান্তিক সংস্কৃতি থেকে উঠে এসেও কীভাবে বিশ্বসংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হওয়া যায়—যা আজ গ্লোবাল সাউথের শিল্পীদের জন্য এক পরম প্রেরণা।

​আজ যখন সিনেমার পর্দায় প্রযুক্তির আস্ফালন মানবিক অনুভূতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে, তখন সত্যজিতের সেই নিস্তব্ধ ফ্রেম আর পরিমিত সংলাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিল্প শেষ পর্যন্ত ‘লেস ইজ মোর’ দর্শনে বিশ্বাসী। তিনি দেখিয়েছেন একটি ক্ষুদ্র ফ্রেমের ভেতর গোটা মহাবিশ্বের মানচিত্র এঁকে ফেলা সম্ভব, যদি সেখানে দেখার চোখটি সৎ থাকে। তাঁর কাজ কেবল নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, বরং আজকের দর্শকদের মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা পূরণের এক বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ‘বাজেট’ নয় বরং ‘ভিশন’ দিয়ে বিশ্বজয় করা যায়। তাই সত্যজিৎ নিছক একজন আইকন নন, তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য এক জীবন্ত ‘ম্যানুয়াল’—যিনি শেখান কীভাবে শিল্পের মোড়কে রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সুচারুভাবে গেঁথে দিতে হয়।

​​আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক পরিসরে সত্যজিতের চিত্রনাট্য বিন্যাসকে প্রায়শই জ্যামিতিক প্রিসিশনের সাথে তুলনা করা হয়। তিনি যখন ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’তে চার বন্ধুর সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখান, তখন তা নিছক ভ্রমণকাহিনী থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের অবদমিত অহং ও কামনার এক সমাজতাত্ত্বিক পাঠ। আজকের ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দ্রুতগতির ‘কাট-টু-কাট’ এডিটিংয়ের যুগে সত্যজিতের ‘লং টেক’ আমাদের ধৈর্য ও মনোযোগের গভীরতাকে চ্যালেঞ্জ করে। তিনি জানতেন কখন নিরবতা শব্দের চেয়ে বেশি কথা বলে। তাঁর এই মরমী নিঃশব্দতা চলচ্চিত্রের ব্যাকরণকে নতুন করে চিনিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, সত্যজিৎ তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক অগ্রপথিক ছিলেন বলেই তাঁর ছবিগুলো আজও সমকালীন সংকটগুলোর উত্তর দিতে সক্ষম। তিনি কেবল বাংলার ইতিহাসকে ধারণ করেননি, বরং তাকে এক বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করেছেন যা লিজিয়ন অফ অনার থেকে শুরু করে ভারতরত্ন পর্যন্ত প্রতিটি অর্জনে প্রতিফলিত।

​আজকের এই বিষণ্ণ ২৩শে এপ্রিলের দ্বিপ্রহরে আমাদের স্মৃতির জানালায় সেই দীর্ঘদেহী মানুষটি বারবার ফিরে আসেন, যিনি সেলুলয়েডের ফিতায় বুনেছিলেন জীবনের মহাকাব্য। ১৯৯২ সালের এই দিনে তাঁর প্রয়াণ কেবল একজন মানুষের বিদায় ছিল না, বরং তা ছিল বেঙ্গল রেনেসাঁর এক দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। তবুও সত্যজিৎ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বৃত্তে বন্দি নন; তিনি আসলে সেই অবিনশ্বর সুর, যা বিশ্বসংস্কৃতির আঙিনায় এক চিরকালীন ধ্রুপদী রাগিণীর মতো বেজেই চলেছে। তাঁর জীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি একাধারে ছিলেন রেনেসাঁ মানব এবং একজন আধুনিক বৈশ্বিক নাগরিক। ভারতরত্ন থেকে শুরু করে লিজিয়ন অফ অনার—সবই তাঁর কর্মের স্বীকৃতি হলেও তাঁর বড় অর্জন মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত সেই অমোঘ বিশ্বাস যে, শিল্পই পারে অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার সারথি হতে। প্রয়াণ দিবসের এই লগ্নে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করি—হে মহান কারিগর, আপনার রেখে যাওয়া সেই কাশবনের পথ ধরেই আজও আমরা সত্যের সন্ধান করি।

(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।)

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers