মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮ , ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিনোদন

লতা মঙ্গেশকর: কৈশোরে বাবা হারানো মেয়েটি আজ সঙ্গীতের দেবী

নিউজজি প্রতিবেদক  সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১, ১০:৪০:৫৯

177
  • লতা মঙ্গেশকর

মেয়েটির বয়স ছিল তখন মাত্র ১৩ বছর। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাবা মারা গেলেন। সংসারে নেমে এলো অন্ধকার। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। পাঁচ ভাই-বোনের বড় সংসার। মা ছিলেন গৃহিনী। বাবার মৃত্যুর ধাক্কাটি তাই বেশ জোরালো আঘাত করে সংসারের খুঁটিতে।

তখন তার বাবার বন্ধু নির্মাতা মাস্টার বিনায়ক এগিয়ে আসেন তাদের সংসারের পাশে। তাকে একজন গায়িকা ও অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সহযোগিতা করেন, অনুপ্রেরণা দেন। ছোট্ট মেয়েটি দৃঢ় প্রত্যয়ে নেমে পড়লেন কাজে। ছুটলেন গানের পেছনে।

কিন্তু নিয়তির খেল কিছু মানুষের জন্য খুব একটা সহজ হয় না। তার জন্যও হয়নি। তার কণ্ঠ ছিল বেশিই সরু। যার কারণে তেমন কেউই তাকে পাত্তা দেয়নি। প্রথম সুযোগটা আসে ১৯৪২ সালে। মারাঠি সিনেমা ‘কিতি হাসাল’-এ তিনি গাইলেন ‘নাচু ইয়া গাড়ে, খেলু সারি মানি হস ভারি’। বুক ভর্তি আশা আর চোখজুড়ে স্বপ্ন দেখছিলেন, এই বুঝি তার সঙ্গীতের পথচলা শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু না, ধাক্কা খেতে হলো এবারও। সিনেমাটির চূড়ান্ত সম্পাদনায় বাদ পড়ে যায় গানটি।

সংসারের বড় মেয়ে। তাই থেমে গেলে তো চলবে না। তাই হতাশ না হয়ে লেগে থাকলেন গানে। একই বছর ‘পেহলি মাঙ্গালা গাউর’ নামের আরেকটি মারাঠি সিনেমায় ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় এবং গান গাওয়ার সুযোগ হয় তার। ‘নাতালি চৈত্রাচি নাভালাই’ শিরোনামের গানটি সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি। এরপরের বছর তিনি গান করেন ‘গাজাভাউ’ নামের আরেকটি সিনেমায়। সেখানে তিনি ‘মাতা এক সাপুত কি দুনিয়া বাদাল দে তু’ শিরোনামে একটি হিন্দি গান করেন।

১৯৪৫ সালে মাস্টার বিনায়ক তার প্রতিষ্ঠানের মূল কার্যালয় নিয়ে যান মুম্বাইতে। তাই তার পরামর্শে তিনিও চলে যান বলিউডের শহরে। তখনও বা কে জানতো, এই বলিউড একদিন নিজের করে নেবেন সেই তরুণী। কণ্ঠের যাদুতে তিনি জিতে নেবেন পুরো বিশ্ব।

মুম্বাই যাওয়ার পর তিনি ওস্তাদ আমান আলি খানের কাছ থেকে ক্লাসিক্যাল গানের তালিম নেন। ১৯৪৬ সালে তিনি হিন্দি সিনেমায় প্রথম গান করেন। ‘আপ কি সেবা মে’ সিনেমায় সে গানের নাম ছিল ‘পা লাগু কার জোড়ি’। অবশ্য এর আগে ১৯৪৫ সালে ‘বাডি মা’ সিনেমায় ‘মাতা তেরে চারনো মে’ শীর্ষক ভজন গেয়েছিলেন তিনি।

১৯৪৮ সালে মারা যান মাস্টার বিনায়ক। তখন আবারও অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েন প্রতিভাবান সেই গায়িকা। তখনো তাকে কেউ চেনে না। নেই কোনো অবস্থান। তখন তার পাশে দাঁড়ান সঙ্গীত পরিচালক গুলাম হায়দার। তিনি তাকে প্রযোজক শশধর মুখার্জির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু শশধর তার কণ্ঠ শুনেই আপত্তি প্রকাশ করেন। জানান- তার কণ্ঠ খুব বেশি চিকন।

তখন গুলাম হায়দার বেশ রেগে গিয়ে শশধরকে জবাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আগামীর বছরগুলোতে নির্মাতা-প্রযোজকরা তার পায়ে পড়বে তাদের সিনেমায় গান গাওয়ানোর জন্য’। সেই জেদ থেকে হায়দার সেই তরুণীকে বড় ব্রেক দেন। সময়টা ছিল ১৯৪৮ সাল। ‘মাজবুর’ সিনেমায় গুলাম হায়দারের সুর-সঙ্গীতে অখ্যাত সেই তরুণী গাইলেন ‘দিল মেরা তোড়া, মুঝে কাহি কা না ছোড়া’। সিনেমাটি হয়েছিল ব্যবসাসফল। একইসঙ্গে গানটির সুবাদে সেই তরুণীও গায়িকা হিসেবে বলি মহলে পরিচিতি পায়।

এরপরের বছর শুরু হয় তার সাফল্যের প্রথম ধাপ। ‘মহল’ সিনেমায় তার গাওয়া ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। বলিউডের গণ্ডি ছাড়িয়ে তার নাম ছড়িয়ে যায় ভারতের দিকে-দিকে। তার সরু কণ্ঠই ভালোবাসতে শুরু করে মানুষ।

তারপরের কয়েক দশকে কেবল ইতিহাস রচিত হয়েছে। গানের ইতিহাস। কৈশোরে বাবা হারানো, সরু কণ্ঠের জন্য বাদ পড়া সেই অখ্যাত গায়িকা হয়ে উঠলেন সঙ্গীতের দেবী। সরস্বতী দেবী। লতা মঙ্গেশকর। উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়, সফল ও শ্রদ্ধেয় সঙ্গীতশিল্পী। কুইন অব মেলোডি, ভয়েস অব দ্য নেশন, ভয়েস অব মিলেনিয়াম, নাইটিঙ্গেল অব ইন্ডিয়া ইত্যাদি উপাধি তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করে।

লতা মঙ্গেশকরের ক্যারিয়ারের ধারাবাহিক বর্ণনায় গেলে লিখতে হবে উপন্যাস। তার চেয়ে সেই দুঃসাধ্য না করাই শ্রেয়। বরং সংক্ষেপে তার জীবন ও কর্মে একটু পলক ফেলে আসা যাক।

ভারতের মধ্য-প্রদেশের ইন্দোরে ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর। জন্মের পর তার নাম ছিল হেমা মঙ্গেশকর। তার বাবার নাম পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর। তিনি ছিলেন একজন ক্লাসিক্যাল গায়ক। আর তাই বাবার কাছেই গানের হাতেখড়ি হয় লতার। এমনকি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি বাবার গানের চিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন।

লতা মঙ্গেশকর হিন্দির পাশাপাশি মারাঠি, বাংলা ও অসমিসহ মোট ৩৬টি ভাষায় গান করেছেন। সবমিলে তার গাওয়া গানের সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। ১ হাজারের বেশি হিন্দি সিনেমায় গান গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর।

তার গানের সমুদ্র থেকে কয়েকটি গান হচ্ছে- ‘লাগ যা গালে’, ‘তুঝ সে নারাজ নাহি’, ‘এক পেয়ার কা নাগমা হ্যায়’, ‘আঁখে খুলি’, ‘দিল তো পাগাল হ্যায়’, ‘ইয়ে গালিয়া ইয়ে চৌবারা’, ‘প্যায়রো মে বান্ধান হ্যায়’, ‘হামকো হামিসে চুরালো’, ‘দিদি তেরা দেবার দিওয়ানা’, ‘জিন্দেগি কা না টুটে লাড়ি’, ‘জিন্দেগি পেয়ার কা গিত’, ‘পারদেসিয়া’, ‘ইয়াশোমাতি মাইয়া সে বোলে’, ‘চান্দা হে তু মেরা সুরাজ’, ‘দের না হো যায়ে কাহি’, ‘তু ইতনি আচ্ছি হ্যায়’, ‘আয়ে মেরে ওয়াতান কো লোগো’, ‘তেরে লিয়ে’, ‘ঝিলমিল সিতারো কা আঙ্গান’, তেরে বিনা জিন্দেগি সে’, ‘রঙ্গিলা রে’, ‘দো দিল টুটে দো দিল হারে’ ইত্যাদি।

লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া বাংলা গানের সংখ্যা ১৮৫। সেগুলোর মধ্যে ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে’, ‘যারে উড়ে যারে পাখি’, ‘না যেও না’, ‘ওগো আর কিছু তো নয়’, ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে’, ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’, ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’, ‘নিঝুম সন্ধ্যায়’, ‘চঞ্চল মন আনমনা হয়’, ‘বলছি তোমায় কানে’ ও ‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো’ ইত্যাদি কালের সীমানা জয় করে এখনো জনপ্রিয়।

সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে লতা মঙ্গেশকরের অপ্রাপ্তি বলে কিছু নেই। মানুষের ভালোবাসার পাশাপাশি তিনি প্রায় সব ধরণের পুরস্কার-সম্মাননা অর্জন করেছেন। ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ভারত রত্ন, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান পদ্ম বিভুষণ, তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মান পদ্ম ভূষণ পেয়েছেন তিনি। এছাড়া ভারতের ৬০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তাকে বিশেষভাবে ‘আজীবন সম্মাননা’ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ সম্মাননা হিসেবে বিবেচিত দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারও পেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। তার ঝুলিতে আরও রয়েছে তিনবার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, সাতবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, ১৫ বার বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড-সহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে লতা মঙ্গেশকর অবিবাহিত। শোনা যায়, তিনি উপমহাদেশের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকার সঙ্গে তার প্রেম ছিল। তবে সেই প্রেম পরিণতি পায়নি।

নিউজজি/রুআ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers