শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ , ১৮ রমজান ১৪৪৭

ফিচার

স্বাস্থ্যখাতের সন্ধিক্ষণ: প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ

সুমন মোস্তফা ফেব্রুয়ারী ১৮, ২০২৬, ১৮:২৮:৫৮

220
  • স্বাস্থ্যখাতের সন্ধিক্ষণ: প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত এখনো এক জটিল বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি-মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য। 

অন্যদিকে একই খাতে জমে আছে অব্যবস্থাপনা, জনবল ঘাটতি, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সমন্বয়হীনতা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। এই দুই বিপরীত বাস্তবতার মাঝেই নতুন সরকারের সামনে স্বাস্থ্যখাত এখন বড় এক পরীক্ষার ক্ষেত্র।

দেশের প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোতে গেলে দৃশ্যপট খুব আলাদা নয়।প্রতিদিন হাজার হাজার রোগীর ভিড়, শয্যা সংকট, দীর্ঘ লাইন, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিলম্ব-এসব যেন নিয়মিত চিত্র। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন। 

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং চিকিৎসক অনুপস্থিতির কারণে গ্রামীণ মানুষ বাধ্য হয়ে বিভাগীয় শহরের বড় হাসপাতালের দিকে ছুটছেন। ফলে উচ্চপর্যায়ের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো জনবল সংকট। অনুমোদিত পদের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সের পদ শূন্য। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত থাকার আগ্রহ কম। কর্মপরিবেশ, আবাসন সুবিধা ও নিরাপত্তার অভাব এই অনীহাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা না হওয়ায় জটিলতা বাড়ে, খরচ বাড়ে, চাপ বাড়ে উচ্চতর হাসপাতালে।

এদিকে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার দ্রুত হলেও তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অতিরিক্ত বিল এবং সেবার মানের অসামঞ্জস্য-এসব অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশ এখনো জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা নিতে গিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য এখনো অধরা।

স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি কয়েক দশক ধরে এই বিশাল খাতকে একটি কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই কাঠামোর ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ায় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বড় একটি খাতকে স্থায়ী রূপরেখা ছাড়া পরিচালনা করা কঠিন-এমনটাই মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

তাদের মতে, স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজাতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং ধারাবাহিক পরিকল্পনা অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। 

সরকারি হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়ন, চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসন, জেলা-উপজেলায় বিশেষায়িত চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও আইসিইউ সংখ্যা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন।

নরসিংদী-৪ আসনের চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখন সেই অভিজ্ঞতাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মনোহরদী ও বেলাবোর মানুষ যেমন প্রত্যাশা করছেন উন্নয়নের নতুন গতি, তেমনি সারাদেশের নাগরিকও চাইছেন একটি কার্যকর ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

তবে বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্যখাতের সংকট রাতারাতি কাটানো সম্ভব নয়। এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা, যার সমাধানও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি। প্রয়োজন নীতিগত ধারাবাহিকতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বাজেট বৃদ্ধি এবং কার্যকর নজরদারি। শুধু অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন সেবা সংস্কৃতি বদলানোর উদ্যোগ।

স্বাস্থ্যখাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি রয়েছে সুযোগ। যদি পরিকল্পিত ও টেকসই সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা যায়, তবে পরিবর্তনের পথ খুলতে পারে। অন্যথায় পুরোনো সমস্যার ভারেই নুয়ে পড়বে খাতটি। নতুন নেতৃত্ব সেই ভার সামলে কতটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে—এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে দেশ।

লেখক: সাংবাদিক

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন