বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৭ সফর ১৪৪৮

ফিচার

একটি ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির ইশতেহার

বাহাউদ্দিন গোলাপ জুন ৭, ২০২৬, ১৭:১০:০৫

298
  • একটি ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির ইশতেহার

ইতিহাসের গতিপথ সর্বদা সরলরেখায় চলে না। কিছু ক্ষণ আসে যা কালানুক্রমিক সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে একটি জাতির সামষ্টিক চৈতন্যের অবিনাশী স্মারক হয়ে ওঠে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন তেমনই এক মহিমান্বিত লগ্ন, যখন এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানচিত্র তার শতাব্দীর নীরবতা ভেঙে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক ব্যাকরণ রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিল। দূরদর্শী জননায়ক শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ‘ছয় দফা’ কেবল কাগজের বুকে খোদাই করা কিছু শুষ্ক শাসনতান্ত্রিক অনুচ্ছেদ মাত্র ছিল না; তা ছিল মূলত দীর্ঘকাল ধরে শোষিত ও অবদমিত এক জনপদের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি এবং অস্তিত্ব রক্ষার এক চুড়ান্ত রাজনৈতিক দর্শন। একটি নদী যেভাবে তার নিজস্ব উৎস থেকে যাত্রা শুরু করে সমস্ত কৃত্রিম বাধা ডিঙিয়ে সমুদ্রের অবাধ্য টানে ধাবিত হয়, বাঙালির স্বাধিকারের চেতনাও তেমনি ৭ জুনের রাজপথের রক্ত আর ছয় দফার দর্শনকে পাথেয় করে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে এক সার্বভৌম স্বাধীনতার চূড়ান্ত মোহনায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।

​ঐতিহাসিক পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক জাতীয় সম্মেলনে এই রূপরেখা প্রথম উত্থাপিত হয়। তৎকালীন পাক-ভারত যুদ্ধ-পরবর্তী উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু যখন এই ঐতিহাসিক রূপরেখা সম্মেলনে বিষয় নির্ধারণী কমিটিতে পেশ করেন, তখন পশ্চিম পাকিস্তানি কায়েমি স্বার্থবাদী শাসকগোষ্ঠী স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। তারা এই দাবিকে সম্মেলনের মূল আলোচ্যসূচিতে তুলতেই অস্বীকার করে এবং একে পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। কিন্তু দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু আপোসের পথ বেছে নেননি। ৬ ফেব্রুয়ারি এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি এই দাবি দেশ ও বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেন। ঢাকায় ফিরে আসার পর স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান চরম ক্ষিপ্ত হয়ে একে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আখ্যা দেন এবং অস্ত্রের ভাষায় এই আন্দোলন দমন করার খোলাখুলি হুমকি দেন। তবে আইয়ুব শাহী এটি বুঝতে পারেনি যে, যে দাবির শিকড় জনতার হৃদগের গভীরে প্রোথিত, তাকে কোনো সামরিক বুট দিয়ে পিষে ফেলা সম্ভব নয়।

এই ঐতিহাসিক সনদের নেপথ্যে ছিল এক দীর্ঘ ও সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি। পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তানের কাঠামোগত বৈষম্যকে বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। একই সাথে, পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসে বাঙালির প্রতি বৈষম্যের স্বরূপ ভেতর থেকে প্রত্যক্ষ করা তৎকালীন সিএসপি কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস (যিনি পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন) গোপনে বঙ্গবন্ধুকে প্রশাসনিক ও সংখ্যাতাত্ত্বিক অকাট্য তথ্য সরবরাহ করে এই দলিলের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাকে মজবুত করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে ঢাকার ঐতিহাসিক কাউন্সিলে এই ‘ছয় দফা’ সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের দলীয় ইশতেহার হিসেবে গৃহীত হয়। এই কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন, যা বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে। এই প্রচারণাকে বেগবান করতে বঙ্গবন্ধু নিজের নামে ‘আমাদের বাঁচার দাবী: ৬-দফা কর্মসূচী’ শিরোনামে একটি ঐতিহাসিক পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যা বাঙালির স্বাধিকারের প্রথম আনুষ্ঠানিক লিখিত দলিল হিসেবে মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যায়।

​নির্বাচনে অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের পরও যখন সামরিক জান্তা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, তখনই নিয়মতান্ত্রিক ও যুক্তিনির্ভর ছয় দফা স্বাধিকারের গণ্ডি পেরিয়ে এক দফায় রূপ নেয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সেই মহাকাব্যিক বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার মূল জ্বালানি ও আইনি যৌক্তিকতা সরবরাহ করেছিল ১৯৬৬-এর এই ঐতিহাসিক ছয় দফা। রক্তক্ষয়ী

৯ মাসের যুদ্ধ এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর যে লাল-সবুজের পতাকার জন্ম হলো, তা আসলে ৭ জুনের শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা ঐতিহাসিক সনদেরই এক চূড়ান্ত, নান্দনিক ও সার্বভৌম ফসল। এই সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের চুলচেরা ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিক্রমা আজ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ।

আজ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আমরা যখন একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের মুখোমুখি, তখন ইতিহাসের ধুলোবালি পেরিয়ে এই ছয় দফা আমাদের সামনে এক নতুন ও শাণিত প্রাসঙ্গিকতায় উদ্ভাসিত হয়। ছয় দফা কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তিই ছিল না, বরং তা ছিল একটি স্বনির্ভর ও স্বশাসিত জাতিসত্তা বিনির্মাণের চিরন্তন রক্ষাকবচ। বর্তমান বাংলাদেশের সমসাময়িক উন্নয়ন অভিযাত্রায় অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ১৯৬৬ সালের এই মুক্তির সনদ আজও সমভাবে পথপ্রদর্শক। ৭ জুনের আত্মদান ও ছয় দফার মূল চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের সার্বভৌমত্ব কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, তা নিহিত থাকে নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাসের মেলবন্ধনে। ইতিহাসের গৌরব আর আগামীর সমৃদ্ধির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা তাই আমাদের জাতীয় বিকাশের এক শাশ্বত এবং চির অনির্বাণ আলোকবর্তিকা।

লেখক: গবেষক, সংগঠক, সংস্কৃতি কর্মী।

নিউজজি/নাসি  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers