বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৭ সফর ১৪৪৮

ফিচার

​আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছি?

বাহাউদ্দিন গোলাপ জুলাই ২০, ২০২৬, ১৪:৩১:১৭

292
  • বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। ছবি: ইন্টারনেট।

ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশদ্বারে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যটি যখন বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন দৃশ্যটি কোনো সাধারণ উচ্ছেদ অভিযানের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছিল আমাদের সামগ্রিক ইতিহাসের ওপর এক নির্মম কুঠারাঘাত। যে তরুণ মাত্র আঠারো বছর বয়সে নিজের জীবন বিলিয়ে এই দেশের মানচিত্র কিনেছিলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে তাঁর স্মারক ধূলিসাৎ করার পেছনে যে রাষ্ট্রীয় তৎপরতা আমরা দেখলাম, তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু তার চেয়েও বড় ধাক্কাটি লেগেছিল এর পরবর্তী রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ায়। একটি ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে, শত শত মানুষের চোখের সামনে রাষ্ট্রীয় একটি স্মারক এভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গেল, আর আমাদের প্রশাসনের স্থানীয় পাহারাদারেরা সম্মিলিত কণ্ঠে দাবি করলেন—তাঁরা কিছুই জানেন না। এই নির্লিপ্ততা কেবল দাপ্তরিক ব্যর্থতা নয়; এটি আসলে আমাদের রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংস্কৃতির গভীর পচনকে নির্দেশ করে।

সেই সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর পাতায় প্রশাসনের কর্তাদের যে বক্তব্যগুলো ছাপা হয়েছিল, তা কোনো দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থার উদাহরণ হতে পারে না; এটি ছিল স্রেফ এক সম্মিলিত দায় এড়ানোর মহোৎসব। দৈনিক সমকাল, দ্য ডেইলি স্টার কিংবা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর দিকে তাকালে এক অদ্ভুত তামাশা নজরে আসে। ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রকৌশল শাখা অবলীলায় দায় চাপিয়েছিল জেলা প্রশাসনের ওপর, সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন কারা এটি অপসারণ করছে তা তাঁদের জানাই নেই, এমনকি পৌরসভার শীর্ষ পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে নিজেদের সম্পৃক্ততা পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছিল। যে আমলারা সামান্য ফুটপাত সরাতেও আইনের শত পৃষ্ঠা ওল্টান, তাঁরা একটা আস্ত চত্বর ধূলিসাৎ হওয়া পর্যন্ত টেরই পেলেন না—এই গল্প আধুনিক শাসনব্যবস্থায় এক বিরাট ফাঁকফোকর। আমলাতন্ত্রের এই ‘জানি না’র সংস্কৃতি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত ক্ষমতা কাঠামোর জবাবদিহিহীনতার এক স্থায়ী ব্যাধি। যেকোনো প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যেভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলতে চান, এই ঘটনা তারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

এই সমন্বয়হীনতা ও ঐতিহাসিক উদাসীনতার চূড়ান্ত রূপটি উন্মোচিত হয়েছিল তৎকালীন জেলা প্রশাসকের একটি জবানবন্দিতে। তিনি গণমাধ্যমের কাছে দায় এড়ানোর সুরে অন্য দপ্তরের দিকে আঙুল তুললেও সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছিল তাঁর একটি আকস্মিক স্বীকারোক্তিতে। দেশের একটি জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, এটি যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ছিল, তা তাঁর জানাই ছিল না! একটি জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তার মনস্তত্ত্বে যখন দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা এমন প্রান্তিক আর অচেনা অবস্থানে থাকেন, তখন বুঝতে হবে আমাদের প্রটোকল কালচার সাধারণ মানুষের আবেগ ও জাতীয় গৌরব থেকে কতটা যোজন যোজন দূরে সরে গেছে। যখন নীতিনির্ধারকদের কাছে বীরের স্মারক আর সস্তা ইটের ইমারত একাকার হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে জাতির নৈতিক মেরুদণ্ডে ঘুণ ধরেছে।

পরবর্তীতে অবশ্য সড়ক নিরাপত্তার একটি যুতসই দোহাই দিয়ে বলা হয়েছিল যে, কুষ্টিয়া-খুলনা ও ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়কের সংযোগস্থলের ওই অসম্পূর্ণ বেদিটি দূরপাল্লার বাসের জন্য বিপজ্জনক ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি করছিল এবং জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ীই জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে এই অপসারণ প্রক্রিয়া চলেছে। জননিরাপত্তার এই যুক্তি যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নিই, তাহলেও প্রশ্ন থাকে—একটি জাতীয় আবেগের স্মারক স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি কেন চোরের মতো লোকচক্ষুর অন্তরালে, গভীর গোপনীয়তায় করতে হলো? যদি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত পূর্বপরিকল্পিতই হয়ে থাকে, তবে ভাঙার আগে কেন নতুন নিরাপদ স্থানে তার বিকল্প ব্যবস্থা বা ভিত্তিপ্রস্তর দৃশ্যমান করা হলো না? কেন আগে থেকেই জনগণকে কিংবা গণমাধ্যমকে আস্থায় নিয়ে একটি সুষ্ঠু ও মর্যাদাপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হলো না? প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের এই লুকোছাপা আর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যই প্রমাণ করে, আমলাতন্ত্রের কাছে জাতীয় প্রতীকগুলো স্রেফ ফাইলের কিছু জড় বস্তু, যার কোনো আত্মিক মূল্য তাদের কাছে নেই।

“যে জাতি তার বীরদের সম্মান করতে জানে না, সে জাতিতে কখনো বীরের জন্ম হয় না”—এই আপ্তবাক্যটি আমরা কেবল বক্তৃতার মঞ্চেই আউড়ে যাই। বাস্তবে ক্ষমতার পালাবদল, আদর্শিক দেউলিয়াত্ব আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বলী হয় আমাদের জাতীয় গৌরব। আমরা তো এমন এক বাংলাদেশ চাইনি, যেখানে নীতিনির্ধারকদের ঠান্ডা মাথার ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যাবে কোটি মানুষের জাতীয় সেন্টিমেন্ট। পরবর্তীতে পুলিশ লাইন্সের সামনে নতুন ভাস্কর্য গড়ার যে আশ্বাসই দেয়া হোক না কেন, তা আমাদের এই অপূরণীয় মানসিক ক্ষত পুরোপুরি উপশম করতে পারে না। রাষ্ট্রীয় যে কোনো স্মারক স্থানান্তর বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেন এমন অপেশাদার ও অসংলগ্ন লুকোচুরির আশ্রয় নেওয়া হলো, তার তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং দেশজুড়ে সমস্ত বীরশ্রেষ্ঠ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মারকসমূহের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। লজ্জার এই ক্ষত মুছে ফেলার দায়িত্ব আমাদের সবার। আসুন, বীরের অপমান রুখে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের স্পষ্ট করে বলার সময় এসেছে—আমরা এই অবমাননা ও বিস্মৃতির বাংলাদেশ কখনো চাইনি, আর চাইবও না।

(লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী)

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers