রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮ , ৯ জিলকদ ১৪৪২

ফিচার

নভেরা আহমেদ একটি রহস্যময় নাম

নিউজজি ডেস্ক মে ৬, ২০২১, ১১:২৬:০৪

  • সংগৃহীত

ঢাকা : আধুনিক সময়ের কিংবদন্তি। এর কিছুটা তাঁর নিজের সৃষ্টি আর কিছু অংশের স্রষ্টা তাঁর বিহ্বল বন্ধুরা। ১৯৬০ সালে নভেরার এক প্রদর্শনীর পুস্তিকায় শিল্পাচার্য জয়নুল তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আজ এখানে নভেরা যা করছেন, তা বুঝতে আমাদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।’ শুধু তাঁর কাজের ক্ষেত্রে নয়, ব্যক্তি জীবনে তাঁর পশ্চিমা ধরনের চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, ভবঘুরে স্বভাব তাঁর সম্পর্কে একটি মিথ তৈরি করেছিল।

‘কালো ট্রাউজার, কালো ব্লাউজ, গলায় কালো রুদ্রাক্ষের মালা। চোখের নিচে ভ্রূর আদলে দীর্ঘ মেকআপের কালো বাঁকা একটা রেখা টানা।’ এভাবেই নভেরার রূপের বর্ণনা করেছেন কথা সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই। নভেরা বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক ভাস্কর ও শহীদ মিনারের একজন নকশাকার যাঁর শেষ জীবন স্বেচ্ছা নির্বাসনে কেটেছে প্যারিসে। ১৯৬০ সালের শেষ দিকে তাঁর স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে বিভিন্ন মহল অনেক গল্প ছড়াতে থাকে। এমনকি তাঁর পরিচিত কেউ কেউ তিনি মারা গেছেন বলেও প্রচার করে।

এই নভেরাই যে আমাদের দেশের প্রথম আধুনিক ভাস্কর তা আমরা সবাই কমবেশি জানি; কিন্তু তাঁর জীবন ও শিল্পকর্মের কতটুকুইবা জানা সম্ভব? অথচ তাঁকে নিয়ে বিদগ্ধ বাঙালি সমাজে আগ্রহের শেষ নেই। ১৯৯৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় হাসনাত আবদুল হাইয়ের নভেরা নামে একটি উপন্যাস ছাপা হলে প্রায়-বিস্মৃত এই শিল্পীর জীবনের কিছু অধ্যায় নিয়ে চারদিকে হইচই পড়ে যায়।   

নভেরার জন্ম ১৯৩০ সালের দিকে। চাকরি সূত্রে বাবা সাইদ আহমেদ কলকাতায় ছিলেন। কলকাতার লরেটো থেকে নভেরা ম্যাট্রিকুলেশন করেছেন। নাচ শিখেছেন, গানও গাইতেন। শিল্পের বেশ কয়েকটি শাখায় নভেরার ঝোঁক ছিল, কিন্তু শেষে ভাস্কর্যই তিনি বেছে নিলেন। দেশভাগের পর তাঁর বাবা কুমিল্লায় বদলি হয়ে আসেন। নভেরা তখন কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। বাবার অবসর গ্রহণের পর সবাই আদি নিবাস চট্টগ্রামে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন নভেরা। এ সময় নজরুলের এক জন্মোৎসবে নভেরা চট্টগ্রামের জুবিলি হলে এক ঘণ্টা নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন।

জয়জয়ন্তী রাগে মিউজিক বাজানো হয়েছিল, পরিচালনায় ছিলেন তরুণ লেখক সুচরিত চৌধুরী। শোনা যায়, অল্প বয়সেই এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল, তবে তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বাবা-মা তাঁকে আবার বিয়ের জন্য চেষ্টা চালান তবে তিনি বিয়েতে রাজি হননি। ১৯৫০ সালে নভেরা লন্ডনে যান। লন্ডনে তখন তাঁর মেজ বোন শরিফা আলম পিয়লি বিবিসির একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। তখন বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন নাজির আহমেদ। তিনি লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন।

নাজির আহমেদের ছোট ভাই হামিদুর রাহমান তখন ঢাকা আর্ট কলেজে পড়তেন, কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের একজন তিনি, তাঁর সহপাঠী ছিলেন আমিনুল ইসলাম। হামিদ যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, তখন নাজির আহমেদ তাঁকে নিয়ে প্যারিসের বোজ আর্ট স্কুলে ভর্তি করান। কিন্তু হামিদ প্যারিসে থাকতে পারেননি, তিনি লন্ডনে ফিরে ভাইয়ের ফ্ল্যাটেই উঠলেন। তখনই নভেরার সঙ্গে পরিচয় হামিদের। এই পরিচয় দুজনের জন্যই একটু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। লন্ডনে হামিদ সেন্ট্রাল স্কুল অব আর্টে পড়তেন। ১৯৫১ সালে নভেরা ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে ভর্তি হলেন।

পাশ্চাত্যের চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যের ঘটনাবহুল সময়ে নভেরা ইংল্যান্ডে যান। ইংল্যান্ড ছাড়াও তিনি ইতালি ও প্যারিসে প্রাচীন ও আধুনিক ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি সেজান, গগাঁ ও ভ্যান গঘের কাজ সম্পর্কে জানার, পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রাহমান একসঙ্গে ফ্লোরেন্সে যান। প্রথমে তাঁরা শিল্পী আমিনুল ইসলামের আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং পরে তিনজন একটি স্টুডিওতে উঠেন। নভেরা দুই মাস মাস ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন শিল্পকর্ম দেখেন। ক্যাম্বারওয়েল স্কুলের ড. ফোগেল, ভেন্তুরিনো ভেন্তুরির নামে এক ইতালীয় শিল্পীর কাছে নভেরার নাম উল্লেখ করে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। এই শিল্পীর সাহচর্যে নভেরা দোনাতেলোসহ প্রাচীন কয়েকজন শিল্পীর কাজের সঙ্গে পরিচিত হন এবং দুই মাস তাঁর কাছে কাজ শেখেন। পরে ফ্লোরেন্স থেকে ভেনিসে যান নভেরা ও হামিদ এবং সেখান থেকে লন্ডন ফিরেন। ১৯৬৪ সালেই বড়দিনের ছুটিতে নভেরা ও হামিদ প্যারিসে রঁদার জাদুঘর দেখতে যান। রঁদার কাজ দেখে ভাস্কর্যের ছাত্রী স্বভাবতই অভিভূত হয়েছিলেন।

১৯৫৬ সালের জুনে নভেরা ও হামিদ একসঙ্গে দেশে ফিরেন। ঢাকায় তখন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের পরিকল্পনায় আধুনিক স্থাপত্য নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তাঁরই উদ্যোগে নবনির্মিত পাবলিক লাইব্রেরি—পরে যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে রূপান্তরিত হয়েছে, সেখানে তাঁরা দুজনেই কাজ করার সুযোগ পান। ১৯৫৭ সালে ওই গ্রন্থাগারেই তাঁদের যৌথ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। সেই সময় এক নতুন ধরনের কাজের সঙ্গে পরিচিত হলো বাংলাদেশের মানুষ।

১৯৫৭ সালেই দুই শিল্পী শহীদ মিনারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু সরকারি খাতায় নভেরার নাম না থাকায় শহীদ মিনারের নকশা পরিকল্পনায় তাঁর অবদানের প্রসঙ্গটি বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা প্রণয়ন করার অনুরোধ করেন প্রধান প্রকৌশলী জব্বার এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে। জব্বারের অন্যতম সহকর্মী ছিলেন প্রকৌশলী শফিকুল হক যিনি নভেরার বড় বোন কুমুম হকের স্বামী।

জয়নুল আবেদিন সরাসরি হামিদকে স্কেচসহ মডেল পেশ করতে বলেছিলেন। স্থাপত্য ভাস্কর্যের মূল নকশার পরিকল্পনা যে নভেরা ও হামিদের যৌথ চিন্তার ফসল তা সহজ সত্য ছিল। ভাস্কর্যের নকশা পরিকল্পনায় ভাস্করের সহযোগিতা থাকবে না-এটি বাস্তবসম্মত নয়। সবার ইচ্ছে ছিল ১৯৫৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজটি শেষ হোক। কাজটি ত্বরান্বিত করতে নির্মাণাধীন মিনারের পাশে দুটি টিনের চালাঘর করে হামিদ ও নভেরার থাকার ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু ৩/৪ মাসে কাজ শেষ হলো না। 

১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক শাসন জারি হলে শহীদ মিনারের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত থাকে। তবে মিনারের মূল বা সম্পূর্ণ পরিকল্পনা কোনোদিনই বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর হামিদ একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে যোগ দিতে আমেরিকায় যান, নভেরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৯ সালে নভেরা বৌদ্ধমন্দির দেখতে মিয়ানমার যান। সেখান থেকে ফিরে বুদ্ধের আসন বা পিস নামকরণে কয়েকটি কাজ করেন।

১৯৬০ সালের আগস্টে এশিয়া ফাউন্ডেশন ও পাকিস্তান ইউনাইটেড নেশনসের যৌথ সহযোগিতায় বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে নভেরার একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়। তখনো ঢাকা আর্ট কলেজে ভাস্কর্য বিভাগ খোলা হয়নি। ১৯৫৭ সালে ভাস্কর্যের ওপর পাঠ ও প্রশিক্ষণ শেষে আমেরিকা থেকে ফিরেন আবদুর রাজ্জাক। তিনি আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৬৩ সালে ভাস্কর্য বিভাগের জন্য আলাদা ভবন নির্মিত হয় এবং ১৯৬৪ সাল থেকে ক্লাস শুরু হয়। আর্ট কলেজে চাকরির সুযোগ থাকলে হয়তো নভেরা ঢাকায় স্থিত হতে পারতেন। ঢাকা তখন প্রাদেশিক রাজধানী মাত্র, স্থাপত্যের সংখ্যা কম ছিল, নভেরা কোনো কাজ পাচ্ছিলেন না বলেই উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁকে লাহোরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। কিছু কাজের ব্যবস্থা তিনি করে দিতে পারবেন—এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।

১৯৬১ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ‘চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য প্রদর্শনী’-এর আয়োজন হয়। বছর দশকের একটি ছেলে ঘরের কাজে নভেরাকে সাহায্য করত, এই প্রদর্শনীর জন্য নভেরা তারই একটি আবক্ষ মূর্তি তৈরি করে দিলেন। কাজটির নাম দিলেন ‘চাইল্ড ফিলোসফার’। এই ভাস্কর্যের জন্য প্রথম পুরস্কার পেলেন নভেরা। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মমতাজ হোসেন দৌলতানা মূর্তিটি কিনেছিলেন। নভেরার আরেকটি কাজ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা পিআইএ কিনেছিল। লাহোরে থাকতেই নভেরার মনে হলো ভরত নাট্যম শেখা প্রয়োজন। স্থির হলো মুম্বাই যাবেন।

ফয়েজ আহমেদ তাঁকে উর্দু লেখক ইসমাত চুগতাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। নভেরা তাঁর বাড়িতেই আতিথ্য গ্রহণ করেন। নাচ সব সময়ই তাঁর প্রিয় শিল্প ছিল। এটি পরিষ্কার, ভাস্কর্যে ব্যবহারের জন্যই নভেরা নাচ শিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিন বছরের কোর্স নয় মাসে শেষ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর হাঁটু এমনভাবে ফুলে গিয়েছিল যে লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারতেন না। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল নভেরার ইউটেরাসে টিউমার হয়েছে। বন্ধুদের সহযোগিতায় তিনি লন্ডনে চলে যান এবং সেখানে ইতালিয়ান হাসপাতালে তাঁর হিসটেকটোমি হয়। এখান থেকে সুস্থ হয়ে নভেরা প্যারিসে চলে যান। এর বছর চারেক পরে তিনি ব্যাংককে এসেছিলেন।

ব্যাংকক পোস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সৈয়দ মহম্মদ আলী ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্যাংককে ছিলেন। তিনি ১৯৬৮ সালের শেষদিকে নভেরার ভাস্কর্যের একটি একক প্রদর্শনীর উদ্যোগ নিলেন। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ এবং অন্য একটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এই প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করল। প্যারিসে নভেরা ব্রোঞ্জ ও অন্যান্য মেটালের বহু কাজ করেছিলেন। সব নিয়েই তিনি ব্যাংককে যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফটোগ্রাফার বন্ধু গ্রেগর দ্য ব্রুনস বা সংক্ষেপে গ্রিশা। তিনি জন্মগতভাবে রুশ হলেও আজন্মই ফ্রান্সে থাকতেন। ভালো ফটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। 

ব্যাংককে প্রদর্শনীর পর প্যারিসে ফিরে যান এবং ১৯৭০ সালের শেষদিকে বহুদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু মহম্মদ আলীর সঙ্গেও তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। তিনি খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করতেন, তবে সঠিক তথ্য সব সময় পাননি। ১৯৭৪ সালে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে নভেরার দেখা হয়, তিনি তাঁর জন্য একটি সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুদান কার্যকর হওয়ার আগেই ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। প্যারিসে থাকাকালে ১৯৮৪ সালে গ্রেগরি দ্য ব্রুহনসকে বিয়ে করে ফ্রান্সের নিভৃত পল্লিতে লোক চক্ষুর অন্তরালে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে একুশে পদকের জন্য নির্বাচিত হন। 

১৯৯৮ সালে জাদুঘরের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের উদ্যোগে ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ ১৪০৫ বাংলা নববর্ষের দিন নভেরা আহমেদের একক ভাস্কর্য প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়ে চলে এক মাস। জাদুঘরের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাস্কর নভেরা আহমেদ হল’। ১৯৭৪ সালের সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকে নভেরা হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতেন। ২০১৪ সাল থেকে তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। ২০১৫ সালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং ওই বছর ৫ মে তিনি মারা যান। তাঁকে ফ্রান্সই সমাহিত করা হয়।

নভেরার ভাস্কর্য তৈরির মূল প্রবণতা ছিল ‘ফিগারেটিভ এক্সপ্রেশন’ এবং প্রধান বিষয়বস্তু ছিল নারীর প্রতিমূর্তি। তথাকথিত ভাস্কর্য শিল্পে আমরা ইন্দ্রিয় সুখাবহ নারীর যে রোমান্টিসিজম দেখি, নভেরার তৈরি ভাস্কর্যগুলো এই বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত এবং অনেক বেশি মেদহীন, ঋজু। তাঁর ভাস্কর্যে মূর্ততার চেয়ে বেশি জোর দিতেন বিমূর্ত অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে। নভেরার ভাস্কর্যের মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে ‘চাইল্ড ফিলোসফার’, ‘মা ও শিশু’, ‘এক্সটার্মিনেটিং অ্যাঞ্জেল’, ‘পরিবার’ (১৯৫৮), ‘যুগল’ (১৯৬৯), ‘ইকারুস’ (১৯৬৯), ‘জেব্রা ক্রসিং’ (১৯৬৮) ইত্যাদি।

১৯৭৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্যারিসে নভেরার বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর ৪৩টি চিত্রকর্মের খোঁজ মেলে। তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ বিদ্যমান ঢাকার শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে, এ ছাড়া প্যারিসে গ্রেগরি দ্য ব্রুহনসের স্টুডিওতে নয়টি ভাস্কর্য ও ৪৩টি চিত্রকর্ম রয়েছে।

১৯৫৮ সালে স্থপতি হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের যৌথ একটি প্রদর্শনী হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারে। এরপর তিনবার নভেরার একক শিল্পকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ৪১ বছর অন্তরালের পর ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি থেকে প্যারিসে নভেরার একটি রেট্রোস্পেকটিভ প্রদর্শনী হয়।

নভেরাকে নিয়ে আমরা পেয়েছি কথা সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই রচিত জীবনীভিত্তিক উপন্যাস ‘নভেরা’ (প্রকাশকাল-১৯৯৪), এন রাশেদ চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘শিল্পী নভেরা আহমেদের সৃজন ভুবন ন হন্যতে’ (১৯৯৯) ও চয়ন খায়রুল হাবিবের কবিতা ‘নভেরায় হংসনিল’।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers