বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮ , ১৪ জুমাদাউস সানি ১৪৪৩

ফিচার

ত্যাগী ও বিচক্ষণ রাজনীতিক ছিলেন সোহরাওয়ার্দী

ফারুক হোসেন শিহাব ডিসেম্বর ৫, ২০২১, ১২:৩৪:৪০

134
  • ত্যাগী ও বিচক্ষণ রাজনীতিক ছিলেন সোহরাওয়ার্দী

ঢাকা : উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন এক প্রতিভাবান রাজনৈতিক সংগঠক। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে কলকাতা খেলাফত কমিটির সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে তিনি প্রথম তাঁর যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। একজন শ্রমিকনেতা হিসেবে কলকাতায় রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু করে তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যে নাবিক, রেলকর্মচারী, পাটকল ও সুতাকল কর্মচারী, রিক্সাচালক, গাড়িচালক প্রভৃতি মেহনতি মানুষের প্রায় ৩৬টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তোলেন।  

শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মৃত্যুবার্ষিকীতে পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তিনি ১৮৯২ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দীর কনিষ্ঠ সন্তান। 

সোহরাওয়ার্দী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি (সম্মান) ও বি.সি.এল ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরে লন্ডনের গ্রেইজ ইন থেকে ব্যরিস্টার-এট-ল সম্পন্ন করেন। ১৯২০ সালে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে ফিরেই তিনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এ দেশের শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯২৬ সালে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯২৯ সালে পরবর্তী অ্যাসেম্বলি নির্বাচনের সময় তিনি বেঙ্গল মুসলিম ইলেকশন বোর্ড নামে অপর একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পূর্বে সোহরাওয়ার্দী কলকাতায় ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন এবং নিজে এই দলের সম্পাদক হন। সোহরাওয়ার্দী সাংগঠনিক শক্তির সুবাদেই মুসলিম লীগ ভারতের সর্বমোট ১১ প্রদেশের মধ্যে কেবল বাংলায় সাফল্য অর্জন করে। ১২১ টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৯টি আসন পায় মুসলিম লীগ এবং ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক-প্রজা পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠনে সমর্থ হয়।

১৯৩৭-৪৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে সোহরাওয়ার্দী সমগ্র প্রদেশে দলকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন বাংলায় মুসলিম লীগের স্থপতি। হক-বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে তথাকথিত শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার (১৯৪১-১৯৪৩) পতন ঘটানোর ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন মূল শক্তি। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের বিস্ময়কর বিজয়ের রূপকারও ছিলেন তিনি। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগ ১২১টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে জিতেছিল ১১৪টি আসনে।

ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের প্রাক্কালে সোহ্রাওয়ার্দী সমগ্র বাংলা, আসাম ও বিহারের মানভূম, সিংভূম ও সম্ভবত পূণির্য়া জেলা সমন্বয়ে পূর্বভারতে ‘বৃহৎ বাংলা’ নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি মুসলিম লীগ সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল তার অন্যতম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূল নেতাদের অন্যতম।

১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়ের পেছনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি সাংবিধানিক শাসনে ছিলেন দৃঢ়বিশ্বাসী; আর এ কারণেই তিনি ১৯৫৪ সালে দলীয় আপত্তি উপেক্ষা করে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। তিনি পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৯৬৩ সালের এই দিনে লেবাননের একটি হোটেলে নিঃসঙ্গ অবস্থায় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয়। ঢাকার হাইকোর্টের পাশে তিন নেতার মাজারে প্রখ্যাত এই নেতার সমাধি।

সোহরাওয়ার্দী একজন বাস্তববাদী রাজনীতিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তার আদর্শ-চেতনা আজো অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উজ্জীবিত করে।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন