সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৪ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিচিত্র

বরফের গভীরে মিলল হারিয়ে যাওয়া এক ‘পৃথিবী’!

নিউজজি ডেস্ক ৩ জানুয়ারি , ২০২৬, ১৪:১৫:৫১

279
  • ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: প্রায় ৫৫ লাখ বর্গমাইল আয়তনের অ্যান্টার্কটিকা রহস্যে ঘেরা একটি মহাদেশ। পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম এ অঞ্চলের প্রায় সব অংশই পুরু বরফে ঢাকা, যা স্থায়ী মানব বসতির জন্য অনুপযুক্ত। মহাদেশের অনেক অংশে মানুষ এখনও পা রাখেনি, ফলে এখানে অনেক রহস্য অজানা রয়ে গেছে।

গবেষকরা বলছেন, অ্যান্টার্কটিকা শুরু থেকেই বরফে ঢাকা ছিল না। কোটি কোটি বছর আগে এটি ছিল সবুজে ঘেরা বনভূমি, গভীর জঙ্গল-ঢাকা এলাকা। বর্তমানে বরফের তলায় লুকিয়ে আছে সেই হারানো পৃথিবী। আজও অ্যান্টার্কটিকায় কিছু গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ দেখা যায়, তবে একসময় এখানে বড় বড় উদ্ভিদ ও ঘন বনভূমি ছিল। এখন যেখানে পেঙ্গুইনরা ঘুরে বেড়ায়, সেই সব জায়গা বহু বছর আগে সবুজ বনভূমিতে ভরা ছিল।

অ্যান্টার্কটিকায় কখনও স্থায়ী মানব বসতি গড়ে ওঠেনি। শুধুমাত্র গবেষণার জন্য সাময়িকভাবে মানুষ এখানে অবস্থান করে। কয়েক বছর আগে ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট জেমিসনের নেতৃত্বে এক গবেষণা চলছিল, যেখানে তারা অ্যান্টার্কটিকার বরফের আস্তরণে ছোট ছোট পরিবর্তন খুঁজছিলেন। দুই কিলোমিটার গভীর বরফ খুঁড়ে তারা এমন কিছু আবিষ্কার করেন, যা এই মহাদেশ নিয়ে ধ্যানধারণা পুরোপুরি পাল্টে দেয়।

ড্রিল মেশিন দিয়ে সাবধানে একটু একটু করে বরফের গায়ে গর্ত করা হচ্ছিল। সেই গর্ত খুঁড়ে প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে যাওয়ার পরে তারা খুঁজে পান এক হারিয়ে যাওয়া জগৎ। বরফের নীচে চাপা পড়ে থাকা পলির নমুনায় পাওয়া যায় উদ্ভিদের জীবাশ্ম। তার মধ্যে যেমন রয়েছে পরাগরেণুর নমুনা, তেমনই রয়েছে গাছের পাতার টুকরো‌ টুকরো জীবাশ্ম । বহু বছর আগে মৃত কিছু অণুজীবের নমুনাও মেলে। ওই নমুনাগুলো পরীক্ষা করে গবেষকদের দাবি, এগুলো প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছরের পুরনো।

পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার উইলকিস ল্যান্ড এলাকায় এই গবেষণাটি চালান জেমিসনরা। তাদের দাবি, উদ্ভিদের যে ধরনের নমুনা মিলেছে, তা আভাস দেয়, পুরো এলাকাই এক সময়ে গভীর অরণ্যে মোড়া ছিল। জেমিসনের কথায়, এটা একটি টাইম ক্যাপসুলের মতো। এটা এমন এক সময়ের হারিয়ে যাওয়া জগতের কথা বলে, যখন অ্যান্টার্কটিকা এখনকার মতো বরফে মোড়া প্রান্তর ছিল না।

বরফের নিচে হারিয়ে যাওয়া এই বনভূমির সন্ধান পাওয়ার পরে গবেষণা আরও প্রশস্ত করেন জেমিসনেরা। গবেষণার জন্য তারা কানাডার কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থা ‘র‌্যাডারস্যাট’-এর সাহায্য নেন। ওই কৃত্রিম উপগ্রহ-প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা বরফের স্তরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। তাতে ভূপৃষ্ঠে নদী-উপত্যকার মতো কিছু গড়ন দেখতে পান তারা। গবেষকদের অনুমান, কোটি কোটি বছর আগে এই অ্যান্টার্কটিকায় নদীও ছিল।

যদিও এই বনভূমি যে সময়ে তৈরি হয়েছিল, তখন অ্যান্টার্কটিকা আক্ষরিক অর্থে অ্যান্টার্কটিকা হয়ে ওঠেনি। জন্মই হয়নি অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের। তখন এই অংশটি ছিল ‘সুপার কন্টিনেন্ট’ গন্ডোয়ানার অংশ। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মিশে ছিল অ্যান্টার্কটিকাও। ১৮ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে গন্ডোয়ানা ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে। তৈরি হতে থাকে এক একটি মহাদেশ। গবেষকদের দাবি, তার আগে পর্যন্ত এই অ্যান্টার্কটিকায় নদী-জঙ্গল সবই ছিল। ‘সুপার কন্টিনেন্ট’ ভেঙে যাওয়ার পরেও সেগুলোর অস্তিত্ব ছিল। তারপর ধীরে ধীরে বরফের চাদরের নিচে চাপা পড়ে যায় সুবিশাল এই বনভূমি।

অ্যান্টার্কটিকায় এই হারিয়ে যাওয়া এ অরণ্যের সন্ধান পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কাছে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন জেমিসনরা। তাদের বক্তব্য, কোটি কোটি বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকার গড়ন, বিশেষত বরফের স্তর কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে, তা বুঝতে সাহায্য করবে এই গবেষণা। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আগামী দিনের গবেষণাতেও অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers