সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ১ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

জয় হোক শ্রমজীবীর

শ্যামা সরকার ১ মে , ২০২৫, ১০:৪৮:০৫

471
  • ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: স্বাস্থ্য। শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার অবস্থা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মানসিক চাপ, সকলের সাথে সুসম্পর্ক এবং প্রশান্তি- এসব কিছুই স্বাস্থ্যের অন্তর্গত। এছাড়া আর্থিক স্বাস্থ্যও সুস্থতার সার্বিক অবস্থাকে বিবেচনা করে। কর্মস্থলে মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে কেন্দ্র করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন খাতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রমিকরা কাজ করছেন। দীর্ঘ সময় উচ্চশব্দ, ধূলিকণার মধ্যে কাজ করার কারণে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি হারানো, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগসহ একজন ব্যক্তি হারিয়ে ফেলে আচরণগত ভারসাম্য। কাজের অনুকূল পরিবেশ ও নিরাপদ না হলে মানসিক স্বাস্থ্য তথা সামগ্রিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে হ্রাস পায় উৎপাদনশীলতার হার এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি থাকে শ্লথ। 

এ ধরনের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইট-পাথর ভাঙার কাজ করছেন শ্রমিকরা। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে ছুটছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে ‘শ্রমিক মালিক এক হয়ে, গড়বো দেশ নতুন করে’ প্রতিপাদ্যে পালন করা হচ্ছে মহান মে দিবস।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে দিনটি। তবে এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। ঠিক এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে বিশ্ববাসী পালন করেছে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক দিন ‘মহান মে দিবস’। শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন-সংগ্রামে অনুপ্রেরণার উৎস এই দিবসটি মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠারও দিন। মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা মনে হলে ফ্রেডারিখ এঙ্গেলসের উক্তিটি মনে আসে সবার আগে :

‘৮ ঘণ্টা কাজের দিনের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সময়

আমরা কখনও ভুলব না যে, আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো

বুর্জোয়া মজুরি দাসত্ব ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন’

কার্ল মার্কসের অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহকর্মী ফ্রেডারিখ এঙ্গেলসের নেতৃত্বে ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের ১শ’ বছর পূর্তিতে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ২০টি দেশের কমিউনিস্ট প্রতিনিধিরা এ কংগ্রেসে যোগদান করেন। এখানেই পহেলা মে’কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস বা মে দিবস হিসেবে পালনের জন্য সিদ্ধান্ত হয়। এ সময় সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করেন জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন। ঘোষণাটি ছিল : ১৮৯০ সালের ১ মে থেকে প্রতি বছর পহেলা মে’কে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। সেই থেকে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ দিনটিকে বিভিন্নভাবে পালন করা হয়। 'মে ট্রি’ হলো কাঁটাযুক্ত ফুলগাছ। আর এ গাছের ফুল 'মে ফ্লাওয়ার’ নামে পরিচিত। 'মে' হলো ইংরেজি বছরের পঞ্চম মাস, প্রাচীন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তৃতীয় মাস। ইউরোপে ১ মে পালন করা হয় বসন্ত উৎসব। এ উৎসবে যে তরুণীকে ফুলের মুকুট পরিয়ে রানী সাজানো হয়, তাকে বলা হয় 'মে কুইন'। আর 'মে পোল' হলো ইউরোপীয়দের বসন্ত উৎসবে ফুলে সজ্জিত খুঁটি, যার চারপাশ ঘিরে নাচ হয়। এছাড়া 'মে' অর্থ হলো আনন্দ-উল্লাস, শুভকামনা ও আবেগঘন মুহূর্তের আহ্বান। 'মে হেন' অর্থ ক্ষতিপূরণ দাবি করা, বিশৃঙ্খলা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার অবস্থা। অন্যদিকে, 'মে ডে' বা মে দিবস হলো আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস। ওপরের এ লাইনগুলোর সঙ্গে অর্থগত দিক থেকে কোন না কোন সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়।

সভ্যতা বিকাশে দাসপ্রথা উচ্ছেদ হলেও শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের শুরু থেকেই শোষিত-নিপীড়িত ছিলেন শ্রমিকরা। ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিবাদ এক পর্যায়ে পরিণত হয় সমষ্টিগত আন্দোলনে। ফলশ্রুতিতে ১৮০৬ সালে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় জুতা শিল্পের শ্রমিকরা কর্মঘণ্টা কমানোর দাবিতে ধর্মঘট শুরু করেন। দীর্ঘ ২১ বছর আন্দোলনের পর ১৮২৭ সালে ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন। 

৮ ঘণ্টা র্কমঘণ্টার দাবতিে আন্দোলনরে র্সবপ্রথম উদ্যোগ নয়ে ইংল্যান্ডরে ‘গ্র্যান্ড ন্যাশনাল কনসোলডিটেডে ট্রডেস্ ইউনয়িন’। এরপর লন্ডনরে বভিন্নি সংগঠন সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার দাবিতে একটানা ৬ মাস সফল র্ধমঘট চালয়িছেলি।

১৮৪৫ সালে তুলা শিল্পে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, স্যানিটেশন ও কর্ম সময় নিয়ে ম্যাসাচুয়েটস-এ দ্য ফিমেল লেবার রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন করা হয়। এরপর ১৮৫৭ সালে ৮ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সুচ কারখানায় নারী শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য মজুরির বৈষম্য ও দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।

১৮৬০ সালে নিউ ইংল্যান্ডে ২০ সহস্রাধিক জুতা তৈরির শ্রমিক দাবি আদায়ের জন্য ধর্মঘট করেন। দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে বিশ্বের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট হয়েছিল ১৮৬২ সালের মে মাসে। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ক্রীতদাসদের মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত শ্রমিক আন্দোলনে নতুন মাত্রা এনে দেয়। ১৮৬৬ সালে বাল্টিমোড়ে ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের প্রতিবাদ ও পর্যায়ক্রমে ১৮৮৪ সালে শিকাগো শহরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা করেন এবং দাবি আদায়ের জন্য ১৮৮৬ সালের ১ মে পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৬ সালের ৪ মে শিকাগোর হে-মার্কেটে মিছিলে বোমা বিস্ফোরণে একজন পুলিশসহ ৯ জন এবং পুলিশের গুলিতে আরও চার শ্রমিক নিহত হন। ১৮৮৭ সালে আমেরিকার শ্রমিক সংগঠনগুলো ১ মে শ্রমিক মুক্তি দিবস পালন করে। ১৮৯১ সাল থেকে দিবসটি বিভিন্ন দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো পালন করতে শুরু করে। ১৯০৪ সালে জাতিসংঘ আইএলও কনভেনশনের মাধ্যমে এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে আন্তর্জাতিকভাবে 'মহান মে দিবস' পালিত হচ্ছে শোষিত শ্রমিকের অধিকার আদায় ও বিজয়ের প্রতীক হিসেবে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ৮০টি দেশ এ সনদে স্বাক্ষর করে। কিন্তু আমেরিকা আজও এ সনদে স্বাক্ষর করেনি। এমনকি আমেরিকা ও কানাডা এ দিবসটি পালনও করে না। বরং এ দেশ দুটি সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার ‘জাতীয় শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে।

আমরেকিায় যুক্তরাষ্ট্রীয় আইনসভায় সরকারি শ্রমকিদরে র্কমসময় ৮ ঘণ্টা নর্ধিারণরে আইন পাস করা হলওে বসেরকারি শ্রমকিদরে ভাগ্যরে পরর্বিতন হয়নি আজও।

স্বাধীন বাংলাদেশে ‘মে দিবস’কে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা হয়। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬ দফা দাবিতে আহূত প্রথম হরতালে আদমজী, টঙ্গী ও তেজগাঁওয়ের শ্রমিকরাই সংগঠিত হয়ে প্রথম লাল পতাকা হাতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। এ সময় অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন অনেক শ্রমিক। বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির জন্য প্রথম আত্মদান করেছিলেন মনুমিয়াসহ অন্তত ১০ শ্রমিক। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্রদের পাশাপাশি শ্রমজীবীরাই পালন করেছিলেন অগ্রণী ভূমিকা।

এর পর থেকেই সংশ্লিষ্টরা শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন। পোশাক শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে মালিকপক্ষকে তা মানতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া শিশুশ্রম বন্ধ, নারী শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ভূমিহীনদের বিনা জামানতে কৃষিঋণ দেয়ার ব্যবস্থা, মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, শ্রমজীবী ও গরিব-দুঃখী মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করতে সোশ্যাল সেফটি নেট জোরদার করা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা প্রভৃতি অব্যাহত রাখা, গরিব মানুষের ঘরে ঘরে বিনামূল্যে সোলার বিদ্যুৎ ল্যাম্প সরবরাহ, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনা খরচায় চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধের ব্যবস্থা করা এবং বিনামূল্যে বই সরবরাহ করে গরিব, শ্রমজীবীর সন্তানদের জন্য অন্তত প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দেয়া হয়।

এতোকিছুর পরেও শ্রমিক বঞ্চনার ইতিহাস নতুন নয়। সব যুগে, সব সমাজে এটি ছিল ও আছে। শ্রমজীবীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হন। সম্প্রতি শ্রমিক কল্যাণে আমাদের দেশে অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তাদের সার্বিক চাহিদা ও কল্যাণ পুরোপুরি সুনিশ্চিত হয়েছে তা বলা যায় না।

তবে এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা অধিক হলেও অনেক শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পান না। তার ওপর বেতন বকেয়া, শ্রমিক ছাঁটাই তো আছেই। কারখানায় কাজের পরিবেশ যেমন অনুকূলে নয়, তেমনি স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। অগ্নিনির্বাপণসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকায় শ্রমিকদের দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে হয় প্রায়ই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। দিতে হবে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা। তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ না করে শিল্পের বিকাশ সম্ভব নয়।

বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট শঙ্কাযুক্ত। গোটা বিশ্বে বিরাজ করছে অস্থিরতা ও আতঙ্ক। তাই মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতাকে ভাবতে হবে নতুন করে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি, বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রায় সব শিল্পকারখানা অটোমেশনের যুগে প্রবেশ করেছে।

বৈশ্বিক এ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রয়োজন শ্রমিকের অধিকার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে শ্রমিকের স্বার্থে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার যাতে তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। সংগ্রাম আর ভবিষ্যতের স্বপ্নপূরণে `মে দিবস’-এর চেতনা আজও অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। জয় হোক শ্রমজীবী মানুষের।

শ্যামা সরকার

অ্যাসস্ট্যিান্ট ডরিক্টের ও প্রধান

কমউিনকিশেন, পাবলিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ

উদ্দীপন।

নিউজজি/পিএম

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers