সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ১ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধ : বহুমাত্রিক বিপর্যয়ের অশনিসংকেত

মো. আবদুর রহিম ২৩ জুন , ২০২৫, ১৬:৪৬:১১

829
  • ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধ : বহুমাত্রিক বিপর্যয়ের অশনিসংকেত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি হামলা গোটা অঞ্চলকে এক অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটে ঠেলে দিয়েছে। এই সংঘাত কেবল দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার সীমায় আবদ্ধ নেই—এটি এক বৈশ্বিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মানবিক সংকটের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ জ্বালানি তেল রপ্তানি হয় পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি হয়ে। ইরান যদি এই প্রণালি বন্ধের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে, তবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। ইতোমধ্যেই তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, এবং এটি আরও তীব্র হলে জ্বালানির দাম হু-হু করে বাড়বে, বিশেষ করে ইউরোপের মতো জ্বালানি-নির্ভর অঞ্চলগুলোর জন্য। এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত পড়বে খাদ্যদ্রব্য, পণ্য উৎপাদন, পরিবহন, এমনকি গৃহস্থালির ব্যয়েও। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি চরমে উঠবে, যার প্রধান শিকার হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো।

এই সংঘাত যদি প্রসারিত রূপ নেয়, তাহলে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনের মতো অঞ্চলে আগে থেকেই সক্রিয় ইরানপন্থি মিলিশিয়ারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-মিত্র স্বার্থে হামলা বাড়াতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ ‘প্রক্সি যুদ্ধের’ মঞ্চে পরিণত হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব অঞ্চল থেকে লাখ লাখ শরণার্থী ইউরোপসহ আশেপাশের দেশে আশ্রয় নিতে চাইবে, যা নতুন করে শরণার্থী সংকট তৈরি করবে।

এদিকে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুততর করতে পারে, এবং পাল্টা হামলার মাধ্যমে হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথিদের ব্যবহার করে ইসরায়েলকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে। সৌদি আরব, তুরস্কসহ আরও দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোতে পারে। এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেবে।

এ যুদ্ধ একপ্রকার কৌশলগত মেরুকরণও সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা একদিকে, অপরদিকে চীন, রাশিয়া ও ইরান সমর্থিত শক্তিগুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই সংঘাত শুধু অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ নয়—এটি সাইবার যুদ্ধেও রূপ নিতে পারে। ইরান ও ইসরায়েল উভয়েই শক্তিশালী সাইবার সক্ষমতা রাখে। হ্যাকারদের টার্গেট হতে পারে তেল-গ্যাস পরিকাঠামো, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিমান চলাচল, এমনকি সরকারি ডেটা সিস্টেমও। যার অভিঘাত ছড়াবে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট নিরাপত্তা, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।

এই যুদ্ধ কোনো একক রাষ্ট্র বা অঞ্চলের সংকট নয়। এটি এক বৈশ্বিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে—জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানবিক পরিস্থিতি—সবকিছুই এর আওতায় আসবে। এই সংকটের প্রতিটি ঢেউ এসে আঘাত হানবে আমাদের ঘরের দরজায়।

এই মুহূর্তে প্রয়োজন সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতা, আন্তর্জাতিক সংহতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়—বরং আরও জটিলতা, আরও ক্ষয়, আরও অন্ধকার। বিশ্বকে এখন প্রয়োজন যুদ্ধ নয়, শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস।

লেখক : সমাজকর্মী ও সাংবাদিক

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

নিউজজি/এস দত্ত/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers