সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ১ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

ফিরে দেখা নব্বই: আমাদের সময়, আমাদের গল্প

মো. সাকিল তালুকদার ৮ নভেম্বর , ২০২৫, ১১:০৭:১০

987
  • ফিরে দেখা নব্বই: আমাদের সময়, আমাদের গল্প

আমরা এক বিস্ময়কর প্রজন্মের প্রতিনিধি—এক অনন্য সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মধ্যবর্তী সেতু। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে দুই হাজার দশকের প্রথম ভাগে বাংলাদেশে যাদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে, তারা লাখে একজন নয়; ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে অসাধারণ সৌভাগ্যের অধিকারী একটি সম্পূর্ণ প্রজন্ম। কিন্তু “নব্বইয়ের প্রজন্ম” বলতে কাকে বোঝায়, তার নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। নব্বইয়ে জন্ম নেয়া, নাকি আশিতে জন্ম নিয়ে নব্বইয়ে বেড়ে ওঠা?

বলা যায়-বর্তমানে যাদের বয়স ত্রিশের কোটায়, তারা কোনো না কোনোভাবে নব্বইয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটি কোনো প্রজন্ম যুদ্ধ নয়; বরং শব্দ আর স্মৃতির আদলে ফেলে আসা দিনের এক ছবি আঁকার প্রয়াস।

এই লেখায় তুলে ধরা হলো কেন আমরা, নব্বই দশকের মানুষরা, নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান প্রজন্ম মনে করি—আমাদের শৈশব, কৈশোর, বিনোদন, শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা অবয়বের মধ্য দিয়ে।

৯০ দশকের শৈশব ও কৈশোর,বর্তমান আধুনিক প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের সবচেয়ে বড় পার্থক্য বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতায়। আমরা ছিলাম প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা শেষ প্রজন্ম। প্রযুক্তির সর্বব্যাপী বিস্তারের সাক্ষী হয়েও আমরা কেটেছি শৈশব মাটি, পানি ও প্রকৃতির স্পর্শে।

গ্রামের মেলায় কেনা মিষ্টি খই,ও বৈশাখের মেলায় গিয়ে ছোট ছোট দা কিনতাম, তালপাখা, বাঁশি,২৫ পয়সার  চকলেট—এসবই ছিল আমাদের সরল সুখের অংশ। অগ্রহায়ণে ধান কাটা শেষে আগুন পোহানো,বাড়ীতে নিয়ে আসত মুড়ির মোয়া,খরম খরম জিলেপী, স্কুল পালিয়ে মোস্তফা খেলা, তাল পড়ার শব্দে দীঘিতে ঝাঁপ দেওয়া—এসব স্মৃতি আজও মনের ফ্রেমে অম্লান।

বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে রাখা তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা বা লিটল ম্যাগাজিনের পাতা উল্টানো—এগুলোই ছিল আমাদের অন্যরকম বিনোদন। আজকের হাতে-ধরা স্মার্টফোনের দুনিয়ায় থেকেও মাঝে মাঝে মনে হয়, কিছু একটা নেই। এই না-থাকার অনুভূতিই আমাদের বারবার টেনে নেয় সেই সোনালি সময়ের বালুচরে।

৯০ দশকের বিনোদন,আমাদের বিনোদন ছিল আমাদের নিজেদের মাঝে—দল বেঁধে খেলাধুলা, হাসি-ঠাট্টা, ছুটে বেড়ানো। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ক্রিকেট-ফুটবল খেলার জন্য সবার কাছ থেকে চাদা নিয়ে ব্যাট ও ফুলবল কিনতে হত, লাটিম, দাঁড়াকটি (ডাংগুলি), বন্দি (বাঘবন্দি), বৈঁচি, সাতচিক (সাতচাড়ারখেলা), কুতকুত, কিংবা দল বেঁধে ঘুড়ি উড়ানো —এসবই ছিল জীবনের আনন্দ।

আর শুক্রবার ছিল আমাদের সপ্তাহের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দিন। বিটিভিতে দুপুর তিনটার সিনেমা ঘোষণার সময় প্রিয় নায়ক-নায়িকার নাম শোনার অপেক্ষা, আর বিকেলের পর্দা ওঠার মুহূর্তের উত্তেজনা—অবিস্মরণীয়।

রাতের আলিফ-লায়লা, সিন্দাবাদ, রবিনহুড, ম্যাকগাইভার, সুপারম্যান, ব্যাটম্যান—এসব ছিল স্বপ্নের দরজা। স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ১ টাকা জমানো ছিল তখনকার বিশ্বজয়ের সমান আনন্দ।

সংগীত ও বিনোদনের রূপান্তরময় কালখণ্ড, ব্যান্ড সংগীতের উত্থান, রক–মেটাল ধারা, মাইলস, এলআরবি, নগরবাউল, আর্টসেল, শিরোনামহীন—আমরা শ্রোতা নই; একটি আন্দোলনের অংশ ছিলাম। সেই সময়েই বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের সোনালি যুগ—আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান, মাকসুদ, পার্থ, মাইলস—প্রতিটি নামই হয়ে উঠেছিল এক একটি উপমা। ক্যাসেট থেকে সিডি, তারপর এমপি৩ এবং ইউটিউব—সংগীতের চারটি মাধ্যম বদল হতে দেখেছি।

 

সিনেমার ক্ষেত্রে VCR থেকে CD, ডিশ অ্যান্টেনা থেকে ডাউনলোড, এরপর OTT—আমরা বিনোদনের প্রতিটি বিপ্লব হাতের মুঠোয় ধরেছি। শাহরুখ–আমির–সালমানের সোনালি সময় যেমন দেখেছি, তেমনই The Shawshank Redemption, Interstellar, Dark Knight–এর মতো বিশ্বমানের চলচ্চিত্র সহজলভ্য হয়েছে ঠিক সেই বয়সে, যখন মন-মানসিকতা সেগুলোর গভীরতা বুঝতে সবচেয়ে প্রস্তুত ছিল।

৯০ দশকের সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজলেই পরিবারের সবাই মিলে বসতাম বিবিসি বাংলা সংবাদ শোনার জন্য। সকালবেলা দাদা ফজরের নামাজ থেকে ফিরে এসে ঘরজুড়ে উচ্চস্বরে আরবি পাঠ করতেন—সেই সুর আজও কানে ভাসে।

৯০ এর দশকের দুপুর হলেই অপেক্ষা থাকত ‘অনুরোধের আসর – গানের ডালি’ অনুষ্ঠানের। রমজান মাসে মসজিদের ঘাটলায় বসে এলাকার সবার সাথে ইফতার করার আনন্দ ছিল আলাদা। ছোটখাটো ভুল করলেই বাবুদাদা একটু রাগ করতেন, তবে সেই রাগেও ছিল ভালোবাসার ছোঁয়া।

৯০ এর দশকে কুরবানীর সময় এলে আমাদের ঘরে যেন উৎসবের আমেজ। আমরা নিজেরাই গরু লালন-পালন করতাম। কুরবানীর আগের রাতে গরুগুলোকে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতাম—সেই আনন্দ ছিল বর্ণনাতীত। কুরবানীর দিনের সকালে দরজায় সারিবদ্ধভাবে সব গরু একসাথে কোরবানি করা হত, আর বাড়ির আঙিনা ভরে উঠত কোলাহলে।

শীত এলে রাতের বেলা খেজুর গাছ থেকে তাজা রস পাড়া হত। সেই রস দিয়ে নিজেদের হাতে রান্না করা পায়েস বা গুড়ের তৈরি খাবার খাওয়ার মজাই ছিল আলাদা—আজও স্মৃতিতে টাটকা।

নব্বই দশকের শিক্ষা জীবনের সবচেয়ে অনন্য দিক ছিল ছাত্র-শিক্ষকের অটুট সম্পর্ক। তখন শিক্ষক মানেই ছিলেন পথপ্রদর্শক। প্রাইমারি স্কুলের স্যাররা রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রের পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। সন্ধ্যা নামলেই হাতে হারিকেন তুলে কাচারিঘরে পড়তে যেতাম। তবে শুক্রবারগুলো ছিল আমার আলাদা পরিকল্পনার দিন। সেদিন ইচ্ছা করেই হারিকেনের কেরোসিন কম নিয়ে যেতাম—কারণ জানা কথা, তেল দ্রুত ফুরোলে ঘরে তেল আনতে যাওয়ার অজুহাতে ওই ফাঁকে আলিফ লায়লা দেখার সুযোগ মিলত!

এই ‘কৌশল’ ধরে ফেললে আলাউদ্দিন স্যারের কাছে যে কত মার খেতে হয়েছে, তার হিসেব নেই। বাবা-মাও স্যারকে বলে দিতেন—“হাড্ডি আমার, মাংস তোমার!”

ভাবতে অবাক লাগে, আমরা-ই বুঝি শেষ প্রজন্ম যাদের বাবা–মা নিজের মুখে শিক্ষকের কাছে এমন কথা বলেছেন।

ভোর হতে না হতেই বন্ধুদের সঙ্গে দলবেঁধে মক্তবে ছুটে যেতাম আরবি পড়তে—সেই দিনের স্নিগ্ধতা, সেই শাসন আর স্নেহমাখা শিক্ষাজীবন আজও মনকে নরম করে দেয়।

স্কুলের দুষ্টু ছেলেটিও কোনো শিক্ষকের নাম শুনলেই সম্মানে সোজা হয়ে যেত। ভয়, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক সুন্দর ভারসাম্য ছিল এই সম্পর্কে—যা আজকের বাণিজ্যিক শিক্ষাব্যবস্থায় অনেকটাই বিলীন।

আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী, আমরাই সেই প্রজন্ম, যারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সন্ত্রাস ও ক্ষমতার পালাবদলের ইতি দেখেছি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর শুরু হয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন অধ্যায়। তবে এই গণতন্ত্রের আড়ালে বেড়ে ওঠে সন্ত্রাস, দলীয়করণ ও স্বার্থের রাজনীতি। আমরাই দেখেই প্রথম নির্বাচন কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

এই সময়ে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষার প্রসার ঘটে—কিন্তু তা মূলত নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাড়লেও মানুষ তৈরির বদলে তৈরি হচ্ছিল কেরানি মানসিকতা।

এই সময়ের পরিবর্তনের ঢেউ আমাদের প্রজন্মকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মধ্যবিত্ত সমাজের বিস্তারের পেছনে এই প্রজন্মের সংগ্রাম ও অবদান অনস্বীকার্য।

৯০ এর দশকে নির্বাচন মানেই ছিল উৎসব—মনে হতো যেন ঈদের আনন্দ নেমে এসেছে গ্রামে।

এক দলের মিছিল শেষ হতেই অন্য দলের মিছিল শুরু—ঢোলের তাল, স্লোগানের ঢেউ, রঙিন পোস্টার আর হাসিমুখে ভরা মানুষ… পুরো গ্রামের বাতাসেই ছিল আনন্দের গন্ধ। সবচেয়ে উত্তেজনাকর ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আমেজ।

পশ্চিম ইশসার বনাম উত্তর ইশসার—আমাদের দুই পরিবারের সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রতিযোগিতা যেন ছিল গ্রামের ইতিহাসের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাগ ছিল না, ছিল গর্ব, আবেগ আর নিজের পক্ষ জেতার মিষ্টি উত্তেজনা।

মিছিল শেষে বিকেলের ক্লান্তি ভুলে আমরা জড়ো হতাম চায়ের দোকানে। হাতে ধোঁয়া ওঠা স্যাকারিনের চায়ের কাপ, আর চারপাশে উত্তেজিত আলোচনা—

“এবার কারা জিতবে?”

“আজকের মিছিলটা দারুণ ছিল!”

সেই সরল দিনের হাসি, সেই মিলনমেলা—আজও মনে পড়লে বুকটা কেমন হু হু করে ওঠে।

সময় পাল্টেছে। আজও নির্বাচন হয়, পোস্টার উঠে, প্রচার চালানো হয়—কিন্তু কোথায় যেন সেই আগের নির্ভেজাল আনন্দটা হারিয়ে গেছে। মানুষের হৃদয়ের জায়গা যেন বদলে গেছে।

তবুও, স্মৃতির দরজা খুললেই ভেসে ওঠে সেসব দিনের সরল হাসি, একতাবদ্ধ আনন্দ, আর স্যাকারিনের চায়ের কাপের গায়ে জমে থাকা উষ্ণতা। সেই দিনগুলো ফিরে পাওয়া যায় না, কিন্তু মনে হলে আজও মন ভরে যায়।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ও নব্বই দশক,বাংলাদেশে ক্রিকেট উন্মাদনার বীজ বপন হয়েছিল নব্বইয়ের দশকেই। তখন টেলিভিশনে খেলা দেখা ছিল বিরল; রেডিওই ছিল একমাত্র ভরসা।

১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় আমাদের ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে আসে। সেই মুহূর্তের উত্তেজনা আজও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। আমরা দেখেছি কিভাবে এক অচেনা দল ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী জাতি হয়ে উঠল।

স্পোর্টসের ইতিহাসেও আমাদের প্রজন্ম এক বৈশ্বিক সৌভাগ্যের উত্তরাধিকারী।

ফুটবলে এক প্রান্তে রোনালদো–রোনালদিনহো–জিদান,ভাতিস্তা ও শুকা অপর প্রান্তে মেসি–ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও নেইমার—এমন দুই যুগের শ্রেষ্ঠত্ব পাশাপাশি দেখার সুযোগ মানবসভ্যতার খুব কম প্রজন্ম পেয়েছে।

ক্রিকেটে শচীন, লারা, মুরালিধরন,গ্লেগ ম্যাগরা, ওয়ার্ন—সাথে সাকিব–তামিম–মাশরাফির উত্থান; বাংলাদেশ ক্রিকেটের কিশোর বয়স থেকে কৈশোরে উত্তরণ আমরা চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করেছি।

একদিকে কিংবদন্তির জন্ম, অন্যদিকে আমাদের জাতীয় স্বপ্নের বাস্তবায়ন—এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা নতুনদের জন্য শুধুই তথ্য, কিন্তু আমাদের জন্য প্রবল আবেগ ও স্মৃতির প্রতিধ্বনি। আমরা দেখেছি রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা ফুটবলে দৌরাত্ম্য আবাহনী মোহামেডানের দারুন প্রতিযোগিতার ফুটবল।

আমাদের শৈশব শুরু হয়েছিল বই হাতে—স্ক্রিন নয়। তিন গোয়েন্দার রহস্য, মাসুদ রানার অ্যাডভেঞ্চার, দীপু নাম্বার টু–র নিষ্পাপ বিস্ময়, আর তার সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট হিমু, মিসির আলী, শুভ্র—এরা শুধু চরিত্র ছিল না; আমাদের চিন্তাশক্তি, স্বপ্ন ও অনুভূতির পরিমণ্ডল নির্মাণ করেছে।

নাটক, টিভি সিরিয়াল ও সাহিত্য মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদ, সেলিম আল দীন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল—তাঁরা বাংলা সংস্কৃতিকে এমন এক শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন, যার পুনরাবৃত্তি হয়তো কঠিন হবে। আমরা দেখেছি বাহুবলীর রাজকীয়তা নয়—বাকের ভাইয়ের সততা, তিতলী-কঙ্কার প্রেম, হুমায়ূন ফরীদি ও সুবর্ণা মুস্তফার অভিনয়ের জাদু।

আজকের শিশুরা ডিজিটাল পর্দায় চরিত্র দেখে; আমরা চরিত্রদের হৃদয়ে নিয়ে বড় হয়েছি—এটাই মৌলিক পার্থক্য।

আমরা নব্বইয়ের প্রজন্ম, যারা সাহিত্যের, সংগীতের, খেলাধুলার, সিনেমার এবং প্রযুক্তির সোনালি সময়ের সাক্ষী। এই স্মৃতি, এই অনুভূতি, এই নস্টালজিয়া—আমাদের চিরকাল সমৃদ্ধ করে রাখবে।

তবু ভাগ্যের সঙ্গে মিশে আছে বেদনাও,এই ভাগ্যের পথ নিখুঁত নয়। যুগান্তকারী সৃষ্টিকর্তাদের বিদায়, প্রিয় শিল্পীদের অসুস্থতা, আমাদের শৈশবের নায়কদের অবসান—সবই আমাদের মনে আঘাত করেছে। হুমায়ূন আহমেদ আর লিখবেন না, আইয়ুব বাচ্চুর গিটার আর মঞ্চে উঠবে না, মেসি–রোনালদোর শেষ ম্যাচ দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা। পরিবারে বাবা–মায়ের যৌবন হারিয়েছে, ভাইবোনরা ছড়িয়ে পড়েছে—জীবন নিজের গতি পেয়েছে, কিন্তু স্মৃতির আঙিনা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।

কেন ইতিহাস আমাদের আলাদা করে চিহ্নিত করবে,এই প্রজন্মকে ইতিহাস “ট্রান্সিশনাল জেনারেশন” বা “সেতুবন্ধ প্রজন্ম” হিসেবে স্মরণ করবে। কারণ—

  • আমরা অ্যানালগ এবং ডিজিটাল—দুই বিশ্বের পূর্ণ অভিজ্ঞতা একসাথে পেয়েছি।
  • সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও প্রযুক্তিগত মহাবিপ্লবের কেন্দ্রে অবস্থান করেছি।
  • আমাদের স্মৃতি আবেগময়, স্পর্শকাতর এবং দলিলসমৃদ্ধ—যা আগামী প্রজন্ম শুধুই তথ্য হিসেবে পড়বে।

আমাদের আনন্দ গভীর, বেদনা বাস্তব; এবং এইই আমাদের সৌভাগ্যের প্রকৃত প্রমাণ—আমরা জীবনের সব রং দেখেছি।

হয়তো সত্যিই আমরা শেষ প্রজন্ম যে—

মায়ের হাতে পিঠে খেয়েছে,

বাবার কড়া শাসনে মানুষ হয়েছে,

কাগজের নৌকা ভাসিয়েছে,

টিভির সামনে শুক্রবারের উত্তেজনা অনুভব করেছে,

এবং একই জীবনে ফেসবুক, আইফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানও দেখছে।

সময়ের বহু রূপের এই অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনে দিয়েছে গভীরতা।

সেজন্যই বলা যায়—আমরা শুধু ভাগ্যবান নই; ইতিহাসের কাছে এক অনন্য ও সম্পূর্ণ প্রজন্ম।

পরিশেষে বলতে হয়, সময় বয়ে যায়, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু নব্বইয়ের সেই দিনগুলো যেন এখনো মনের ভেতর বেঁচে আছে। মাঠে খেলার ধুলো, রেডিওর শব্দ, শুক্রবার বিকেলের সিনেমা, আর হুমায়ূন আহমেদের গল্প—সব মিলিয়ে এ এক অনন্য সময়ের ছায়াপথ। আমরা ভাগ্যবান, কারণ আমরা সেই সোনালি সময়ের সন্তান; আর দুর্ভাগ্যবানও, কারণ আজ আর ফিরে যাওয়া যায় না। তবে স্মৃতির পটে যতদিন রঙ থাকবে, ততদিন নব্বইয়ের প্রজন্ম অমলিনই থেকে যাবে—আমাদের সময়, আমাদের গল্প।

-লেখক, গবেষক ও প্রাক্তন প্রভাষক, সিটি বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজজি/এসডি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers