সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ১ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

স্মরণ : স্যালুট গণমানুষের নেতা

মাঈনুদ্দীন দুলাল ১ ডিসেম্বর , ২০২৫, ১৭:৪৭:৪৪

533
  • সংগৃহীত

রাজনৈতিক ও সমাজ সেবক এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বলা হয় চট্টলবীর। তবে তাকে চেনে সারাদেশের মানুষ। শুধু চট্টগ্রাম নয়, তার রাজনীতির প্রভাব ছিল দেশব্যাপী। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান,আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে,যেকোন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন ভ্যানগার্ড। নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে।

সকল দল,মত ও পথের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন গ্রহণযোগ্য ও সম্মানীয়। যদিও তিনি আজীবন আওয়ামী লীগের সাথে ছিলেন। কিন্তু তাকে চট্টগ্রামবাসী অভিভাবক মানতেন। যেকোন সংকট,দুর্বিপাকে বুক পেতে দাঁড়াতেন। সকল মানুষ তার আশ্রয় পেতেন। তিনি ছিলেন তৃনমূলের মানুষের নেতা। পরপর ৩ বার চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন।

আমার ব্যাক্তিগত একটা বড় আনন্দ মহিউদ্দিন চৌধুরীর সান্নিধ্য এবং স্নেহ পাওয়া। আদর করে আমাকে ডাকতেন 'মোডা হুজুর' (স্বাস্থ্যবান হুজুর)। মৃত্যুর বছর দুয়েক আগে ভাবলাম তাঁকে নিয়ে ৩০ মিনিটের একটা তথ্যচিত্র করব। ভাবনার কথা জানাতে গাইগুই করে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। সময় নিয়ে যত্ন করে করব, সেই ভাবনায় আস্তে আস্তে এগুচ্ছিলাম।

পেশাগত সাংবাদিকতার কাজের ফাঁকে সপ্তাহে কমপক্ষে দু' দিন তার সাথে দেখা করতাম। তথ্যচিত্রের কাজও করতাম। কিন্তু শর্ত ছিল তার নিজের হাতে গড়া প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে দুপুরে খেতে হবে। খেতে খেতে  কথা বলা। অল্প অল্প করে কাজও এগিয়ে নেয়া। কাজের শুরু করেছিলাম প্রায় এক ঘন্টার অন ক্যামেরারায় কথোপকথন দিয়ে। ক্যামেরায় রেখে শেষে বলেছিলাম তার প্রিয় কবির একটা কবিতার কয়েকটি লাইন বলতে। তিনি রবীন্দ্রনাথের ' নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' কবিতাটি কিছুটা আবৃত্তির ঢংয়ে মুখস্ত পড়লেন। অবাকই হলাম তার সাহিত্যপ্রীতিতে।

অন্য একদিন কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম আপনার বাসায় দুপুর - রাতে কমপক্ষে ৫'শ লোকের খাবার আয়োজন রাখেন। অন্য নেতারা কেউকেউ সামান্য চা- বিস্কুট দিয়েও আপ্যায়ন করেন না।

তখন তিনি তার নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা বল্লেন।  ঘটনাটি এ রকম - ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া। গ্রেফতার ও নির্যাতন এড়াতে তিনি ভারত চলে যান। এরই মধ্যে আন্দোলনকারী এক নেতা আটক অবস্থায় মারা গেছেন। অন্য আটককৃতদের উপর চলছে অমানবিক নির্যাতন। দেশত্যাগী হওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না।

কোলকাতায় পত্রিকার হকার,হোটেলের বাবুর্চি,পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করে পলাতক নেতা-কর্মীদের  অন্ন সংস্থান করেছেন। কয়েক বছর পর দেশে ফিরে আসলেন। তাও পলাতক জীবন। ঐ অবস্থায় একদিন রাতে চট্টগ্রাম নগরীতে দলের এক সিনিয়র নেতার বাসায় গেলেন রাজনৈতিক কারণে।

রাত প্রায় ১০টা। আলাপ শেষে নেতা জানতে চাইলেন খাওয়া দাওয়ায় হয়েছে কিনা? মহিউদ্দিন চৌধুরী জানালেন খাননি। নেতা ভেতরে ঢুকে তার স্ত্রীকে অনুরোধ করলেন খাবারের ব্যাবস্থা করতে। নেতার স্ত্রী এতরাতে খাবার দিতে উষ্মা প্রকাশ করছিলেন।

নেতার স্ত্রীর কথাবার্তা মহিউদ্দিন চৌধুরী শুনতে পেলেন। বেরিয়ে গেলেন ঐ বাসা থেকে। পকেট একেবারেই শূন্য। সামান্য কয়েক টাকায় হয়ত ডাল ভাত হবে। খাতুনগঞ্জের যে বস্তিতে তার পলাতক অবস্থান ওখানেই একটা ঝুপড়ি হোটেলে ঢুকলেন প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়ে। সামান্য ভাত আর ডালের অর্ডার দিলেন। সাথে কয়েকটা কাঁচা মরিচ।

কিশোর বয়সী বয় ছেলেটি ভাত ডালের সাথে এক হাফ গরুর মাংসও নিয়ে আসল। মহিউদ্দিন চৌধুরী কিছুটা রাগাত স্বরে বল্লেন তিনি মাংস চাননি। কারণ তিনি জানেন তার কাছে মাংস খাওয়ার মত টাকা নেই। কিশোর ছেলেটি কাঁচুমাচু হয়ে বল্ল আপনি আমাদের নেতা।

মালিকের নির্যাতনে আপনার কাছে গেছি। ৮ ঘন্টা কাজের দাবী মানতে আপনি আন্দোলন করে মালিকদের রাজি করেছেন। আপনার পিছনে মিছিল করেছি।  আমার বেতন থেকে আপনাকে আজকে এক বেলা খাওয়াতে চাই। আপনি না করবেন না।

এই স্মৃতিচারন করতে গিয়ে দেখি মহিউদ্দিন ভাইয়ের চোখ ভিজে উঠেছে। তিনি বল্লেন ব্যবসায়ী ধনী নেতা আমাকে এক বেলা খাওয়াতে পারেনি। অথচ একটা গরীব দিনমজুরের আতিথিয়েতা পেলাম। সেই থেকে সিদ্ধান্ত, আমার বাসা থেকে কোন নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ না খেয়ে যাবে না।

এই আমাদের মহিউদ্দিন চৌধুরী।

মহিউদ্দিন ভাই মেজাজী ছিলেন। উল্টো পাল্টা দেখলে বকাবকি করতেন। তার গালি বকা খেয়ে কর্মীরা খুশী মনে বেরিয়ে আসতেন। তার গালিবকাকে মহিউদ্দিন ভাইয়ের দোয়া ও স্নেহ মনে করতেন।

এই ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।

তার মানবিক ও রাজনৈতিক কাজের এত গল্প আছে, যা এখন মীথ। রুপকথার গল্পের মত।

১৯৯৪ থেকে তিন বার চট্টগ্রামের মেয়র ছিলেন। তখন চট্টগ্রাম ছিল এক ঝকঝকে তকতকে সুন্দর নগরী। সিটি করপোরেশনের আইনের বাইরে গিয়েও কর্পোরেশনের তত্বাবধানে চট্টগ্রামের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন।

 ২০০৯ সালে মেয়র নির্বাচনে তারই শিষ্য মনজুরুল আলমের কাছে পরাজিত হন। তখন তার দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। কেউকেউ তাকে পরামর্শ দিলেন এদিক সেদিক করে নির্বাচনী ফলাফল অনুকূলে আনার জন্য।

তিনি কোন ভাবেই রাজী নন। বরং চিৎকার চেঁচামেচি করে বলেছেন, ' 'আমি সারাজীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করেছি। গনতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি। মানুষের ভোট চুরি করে আমি জয়ী হবনা। ভোট জনগণের আমানত। সেই আমানত আমি চুরি করব না।"

এই ছিলেন গনতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মহিউদ্দিন চৌধুরী।

১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরা গ্রামে তার জন্ম। বাবা বক্স আলী চৌধুরী ছিলেন রেল কর্মকর্তা। মা বেদুরা বেগম। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যু বরণ করেন। কাকতালীয় যে, আমাদের বিজয়ের মাসেই তার আগমন ও প্রস্থান।

মৃত মানুষের কিছুর প্রয়োজন নেই। কোন প্রসংশা তাকে ছোঁবেনা। তবু আমরা আনন্দিত হই,অনুপ্রাণিত হই তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। মহিউদ্দিন চৌধুরী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক ছিলেন। সমাজহিতৈষী ছিলেন। এ ধরনের রাজনৈতিক বিরল প্রজাতির প্রাণীর মত লুপ্ত হচ্ছেন।

লেখক: সাংবাদিক।

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers