সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ১ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার সোনা ঝরানো গীতিকবি

মাঈনুদ্দীন দুলাল ৫ ডিসেম্বর , ২০২৫, ১৭:১৮:২৫

436
  • সংগৃহীত

গীতিকবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কলম থেকে জন্ম নিয়েছে সব মণি-মুক্তা- হীরা- জহরত আর সোনা ঝরা শব্দ। ঐসব শব্দেরা হেমন্ত,মান্না,লতা,সন্ধ্যা,আরতী,শ্যামলদের কন্ঠে অমীয় সুধা তৈরী করেছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সেই সুধারসে মগন। আজ ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পাবনা জেলায় তার জন্ম। সশ্রদ্ধ স্মরণ।"

গৌরীকে গীতিকার না বলে গীতিকবি বল্লাম। কবিতা হওয়ার জন্যে যে অনুষঙ্গ থাকতে হয় সবই ছিল তার লেখা গানে। যেমন ছন্দ,উপমা,চিত্রকল্প,তুলনা এই সবই পাওয়া যায়।এই ছোট পরিসরে তার একটি গানের কথা উল্লেখ করি। আরতী মুখার্জির গাওয়া, নচীকেতা ঘোষের সুরে-  'এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসোনা গল্প করি... গানটি যদি আলোচনায় আনি আমরা দেখি ছন্দের যে রিদম তা পাই। সাথে দেখি মোমের মত ধবল ও চুইয়ে চুইয়ে পড়া আলোতে স্নান করবে মানব-মানবী। কি চমৎকার তুলনা। আবার বলছেন ' সারা রাত আকাশে সলমাজরী'। সলমাজরী এক ধরনের রুপোলী জরীর কাজ করা কাপড়। সেখানে চকচকে বুননে তারা চিহ্নও থাকে। চুইয়ে পড়া ভরা জোসনা এবং আকাশকে তিনি এভাবে তুলনা করছেন। অপরূপ এক ছবি আঁকছেন। এই গানের এক জায়গায় বলছেন, ' মখমলের ঐ সুঁচনি ঘাসে একটু না হয় বসলে পাশে... সরু নরম তুলতুলে ঘাস। যেন সবুজ কার্পেট বিছানো। প্রিয়তম মানুষকে আহবান। এক অনন্য দৃশ্যকল্প তৈরী করে। আবার বলছেন,  'বাতাসের দিলরুবাতে,  সুর মিলিয়ে আলাপ ধরি... দিলরুবা তারযুক্ত এক ধরনের হৃদয়মুগ্ধ করা বাদ্যযন্ত্র। দিলরুবা ফার্সি শব্দ। এই বাদ্যযন্ত্রটি উত্তর ভারতে খুব জনপ্রিয়। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ মনোমুগ্ধকর আওয়াজ হয়ে যায় দিলরুবার  মত। যদি প্রিয় মানুষটি কাছে থাকে। মহুয়া ফুলের কমনীয় মিষ্টি ঘ্রানও আসে প্রিয়তমের শরীর থেকে, জাফরানী আলতা রংয়ের ঠোঁট চুইয়ে।

গৌরী'র প্রতিটি গান কবিতার অবয়ব ও অনুভব মাখা। কবিতা পড়ার ভাবনা ও আনন্দের সাথে যুক্ত হয় সুর আর গায়কী।

গৌরীপ্রসন্ন একবার খেদ করে বলেছিলেন, গীতিকারদের কবির স্বীকৃতি দেয়া হয় না। অথচ রবীন্দ্রনাথও গান লিখেছেন। নোবেল পুরষ্কার পাওয়া গীতাঞ্জলিতো গীতিকবিতার সম্ভার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তার কাছে আনন্দদায়ী ও যুগান্তকারী ঘটনা।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার এক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। আমার বাড়ি ছিল পাবনায়। ১৯৪৭ সালে ভারতে চলে আসি। কিন্তু আমার মন পড়ে ছিল বাংলাদেশে। তাই গান দুটি লিখে সেই জন্মস্থানের ঋণ কিছুটা হলেও আমি শোধ করেছি।’

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষন টেপ রেকর্ডারে শোনেন আকাশবাণী'র এক কর্মকর্তার কাছে।  তিনি সেই বজ্রকন্ঠে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখেন ' শোন একটি মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি, আকাশে বাতাসে ওঠে রণি... গানটি সুর করেন নিজেই গান অংশুমান রায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে ' আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে....

এই গান দুটি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামের প্রেরণা দিয়েছে।

তার ' কফি হউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই... গানটি বিবিসি'র জরীপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি গানের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

২০১২ সালে তাকে বাংলাদেশ সরকার মরণোত্তর 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননায়' ভুষিত করে।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ১১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাবনা জেলায় জন্মেছেন। ১৯৮৬ সালের ২০ আগষ্ট কোলকাতায় মারা যান।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের উল্লেখযোগ্য কিছু গান:

বিপিনবাবুর কারণ সুধা,কী আশায় বাঁধি খেলাঘর,যদি কাগজে লেখো নাম, লক্ষ্মীটি দোহাই তোমার, মধুমাস যায়,কাহারবা নয় দাদরা বাজাও,ভালবাসার আগুন জ্বালাও,আমি সাহেবও নই, এমন একটা গল্প বলতে পারো,একটু আরো নয়, কথা দিয়ে এলে না,ময়না বলো তুমি, চন্দ্র যে তুই, আজ হৃদয়ে ভালোবেসে,মোর স্বপ্নের সাথী,মাধবী ফুটেছে ঐ,এতো কাছে দুজনে,এই মোম জোছনায়, তিনি একটি বেলপাতাতেই তুষ্ট,তুমি সূর্য তুমি চন্দ্র, শিব শম্ভু ত্রিপুরারী, তোমার চন্দ্র সূর্য, বোবা বলে দুঃখ কেন, বাক কাঁধে তুলে, পঞ্চ প্রদীপে,

বিষ্ণুপ্রিয়া গো, বাক কাঁধে চলে, আজ তোমার পরীক্ষা‌ ভগবান,পদ্ম পাতায় ভোরের শিশির, দূরে আকাশ, জুঁই সাদা রে, দুয়ো দুয়ো আড়ি, সেদিনও আকাশে ছিল, আমার মনের এই ময়ূর, কী করে বোঝাই তোদের, তোমাদের আসরে আজ, তিনটি মন্ত্র নিয়ে, আমার স্বপ্ন তুমি, আশা ছিল ভালবাসা ছিল, কথা কিছু কিছু, আমার বাবা ভালো ছিল, কবর দাও বা চিতায় পোড়াও, তুমি যে প্রেমের স্বরলিপি, মনে না রং লাগলে, কে বলে বিজলী শুধু।

লেখক: সাংবাদিক

নিউজজি/এসডি

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers