সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ১ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

বাংলাদেশ, আপনা মাংসে হরিণা বৈরী

মাঈনুদ্দীন দুলাল ৯ ডিসেম্বর , ২০২৫, ১৭:৫৬:৩৯

369
  • বাংলাদেশ, আপনা মাংসে হরিণা বৈরী

গ্রাম্য প্রবাদ আছে, ' গরীবের সুন্দরী বউ হগ্গলের ভাবী।'

চর্যাপদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেখক 'ভুসুকুপা' র একটি পদ আছে, ' 'আপনা মাংসে হরিণা বৈরী'।

অর্থাৎ হরিণের সুস্বাদু মাংসই তার শত্রু। সে বারবার শিকারীদের লোভের শিকার।

বাংলাদেশের অবস্থা হয়েছে তাই। তার লোভনীয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে, চীন,ভারত,মিয়ানমারের সমূদ্র সীমার কাছাকাছি থাকায় এখানে সামরিক ও বানিজ্যিক অবস্থান করতে চায় বিশ্ব পরাশক্তিগুলো। ভারত তার ৩ দিক ঘেরা বাংলাদেশে কোন পরাশক্তির অবস্থান চায় না। চীনও এই জলসীমানায় বা ভূখণ্ডে আর কারো অবস্থান বা আধিপত্য চায় না। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ বেকায়দায়। মাঝে মাঝে এখানে তাই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয় দেশে গণতন্ত্রহীনতার সুযোগে। আর এতে ইন্ধন থাকে পরাশক্তিগুলোর।

ভারত ছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রায় সবগুলো দেশই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।  সাম্প্রতিক বাংলাদেশ,  নেপালে, শীলংকায় বিদ্রোহ ও সরকার পরিবর্তন। পাকিস্তানের ধারাবাহিক রাজনৈতিক শূন্যতা। এসব মিলিয়ে এই অঞ্চল এখন উত্তপ্ত কড়াই। এখানে রুটি সেকার জন্য কেউকেউ মুখিয়ে আছে।

এখন বাংলাদেশ পরাশক্তিগুলোর টার্গেট বা চারণভূমি। বিশ্ব পরাশক্তির ভারসাম্য ও টানাপোড়েনের নিয়ামক হয়ে উঠেছে এই বদ্বীপ।

অতিসম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারত সফর শেষ করেছেন। এই সফরকে দূরবীন চোখে পর্যবেক্ষণে রেখেছে আমেরিকা ও চীন। ভারতের সাথে সম্পর্কের রাজনৈতিক,সামরিক ও বানিজ্যিক ভারসাম্য হারাতে চায় না আমেরিকা। অন্যদিকে চীন দেখতে চায় ভারতের সামরিক ও বানিজ্যিক অবস্থানের কি পরিবর্তন হচ্ছে। যদিও চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক  এখন কিছুটা উঞ্চ। বিশ্ব পরাশক্তির ভারসাম্য ও টানাপোড়েনে এখন ভারত,চীন,রাশিয়া, ইরান কাছাকাছি। অন্যদিকে আমেরিকা ও পাশ্চাত্য দেশগুলো পরস্পরের স্বার্থে নিকটবর্তী। এ অবস্থায় পুতিনের ভারত সফর সকলের আগ্রহের কেন্দ্রে। রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার কারণে আমেরিকা ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপাল। যুক্তি ছিল এই তেলের টাকা  ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে রসদ যোগাচ্ছে। কিন্তু ভারত সফরে পুতিন প্রশ্ন রেখে তার বক্তব্যে বলেছেন, আমেরিকা রাশিয়ার কাছ থেকে পারমানবিক জ্বালানি কিনছে। তখন ভারত কিনলে কেন শাস্তি পাবে? রাশিয়া থেকে ভারতে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ  অব্যাহত থাকবে। তিনি আরো বলেছেন, ভারতের সাথে বানিজ্য ৭০ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়নে উন্নীত করবে মস্কো। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, সামরিক শক্তি, কৃষি খাতসহ বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য চুক্তি হবে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও এখনও তা প্রকাশ করা হয়নি।

এরই মধ্যে টনক নড়েছে আমেরিকার। উচ্চ পর্যায়ের একটি বানিজ্য প্রতিনিধি দল আসছে ভারতে। ভারতের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করতে চাইছে না আমেরিকা। সবদিক বিবেচনায় ভারত এখন অন্যতম পরাশক্তি।  আমেরিকার সাথে চীনের দ্বৈরথে ভারত ফ্যাক্টর।এবার আসি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে। ভারত স্বাভাবিক ভাবেই তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে এমন সরকার প্রত্যাশা করে  যারা ভারতের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তার জন্য হুমকি করবে না। এখন ভারতের চোখ ও মনযোগ বাংলাদেশের দিকে। ভারত সরকারের মুখপাত্র ও সেদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন বাংলাদেশে মৌলবাদী বা জঙ্গি সংগঠনের উত্থান হওয়ার ক্ষেত্র রয়েছে। ফলে এখানকার রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি সে আনুবিক্ষনিক দৃষ্টিতেই পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বাংলাদেশে তার বৈরী কিছু দেশের গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ছে। পাশাপাশি ভারত বিরোধী শক্তিশালী একটি অংশ রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরে। এসব কিছু নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। সব বাস্তবতা মিলিয়ে পরাশক্তির ভারসাম্য বাংলাদেশে রাখার ক্ষেত্রে তার তৎপরতা রয়েছে।

এসব বহুমাত্রিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশ। গ্রাম্য প্রবাদ আছে, ' পাটা উতার ঘষাঘষি মরিচের দফারফা '। আমরা নানান উদ্বেগে আছি। কারণ রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রত্যাশা, এই শ্যামল পলল ভূমি ভালো থাকুক।নিরাপদ থাকুক। সকলের অংশগ্রহণ ও সহনশীল গণতন্ত্রের পথে থাকুক।

 

 

লেখক: সাংবাদিক

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers