শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ , ২৫ মুহররম ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

ফেব্রুয়ারি, ভাষা ও অপেক্ষার গল্প

সুমন মোস্তফা ১ ফেব্রুয়ারি , ২০২৬, ১৮:৩৯:৫১

350
  • ছবি: সংগৃহীত

ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে কেবল একটি মাস নয় এটি একটি অনুভূতি, একটি দায়, একটি উত্তরাধিকার। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের পাতায় ফেব্রুয়ারির আগমন মানেই আমাদের স্মৃতির ভেতরে একসঙ্গে জেগে ওঠে দ্রোহ, গৌরব আর আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা হলো অস্তিত্বের ভিত্তি।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে রক্ত ঝরেছিল, তা কোনো হঠকারী আবেগের ফল ছিল না; ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা, অপমান আর শাসন-চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে এক অনিবার্য প্রতিবাদ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পরপরই যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে অস্বীকার করে একটি ভিন্ন ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়, তখন সেই আঘাত কেবল ভাষার ওপরই ছিল না-ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদার ওপর। সেই আঘাতই ধীরে ধীরে জন্ম দিয়েছিল ভাষাভিত্তিক চেতনার, যা পরে রূপ নেয় জাতীয়তাবাদে।

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি সেই চেতনার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। ঢাকা শহরের রাজপথে সেদিন যে রক্ত ঝরেছিল, তা ইতিহাসের কোনো দুর্ঘটনা নয় বরং এক জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ। সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিউর এই নামগুলো শুধু শহীদের তালিকা নয়, এরা বাঙালির ইতিহাসের নৈতিক ভিত্তি।

এই ভাষা আন্দোলনই পরবর্তী দুই দশকে বাঙালিকে পথ দেখায়-স্বাধিকারের, তারপর স্বাধীনতার। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সেই পথচলারই পরিণতি। তাই ভাষা আন্দোলনকে আলাদা কোনো অধ্যায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের প্রথম দৃঢ় পা রাখা।

এই ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আর কেবল বাংলাদেশের নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এর স্বীকৃতি বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়-ভাষার অধিকার মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পৃথিবীর বহু ভাষা আজ বিলুপ্তির মুখে, একুশে সেই বাস্তবতার বিরুদ্ধেও একটি নীরব প্রতিবাদ।

এই ফেব্রুয়ারি এসেছে কিছুটা ভিন্ন বাস্তবতায়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে। রাজনীতির উত্তাপ, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা–ভাবনা ছাপ ফেলেছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে। তারই অংশ হিসেবে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন শুরু হচ্ছে না অমর একুশে বইমেলা। যা গত কয়েক দশকে ভাষার মাসের এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল।

বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার আয়োজন নয়। এটি বাঙালির চিন্তা, মত প্রকাশ, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের মিলনমেলা। একুশে বইমেলার মধ্য দিয়েই ভাষা আন্দোলনের চেতনা আধুনিক প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে পৌঁছায়। ফলে মেলা পিছিয়ে যাওয়া মানেই ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য কমে যাওয়া নয়, তবে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-চেতনার ধারাবাহিকতা রক্ষায় সাংস্কৃতিক পরিসরের গুরুত্ব কতটা গভীর।

বাংলা একাডেমির ঘোষণা অনুযায়ী, ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে এবারের বইমেলা। সময় বদলালেও দায় বদলায় না। ভাষার মাস জুড়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব থাকবে একুশের চেতনাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নয়, চিন্তায় ও আচরণে ধারণ করার।

ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রশ্ন করে-আমরা কি ভাষাকে শুধু আবেগে ভালোবাসছি, নাকি চর্চায়ও সম্মান দিচ্ছি? বাংলা ভাষা কি আমাদের রাষ্ট্রীয় নথি, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তির কেন্দ্রে আছে? নাকি আমরা অজান্তেই একুশের আত্মত্যাগকে প্রতীকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি?

ফেব্রুয়ারি তাই শুধুই স্মরণের মাস নয়, আত্মসমালোচনারও সময়। এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ভাষা রক্ষা মানে কেবল অতীতকে সম্মান করা নয়, ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়াও।

বইমেলা হোক বা না হোক, ফেব্রুয়ারি থেমে থাকে না। ভাষার ইতিহাস থামে না। আর একুশের চেতনা কখনো ক্যালেন্ডারের তারিখে বন্দী ছিল না এটি বেঁচে থাকে বাঙালির চিন্তা, প্রতিবাদ ও সৃষ্টির ভেতরেই।

নিউজজি/এসডি

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers