সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ১ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

নাগরিক ইশতেহার ও একটি নতুন রাজনৈতিক অভিযাত্রা

ডা. হেলালুজ্জামান আহমেদ ১০ ফেব্রুয়ারি , ২০২৬, ২৩:৩৫:৫০

438
  • ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইশতেহার সাধারণত হয়ে থাকে ঝাঁঝালো প্রতিশ্রুতির একটি তালিকা; ভোটের সময়ে তা দৃশ্যমান থাকে এবং পরে দ্রুত আলোচনায় হারিয়ে যায়। কিন্তু ঢাকা–৯ আসনে ডা. তাসনিম জারার ইশতেহার তা থেকে আলাদা। এটি শুধু প্রতিশ্রুতির বিন্যাস নয়; বরং এটি একটি নাগরিক ভিত্তিক পরিকল্পনা, একটি সামাজিক চুক্তি।

ডা. তাসনিম জারা ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Evidence-Based Health Care-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে জরুরি চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা বিভাগের রেসিডেন্ট ও সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি ‘সহায় হেলথ’ নামের একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার মাধ্যমে একজন স্বীকৃত গবেষক হিসেবে পরিচিত। জুলাই ২০২৪-এর গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন, জাতীয় নাগরিক কমিটি ও পরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (NCP) সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ডিসেম্বর ২০২৫-এ এনসিপি থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন এবং নিজেকে এলাকার মেয়ে হিসেবে তুলে ধরে মানুষের সমর্থন ও আস্থাকেই নিজের প্রধান শক্তি বলে উল্লেখ করেন।

১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ তিনি নিজের ছয়-দফা নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেন, যেটিকে তিনি শুধুমাত্র “শূন্য কথার প্রতিশ্রুতি নয়, বরং জনগণের সঙ্গে একটি চুক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করেন। সেখানে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা-প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও নারীর নিরাপত্তা, ড্রাগ প্রবণতা কমানো ও এলাকার নাগরিকদের জবাবদিহিতায় এমপি-র ভূমিকা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি ঘোষণা করেন এলাকা-ভিত্তিক স্থায়ী অফিস ও ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড, যাতে কেউ—চাকরি করেন বা না করেন—সন্ধ্যার পরে হলেও অভিযোগ উপস্থাপন করতে পারবেন।

এই ইশতেহারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটা কেবল সেবা-ঘোষণা নয়; এটা একটি নাগরিক-কেন্দ্রিক পরিকল্পনা। এখানে ভোটারকে কেবল ইভেন্টের অংশ হিসেবে দেখা হয় নি; বরং তাকে দায় ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সম্মান দেওয়া হয়েছে—যার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত ।

এমন পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং প্রিন্ট/অনলাইন মিডিয়া উভয় ক্ষেত্রেই পাঠক ও সমর্থকরা উল্লেখ করছেন যে, সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো—যেমন গ্যাস সার্ভিসের অনিয়ম, ভাঙা রাস্তা, পানিজল ও স্বাস্থ্যসেবা—সমাধানের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তাঁকে সমর্থন করছেন। বিশেষ করে ঢাকা–৯ এর বিভিন্ন ওয়ার্ডে মানুষ বলছে যে তারা গত কয়েকটি নির্বাচনে এমন বাস্তব-দৃষ্টিকোণসম্পন্ন ইশতেহার দেখেন নি, এবং তারা এটিকে “নির্বাচনের বাইরে জীবনমান উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা” হিসেবে দেখছেন। কিছু টুইটার ও ফেসবুক মন্তব্যে লেখা হয়েছে, “এবার আমরা সেই প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়াচ্ছি, যিনি আমাদেরই কথা বলছেন” —এ ধরনের প্রতিক্রিয়া নির্বাচনী মাঠেও স্পষ্ট হচ্ছে।

তবে এই ইশতেহার যতই নাগরিকমুখী, বাস্তবভিত্তিক ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হোক, এর ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক শূন্যতা স্পষ্ট—রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে নীরবতা । ইশতেহারটি সেবা প্রদানের অঙ্গীকার করে, কিন্তু ক্ষমতা উৎপাদন ও বণ্টনের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এখানে বলা হয়েছে কী করা হবে, কিন্তু বলা হয় নি—সংসদ, আমলাতন্ত্র, স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যকার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সম্পর্ক কীভাবে পুনর্বিন্যাসিত হবে। ফলে একজন সংসদ সদস্য কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন, সেই রাজনৈতিক প্রযুক্তি অনুচ্চারিত রয়ে গেছে। এই নীরবতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্বিতীয় ধারার রাজনীতি রাষ্ট্রকে কেবল সেবাদাতা হিসেবে নয়, বরং অন্তর্ভূক্তিমূলক ক্ষমতা কাঠামো হিসেবে পুনর্গঠনের কথা বলে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই ইশতেহারটি রাজনীতির একটি মানবিক ও প্রগতিশীল প্রয়োগ হাজির করলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার তাত্ত্বিক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে এখনো সাবধানী ও সীমাবদ্ধ।

এই নীরবতা হয়তো ইচ্ছাকৃত—স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বাস্তব সীমাবদ্ধতা থেকে, অথবা এই কারণে যে এটি একটি নির্বাচনী ইশতেহার, তাত্ত্বিক দলিল নয়। কিন্তু এর ফলে ইশতেহারটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা তৈরি করে। এটি আমাদের দেখায় রাজনীতির ব্যবহারিক প্রযুক্তি—কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণ রূপরেখা দেয় না। ফলে ইশতেহারটা একটা শক্তিশালী নাগরিক পরিকল্পনা হলেও, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র হিসেবে রাজনীতির বিতর্ক তৈরি করতে পারেনি।

ডা. তাসনিম জারার ইশতেহার দেখায়—বাংলাদেশের রাজনীতি চাইলে সেবা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক মর্যাদার ভাষায় কথা বলতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্নও ছুড়ে দেয়: প্রতিশ্রুত ইশতেহার দিয়েই কি খারাপ রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব? যদি ক্ষমতার বণ্টন, কর্তৃত্বের কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রশ্ন অনুচ্চারিতই থাকে, তবে সবচেয়ে সদিচ্ছাসম্পন্ন প্রতিনিধিও কতদূর যেতে পারবেন? এই ইশতেহার হয়তো একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষার সূচনা, কিন্তু সেটি যদি রাষ্ট্র কাঠামোর প্রশ্নে পৌঁছাতে না পারে, তবে তা শেষ পর্যন্ত একটি সম্ভাবনার কথাই বলে যাবে—বাস্তব রূপ নেবে না। তাই প্রশ্নটা কেবল ঢাকা–৯-এর নয়; প্রশ্নটা গোটা দেশের জন্যই খোলা থাকল: আমরা কি শুধু ভালো মানুষ চাই, নাকি তার সাথে গণমুখী ভালো রাষ্ট্র কাঠামোও চাই?

লেখক: চিকিৎসক ও রাষ্ট্রচিন্তক

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers