সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২২ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

​যশোর রোডের শতবর্ষী বাউল: অ্যালেন গিন্সবার্গ

বাহাউদ্দিন গোলাপ ৩ জুন , ২০২৬, ১৯:৫২:১৯

264
  • ​যশোর রোডের শতবর্ষী বাউল: অ্যালেন গিন্সবার্গ

১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত মেঘলা দিনগুলোতে যখন একটা পুরো জাতির জন্মবেদনা চলছে, তখন সুদূর আমেরিকার সমস্ত বৈভব আর নিরাপদ দূরত্ব তুচ্ছ করে এক জোড়া আর্দ্র চোখ এসে দাঁড়িয়েছিল বাংলার সিক্ত মেঠোপথে। শত শত আশ্রয়হীন, বিপন্ন মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে যিনি বুনেছিলেন মানবতার এক কালজয়ী সুর, তিনি আর কেউ নন—মার্কিন সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিকতাবিরোধী ‘বিট’আন্দোলনের অবিনাশী কণ্ঠস্বর, কবি ও গীতিকার অ্যালেন গিন্সবার্গ। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে আমেরিকার যান্ত্রিক পুঁজিবাদ, তীব্র ভোগবাদ আর ছকবাঁধা সামাজিক রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে ‘বিট’ ছিল এক ঝাঁক তরুণ লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নান্দনিক দ্রোহ। এই আন্দোলনের মূল দর্শনই ছিল সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকরণ আর কৃত্রিমতার শৃঙ্খল ভেঙে মানুষের মনন, ভাষা ও আত্মাকে স্বাধীন করা, যার ভাষা প্রথাগত ছন্দের তোয়াক্কা না করে মানুষের ভেতরের খাঁটি সত্যকে সরাসরি প্রকাশ করত। ষাটের দশকে কলকাতায় এসে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের হাত ধরে বাংলার ‘হাংরি’ বা ক্ষুধার্ত প্রজন্মের সাহিত্য আন্দোলনের সাথেও এই বিট চেতনার এক নিবিড় মেলবন্ধন ঘটেছিল। একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ে ওয়াশিংটনের নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন যখন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ছক কষে পাকিস্তানের বর্বর সামরিক জান্তাকে অন্ধ সমর্থন দিচ্ছিল, গিন্সবার্গের মতো মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীরা তখন কোনো শাসকের রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেননি। রাষ্ট্রের তৈরি কৃত্রিম কাঁটাতার আর অনৈতিক রাজনীতির মুখে চপেটাঘাত করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ভূগোলের সীমানা ছাপিয়ে মানুষের আত্মিক বন্ধন কতখানি সত্য হতে পারে। সেই গভীর মানবিক তাড়না থেকেই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তিনি ছুটে এসেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এই জনপদে।

কলকাতায় এসে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আতিথেয়তা পেলেও গিন্সবার্গের সংবেদনশীল মন ঘরের পরিশীলিত আড্ডায় মগ্ন থাকতে পারেনি। ড্রয়িংরুমের আরামদায়ক আবহ ছেড়ে তিনি বারবার ছুটে গিয়েছিলেন সীমান্তবর্তী রণাঙ্গনে আর কাদা-জলে একাকার শরণার্থী শিবিরগুলোতে। একাত্তরের সেই সেপ্টেম্বর মাসে অবিরাম বর্ষণে ধুয়ে যাওয়া যশোর রোডের দু-ধারে, বাঁশের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া লাখো মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট আর বেঁচে থাকার লড়াই তাঁর আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। সেই প্রত্যক্ষ বেদনার নির্যাস থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাসের এক অবিনশ্বর দলিল—তাঁর দীর্ঘ কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। পরবর্তীতে তরুণ কবি ও অনুবাদক খান মোহাম্মদ ফারাবীর কলমে কবিতাটি যখন বাংলায় অনূদিত হয়, তখন তা প্রতিটি বাঙালির নিজস্ব মনন আর ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। সেই অমর চরণের কিছু অংশ আজও আমাদের যৌথ স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে:

​“শত শত চোখ আকাশটা দেখে

শত শত শত মানুষের দল

যশোর রোডের দু-ধারে বসত

বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল।

কাদা আর জল সে যে মানুষের চোখে

কত মানুষের মরে যাওয়া চেনা

মানুষের ছাঁচে মানুষ তো তারা

কেন তবে কেন মানুষ তা চেনা?”

​যশোর রোডের সেই অফুরান কান্নাকে গিন্সবার্গ কেবল কাগজের পাতায় বন্দি করে রাখাকেই একজন কবির একমাত্র কাজ বলে মনে করেননি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে স্বদেশে ফিরে তিনি বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে তোলার এক অভিনব লড়াইয়ে নামেন। হোয়াইট হাউজের তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতা, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র কড়া নজরদারি আর তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের পাকিস্তানি জান্তাপ্রীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি আমেরিকার মাটিতেই বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনের এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ শুরু করেন। একাত্তরের সেই শীতের দিনগুলোতে নিউইয়র্কের বিভিন্ন চার্চ, থিয়েটার আর দাতব্য হলে তিনি আয়োজন করেন কবিতা ও সংগীতের ব্যতিক্রমী আসর। নিজের প্রিয় হারমোনিয়ামটি বাজিয়ে গিন্সবার্গ যখন আকুল কণ্ঠে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ গাইতেন আর পাশে গিটার হাতে সংগত করতেন তাঁর প্রিয় বন্ধু, কিংবদন্তি বব ডিলান—তখন মার্কিন নাগরিক সমাজেও এক অভূতপূর্ব আলোড়ন তৈরি হয়। সরকারি বৈরিতাকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে এই সব আসরের টিকিট বিক্রি ও ব্যক্তিগত স্তরের লেখক নেটওয়ার্ক থেকে এক বিশাল তহবিল গড়ে ওঠে।

গিন্সবার্গের এই তীব্র মানবিক আকুতি বব ডিলানের চিন্তাকে এতটাই স্পর্শ করেছিল যে, ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে আয়োজিত ইতিহাসের প্রথম মেগা চ্যারিটি কনসার্ট—‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ ডিলানের যোগ দেওয়ার নেপথ্যে গিন্সবার্গের এক সুগভীর অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল। নিজে মূল মঞ্চের পারফর্মার না হয়েও গিন্সবার্গ এই ঐতিহাসিক আয়োজনের প্রচার ও নেপথ্য প্রস্তুতিতে দিনরাত শ্রম দিয়েছিলেন। মার্কিন প্রশাসনের তৈরি করা নানা আইনি প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে তাঁর নিজস্ব দাতব্য উদ্যোগ এবং কনসার্ট থেকে সংগৃহীত সমস্ত অর্থ ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মতো নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক সংস্থার মাধ্যমে সরাসরি ভারতের সীমান্ত এলাকায় আশ্রিত কোটি বাঙালি শরণার্থীর চিকিৎসা ও খাদ্যের জন্য পাঠানো হতো। একই সাথে কলকাতার স্থানীয় সাহিত্যিক ও সমাজসেবামূলক কমিটির মাধ্যমেও এই সাহায্যের একটি অংশ সরাসরি শরণার্থীদের হাতে সঁপে দেয়া হতো। ইতিহাসের পাতায় বব ডিলানের পাশে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাকে গিন্সবার্গের সেই চেনা অবয়ব আজ বিশ্বমৈত্রীর এক পরম স্মারক, যেখানে পশ্চিমা দ্রোহের প্রতীক ‘বিট’ চেতনা যেন বাংলার মাটির চিরায়ত বাউল একতারার মানবিক সুরের সাথে একাকার হয়ে গেছে।

আজ ৩ জুন ২০২৬। ইতিহাসের ধুলোবালি সরিয়ে চিনে নেয়ার মতো এক মহিমান্বিত দিন। আজ থেকে ঠিক একশত বছর আগে, ১৯২৬ সালের এই শুভ তিথিতে আমেরিকার নিউজার্সিতে জন্ম নিয়েছিলেন এই মহান শব্দশিল্পী। একাত্তরের সেই ঘোর অমানিশায় গিন্সবার্গ ছিলেন আমাদের সংকটের পরমাত্মীয়, এক অকৃত্রিম আলোকবর্তিকা। বাংলাদেশ সরকারও পরবর্তীতে এই মহান বন্ধুকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’য় ভূষিত করে আমাদের কৃতজ্ঞতার ঋণ সামান্য স্বীকার করেছে। জন্মের এই অনন্য শতবর্ষ পূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ সমগ্র বাঙালি জাতি গভীর কৃতজ্ঞতা, নিখাদ ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে। সভ্যতার ইতিহাসে যখনই মানবতার সংকট কিংবা শোষণের কালো ছায়া নেমে আসবে, অ্যালেন গিন্সবার্গ এবং তাঁর ‘যশোর রোড’ চিরকাল শোষিতের পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অবিনাশী সাহস জুগিয়ে যাবে।

লেখক: গবেষক, সংগঠক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers