বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ৭ সফর ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

পরিবেশ রক্ষা: প্রয়োজন দায়িত্ববোধ ও অনুপ্রেরণা

শ্যামা সরকার ৫ জুন , ২০২৬, ১২:৫৬:৪৭

305
  • সংগৃহীত

প্রকৃতি ও পরিবেশ আজ সংকটের মুখোমুখি। এ সংকট বিশেষ কোনো গোষ্ঠী, দেশ বা জাতির নয়। সমগ্র মানবজাতির। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে বিপন্ন পরিবেশ। মানুষের বসবাস উপযোগী বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে প্রয়োজন দূষণমুক্ত পরিবেশ। তাই বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ রোধ ও পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পালন করা হয় 'পরিবেশ দিবস'।

৫ জুন 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস'। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত মান উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগ ও জনসচেতনতার লক্ষ্যে পালন করা হয় দিবসটি। প্রতি বছরই এ দিবসটি আলাদা আলাদা থিম নিয়ে পালিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর ঘোষণা অনুযায়ী, এ বছরের থিম 'Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.' এটি শুধু স্লোগান নয়, একটি বৈশ্বিক বার্তা।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের অয়োজক দেশ আজারবাইজান। রাজধানী বাকুতে মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৬ সালের অফিসিয়াল থিম: 'Inspired by Nature. For Climate. For Our Future' (প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।) আজারবাইজান এ বছর আয়োজক হওয়া বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশটি ২০২৪ সালে COP২৯ আয়োজন করেছিল। তাই জলবায়ু আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই দিবসটি পালন করা হবে।

এ থিমটির গুরুত্ব হচ্ছে প্রকৃতি নিজেই এই সংকটের সমাধান দিতে পারে। গাছ, ম্যানগ্রোভ বন, জলাভূমি, মহাসাগর- এগুলো প্রাকৃতিক কার্বন শোষক ও জলবায়ু পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। কারণ UNEP-এর সমীক্ষায় জানা যায়, পৃথিবী বর্তমানে তিনটি সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং দূষণ ও বর্জ্য। এ ভয়াবহতা থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন দায়িত্ববোধ ও অনুপ্রেরণা। এর ফলে বৃদ্ধি পাবে পরিবেশ সচেতনতা, হ্রাস হবে কার্বন নিঃসরণ।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন (কপ২৯) আয়োজন করেছিল আজারবাইজান এবং ২০২৫ সালের জলবায়ু সম্মেলন (কপ৩০) আয়োজক দেশ ছিল ব্রাজিল। সম্মেলনে অংশ নেয়া দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা, বন বিনাশের ইতি টানাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়া হয়। শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী চীন ও যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াবে। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকেই। তবে পরিবেশ বিশ্লেষকরা মনে করেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ওয়াশিংটন-বেইজিং কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

প্রকৃতি ও পরিবেশ দূষণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে বিশ্বব্যাপী। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৮ সালের ২০ মে জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিষদের কাছে একটি চিঠি পাঠায় সুইডেন সরকার। সে বছরই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সাধারণ অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরের বছর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং সমাধানের উপায় খুঁজতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ জুন থেকে ১৬ জুন, জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন (United Nations Conference on the Human Environment) অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনটি ইতিহাসের 'প্রথম পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন'-এর স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৩ সালে সম্মেলনের প্রথম দিন ৫ জুনকে জাতিসংঘ 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস' হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।

মানব সম্প্রদায় ও প্রাণিকূলের অস্তিত্বের জন্য দূষণমুক্ত নির্মল পরিবেশের বিকল্প নেই। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন উপায়ে প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। পরিবেশ দূষণকে আরও বেশি সমস্যাসংকুল করে তুলেছে প্লাস্টিকজাত পণ্যের অপরিকল্পিত ব্যবহার। প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, ভোক্তাসাধারণসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে হতে হবে সচেতন। প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে প্লাস্টিক পণ্যের পুনর্ব্যবহার ও এর টেকসই বিকল্প উদ্ভাবন খুবই জরুরি। প্রকৃতির অক্ষুণ্ণতা বজায় রেখে পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন এবং সম্পদের অপরিমিত ব্যবহারের ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশ আজ অনেকটাই বিপর্যন্ত, হ্রাস পাচ্ছে জীববৈচিত্র্য, বিঘ্নিত হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন শহরে দিন দিন বাড়ছে বায়ুদূষণ। সেই ধাবারাহিকতায় ঢাকার বাতাসের মান 'অস্বাস্থ্যকর' পর্যায়ে রয়েছে। দূষিত শহরের তালিকায় ১১ নম্বরে অবস্থান করছে ঢাকা। বায়ুর মান সূচকে ঢাকার স্কোর ১০৭, যা 'অস্বাস্থ্যকর'। তবে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর, স্কোর ১৭১ অর্থাৎ এখানকার বাতাস 'অস্বাস্থ্যকর' পর্যায়ে রয়েছে। বায়ুমান নিয়ে ডব্লিউএইচও-এর নির্দেশিকা মেনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি (আইকিউ-এয়ার)। বায়ুমানের সূচক অনুযায়ী, ১৬৩ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। তার পরের অবস্থানে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। যার বায়ুমান স্কোর ১৫৫। এ ছাড়া চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে চিলির সান্তিয়াগো শহর, এর বায়ুর মান ১৩৯। অপরদিকে, স্কোর ১৩২ নিয়ে তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে ভিয়েতনামের হ্যানয়।

আইকিউএয়ারের স্কোর শূন্য থেকে ৫০ ভালো হিসেবে বিবেচিত। ৫১ থেকে ১০০ মাঝারি হিসেবে গণ্য করা হয়, আর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর বিবেচিত হয় ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর। স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে তাকে 'অস্বাস্থ্যকর' বায়ু বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকা স্কোরকে 'খুব অস্বাস্থ্যকর' বলা হয়। এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে এবং অন্যদের বাড়ির বাইরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। ৩০১ থেকে ৪০০-এর মধ্যে থাকা স্কোর 'ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। (সূত্র: কালের কন্ঠ, ৪ জুন, ২০২৬)

এদিকে, ইয়েল ইউনিভার্সিটি ও কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সালে প্রকাশিত এনভায়রনমেন্টাল পারফরমেন্স ইনডেক্স (EPI) অনুযায়ী, সামগ্রিক পরিবেশ, বায়ুর গুণগতমান ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে এস্তোনিয়া। তবে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা ও জরিপ অনুযায়ী নির্মল বায়ুর শীর্ষে রয়েছে ১০টি দেশ। এস্তোনিয়া, লুক্সেমবার্গ, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় অঞ্চলের দেশগুলো বায়ুর গুণগতমান ও টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বৈশ্বিক জোট হলো Climate Vulnerable Forum (CVF)। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের শুরুতে এ জোট গঠিত হয়। CVF-এর সভাপতিত্ব প্রতি দুই বছর অন্তর পরিবর্তিত হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘানার কাছ থেকে বার্বাডোস CVF-এর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে। যার প্রধানমন্ত্রী মিয়া অ্যামর মটলি। CVF বর্তমানে আফ্রিকা, এশিয়া, ক্যারিবিয়ান, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের ৭৪টি জলবায়ু 'ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কার্যকরভাবে মোকাবেলায় বেশকিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদানপূর্বক বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ বিষয়ে একটি পৃথক অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সুস্থ পরিবেশকে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এছাড়া, বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ অভিঘাতের সাথে খাপ খাওয়ানো বা অভিযোজন এবং প্রশমন বা কার্বন নিঃসরণ হ্রাস- এ দুই খাতেই বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্প্রতি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ জারি করেছে। দেশের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ কিছু এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩৮টি বনসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এলাকাকে 'সংরক্ষিত এলাকা' বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা, পানি ও বায়ুদূষণ এবং জীববৈচিত্র্য ও মাটির ওপর বিরূপ প্রভাবে পরিবেশের গুণগতমানের অবনতির কারণে মারা যাচ্ছে হাজারো মানুষ। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এর প্রতিকার না করলে এর ফল হবে ভয়াবহ। ধ্বংস হবে প্রাকৃতিক সম্পদ, বাড়বে অভিবাসন ও সংঘাত।

সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করার লক্ষ্যে দূষণমুক্ত বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর আমাদের দেশ। মানুষের সচেতনতার অভাবে আজ তা অরক্ষিত। নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর ভয়াবহতা থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক কলামিস্ট

বি.দ্র.- (বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজজি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

নিউজজি/ এসডি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers