বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৭ সফর ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

হাজী দানেশ ও মেহনতি মানুষের জাগরণ

বাহাউদ্দিন গোলাপ ২৮ জুন , ২০২৬, ১৭:৩৮:০৯

269
  • হাজী দানেশ ও মেহনতি মানুষের জাগরণ

বাংলার পলিমাটিতে একদা এমন কিছু মহৎ প্রাণের আগমন ঘটেছিল, যাঁরা নিজেদের রক্ত ও লড়াকু চেতনার বিনিময়ে এই মাটির অবহেলিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন বুনেছিলেন। ইতিহাসের ধূলিধূসরিত পাতা উল্টালে বিশ শতকের প্রথমার্ধে যে কজন সূর্যসন্তানকে আমরা শোষিত প্রান্তিকের পাশে বজ্রমুষ্টি হয়ে দাঁড়াতে দেখি, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি পুরুষ হাজি মোহাম্মদ দানেশ। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের সুদূর উত্তরের জনপদ দিনাজপুরের সুলতানপুর গ্রামে ১৯০০ সালের ১ মে যখন এই প্রদীপ্ত মানুষের জন্ম হয়, তখন চারদিকের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের মেঘে আচ্ছন্ন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকল এবং তার সমান্তরালে দেশীয় জমিদার ও জোতদারদের চরম শোষণে পিষ্ট হচ্ছিল বাংলার সাধারণ কৃষক সমাজ। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের জোতদারদের চাপিয়ে দেয়া অন্যায্য আধিয়ারী প্রথা এবং হাতি তোলা কিংবা মেলা তোলার মতো নানাবিধ বেআইনি করের বোঝায় প্রান্তিক চাষিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। এমন এক সামন্তবাদী আবহে এক সম্ভ্রান্ত, ভূস্বামী মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি নিজের শ্রেণির মোহ ত্যাগ করে বেছে নিয়েছিলেন লাঙল ধরা মানুষের মুক্তির পথ। শৈশব ও কৈশোরে গ্রামীণ সমাজের অসাম্যকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা এবং মক্কা শরিফ থেকে হজ পালন করে আসা ধর্মপ্রাণ পরিবারের নৈতিক শিক্ষা তাঁকে এক অনন্য মানবিক দর্শনে দীক্ষিত করেছিল।

​তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলো ছিল একাধারে নিবিড় জ্ঞানচর্চা ও সমাজকে গভীরভাবে চেনার এক অনন্য পাঠশালা। দিনাজপুরের চিলড্রেন পার্ক হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান ভারতের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ইতিহাস ও দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৩১ সালে আইনশাস্ত্রে ওকালতি ডিগ্রি সম্পন্ন করার পরও তিনি কোনো বিলাসী জীবনের মোহে অন্ধ হননি। দিনাজপুরের আদালতে ওকালতি শুরু করার পর তিনি গরিব কৃষকদের পক্ষে বিনামূল্যে আইনি লড়াই লড়েছেন, যা তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত। ফ্লৌড কমিশনের সুপারিশের আলোকে ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষকের নিজের খামারে তোলার যে যৌক্তিক আইনি ভিত্তি, তা তিনি তাঁর ক্ষুরধার আইনি প্রজ্ঞা দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া কিসান সভার সাথে যুক্ত হন এবং একই বছর উত্তরবঙ্গ কৃষক সম্মেলনের সফল আয়োজন করে কৃষকদের অধিকার আদায়ের মূল স্রোতে নিজেকে সঁপে দেন। তাঁর চিন্তার জগৎ গড়ে উঠছিল মার্ক্সীয় শ্রেণিহীন সমাজের চেতনা এবং সুফিবাদের চিরন্তন সাম্যের বাণীর এক অপূর্ব সমন্বয়ে, যেখানে মানুষের চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা কিংবা আইনি সংস্কার দিয়ে বাংলার দুঃখী কৃষকের ভাগ্য বদলানো সম্ভব নয়, যদি না ভূমির উপর কৃষকের প্রকৃত অধিকার ফিরিয়ে দেয়া যায়। এই গভীর ও নান্দনিক জীবনদর্শনই তাঁকে একজন সাধারণ আইনজীবীর খোলস ভেঙে রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলেছিল।

এই দর্শন ও সাংগঠনিক দক্ষতার অবিনাশী সৃষ্টি ছিল উত্তরবঙ্গে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন। জোতদারের অন্যায্য ভাগের বিরুদ্ধে আধি নয়, তেভাগা চাই এবং লাঙল যার, জমি তার— এই অমর স্লোগানকে বুকে ধারণ করে ১৯৪৬-৪৭ সালে তিনি হাজার হাজার সাঁওতাল, রাজবংশী আর বাঙালি কৃষককে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। শোষকের বন্দুকের নল কিংবা ঔপনিবেশিক আইনি চোখ রাঙানি কোনো কিছুই এই দৃঢ়চেতা মানুষটিকে তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তাঁরই নেতৃত্বে তৎকালীন দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি ও মালদহসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ কেঁপে উঠেছিল অধিকার আদায়ের মিছিলে, যা ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। নীলফামারীর ডোমার ও দিনাজপুরের খাঁপুরে কৃষকদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ সংগ্রাম তাঁর একক নেতৃত্বের স্বাক্ষর বহন করে। এই আন্দোলন কেবল উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক কৃষক মুক্তি ও বামপন্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বৈপ্লবিক ভিত্তিপ্রস্তর। দেশভাগের পর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কাল পর্বেও তাঁর এই আপসহীন সংগ্রামী সত্তা বিন্দুমাত্র স্তিমিত হয়নি। ১৯৪৮ সাল থেকেই তিনি উত্তরবঙ্গে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করতে শুরু করেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের গোপন নথির নিভৃত পৃষ্ঠাগুলো পর্যালোচনা করলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক স্তরে উত্তরবঙ্গে তাঁর এই বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী ভূমিকার সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ মেলে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন ঢাকার রাজপথ ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়, তখন দূর দিনাজপুরে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনে তিনি প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেন এবং এর জেরে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করে।

ভাষা আন্দোলনের সেই উত্তাল চেতনা ও আত্মত্যাগকে তিনি গভীরভাবে বুকে ধারণ করেছিলেন। নিজের প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী রাজনৈতিক আদর্শকে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ১৯৫৩ সালে তিনি ‘গণতন্ত্রী দল’ নামে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তৎকালীন পাকিস্তানের সামন্ততান্ত্রিক ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা নীতির বিরুদ্ধে তখন প্রগতিশীল শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিল। এই ঐতিহাসিক ক্ষণে, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রগতিশীল ধারার সঙ্গে তিনি একাত্ম হন। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের পর ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ গঠনে তিনি অন্যতম প্রধান সহ-সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় কেবল শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলার অপরাধে তিনি আইয়ুব খান এবং পাকিস্তান সরকারের চরম রোষানলে পড়েন। ফলে জীবনের প্রায় এক যুগ সময় অর্থাৎ দীর্ঘ তেরোটি বছর তাঁকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু কারাগারের চার দেয়াল তাঁর মুক্তিকামী চেতনাকে কখনই বন্দি করতে পারেনি। এর প্রমাণ মেলে যখন ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে এবং আইয়ুববিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করতে তিনি পুনরায় রাজপথে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনেও তিনি বামপন্থি প্রগতিশীল শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে জোরালো ভূমিকা রাখেন এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার ডাক দেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে হাজি দানেশের অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক সুনির্দিষ্ট দালিলিক অধ্যায়। পঁচিশে মার্চের কালরাতের পর পর তিনি ভারতে গমন করেন এবং প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত হন। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য গড়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে যে সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়েছিল, হাজি দানেশ ছিলেন তার অন্যতম সম্মানিত সদস্য। এই বিশেষ কমিটির নীতিনির্ধারক হিসেবে তিনি প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে সীমান্ত এলাকায় নিরলসভাবে কাজ করেন। তাঁরই ডাক ও বৈপ্লবিক দিকনির্দেশনায় উত্তরবঙ্গের বিপুলসংখ্যক কৃষক ও মেহনতি মানুষ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে অংশ নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও তিনি তাঁর চিরকাল লালিত সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি; ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নেন এবং বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে আজীবন কাজ করে যান।

একজন দূরদর্শী সমাজসংস্কারক ও জাতীয় নেতা হিসেবে তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলা। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, অধিকার সচেতন সমাজ বিনির্মাণের প্রথম হাতিয়ার হলো শিক্ষা। সেই তাড়না থেকেই দিনাজপুরের প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে অসংখ্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন। তাঁর এই অনন্য শিক্ষানুরাগের সবচেয়ে বড় স্মারক আজ আমাদের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের দান করা জমিতে গড়ে ওঠা সেই স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যাপীঠই আজ ‘হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে দেশজুড়ে সমাদৃত। শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অবিচল থাকার কারণে এই মাটির মানুষগুলো তাঁকে ভালোবেসে ‘তেভাগার মহানায়ক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। ১৯৮৬ সালের ২৮ জুন ঢাকাতে যখন এই মহান চিন্তাবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনাবসান ঘটে, তখন বাংলা হারিয়েছিল তার এক পরম অভিভাবককে। আজ ২৮ জুন, এই বিপ্লবী চেতনার মহানায়কের প্রয়াণ দিবস। মৃত্যুর চার দশক পরও ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে তিনি আজো বেঁচে আছেন প্রতিটি খেটে খাওয়া মানুষের মিছিলে, প্রতিটি অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। তাঁর সামগ্রিক জীবন ও সংগ্রাম আমাদের এই চিরন্তন শিক্ষাই দিয়ে যায় যে, শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শোষিতের পাশে দাঁড়ানোই একজন প্রকৃত মানুষের আসল ধর্ম।

(লেখক: গবেষক, সংগঠক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers