বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩২ আষাঢ় ১৪৩৩ , ৩০ মুহররম ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

হায়াত মাহমুদ এবং আমাদের মননের আদিগন্ত আকাশ

বাহাউদ্দিন গোলাপ ৩ জুলাই , ২০২৬, ১৫:৪৭:২৬

257
  • হায়াত মাহমুদ এবং আমাদের মননের আদিগন্ত আকাশ

মহাকালের এক অসীম ও অনন্ত যাত্রায় কিছু মানুষের পৃথিবীতে আসা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি মূলত প্রকৃতির এক গভীর, নিভৃত ও মায়াবী আয়োজন। শব্দ যখন কেবলই ধ্বনিমাত্র থাকে না, যখন তা হয়ে ওঠে মানুষের অবরুদ্ধ আত্মার আরশি কিংবা সংস্কৃতির অবিনাশী বাতিঘর, ঠিক তখনই জন্ম নেন হায়াত মাহমুদের মতো মননশীল মানুষ। ১৯৩৯ সালের ২ জুলাই অবিভক্ত বাংলার হুগলি জেলার মৌড়ি গ্রামে এক শান্ত স্নিগ্ধ দুপুরে তিনি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেন। পিতা-মাতা তাঁর নাম রেখেছিলেন মনিরুজ্জামান, তবে বাংলা সাহিত্যের উদার আকাশ তাঁকে বরণ করেছে 'হায়াত মাহমুদ' নামে। তাঁর জন্মের সময়টা ছিল এক ঐতিহাসিক মহাসন্ধিক্ষণ। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রলয়ংকরী ধ্বংসযজ্ঞ, অন্যদিকে ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রগতিশীল লেখক শিবিরের তীব্র মানবিক আর্তি। এই দুইয়ের মাঝেই এক অস্থির পরিবেশে তাঁর শৈশব রূপ নেয়। এরপর এলো ১৯৪৭ সালের দেশভাগের নির্মম নিয়তি। নিজের চেনা জল-হাওয়া আর আদি মাটির আজন্ম মায়া উপড়ে সপরিবারে তিনি চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব বাংলায়। শিকড় ছিঁড়ে আসার সেই আদিম কষ্ট কিশোর হায়াত মাহমুদকে এক নিভৃত বৈরাগ্য ও গভীর জীবনদর্শনে দীক্ষিত করেছিল। তবে তিনি সেই দুঃখকে কখনো ক্ষোভে রূপ দেননি, বরং রূপান্তরিত করেছেন এক অতলান্তিক মানবিক ঔদার্যে।

​ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল থেকে ১৯৫৬ সালে তিনি প্রবেশিকা পাস করেন। পরবর্তীতে ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে আইএ পাস করার পর তাঁর শব্দ-সাধক সত্তাটি অলক্ষ্যে ডানা মেলতে শুরু করে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শুদ্ধ পরিমণ্ডল থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ কবি অমিয় চক্রবর্তীকে নিয়ে তিনি গভীর পিএইচডি গবেষণা করেন। এই গবেষণা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না, এটি ছিল অমিয় চক্রবর্তীর বৈশ্বিক দর্শনের সাথে তাঁর নিজস্ব অন্তর্মুখী স্বভাবের এক অনন্য আত্মিক মেলবন্ধন। ১৯৫২ সালের রক্তঝরা ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে এই কিশোর ছাত্রটির মনে মাতৃভাষার প্রতি যে অকৃত্রিম দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, তা তিনি আমৃত্যু বয়ে বেরিয়েছেন পরম নিষ্ঠায়। বাংলা ভাষাকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করতে পরবর্তীতে তিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখেন। বাংলা একাডেমির 'প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম' নির্ধারণে তাঁর অবদান ছিল অভিভাবকতুল্য। বাঙালিকে শুদ্ধভাবে কথা বলতে ও লিখতে শেখানোর জন্য তাঁর 'বাংলা লেখার নিয়মকানুন' এবং সম্পাদিত অনন্য অভিধানগুলো আজো প্রতিটি ভাষা-সচেতন মানুষের টেবিলে বাতিঘরের মতো আলো ছড়ায়।

​কর্মজীবনে তিনি ছিলেন ক্লাসরুমের এক পরম শ্রদ্ধেয় ঋষিতুল্য শিক্ষক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় তিনি যুগের পর যুগ তরুণ মনে চিন্তার আলো ও রুচির বীজ বুনেছেন। সাদা চুল আর শুভ্র পাজামা-পাঞ্জাবির সেই স্নিগ্ধ চেনা অবয়বে তিনি যেন ছিলেন চলন্ত এক প্রাচীন বিদ্যাপীঠ। কিন্তু তাঁর আসল শিক্ষালয় ছিল সাহিত্যের এক অন্তহীন উদার মাঠ। হায়াত মাহমুদের কলম যখনই কাগজে স্পর্শ করেছে, তখনই তা সোনা ফলিয়েছে। বিশেষ করে বাংলা শিশুসাহিত্য, প্রাবন্ধিক সাহিত্য ও জীবনী সাহিত্যে তাঁর অবদান এক রূপকথার মতো। মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে লেখা তাঁর 'প্রতিভা ও চরিত্র' গ্রন্থে মধুসূদনের ভেতরের তীব্র অন্তর্দন্দ্ব এবং সংস্কৃতির সংঘাতকে তিনি অনন্য তাত্ত্বিক আলোয় ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে, 'নজরুল ইসলাম: কবি ও মানুষ' গ্রন্থে তিনি নজরুলের বিদ্রোহকে কেবল রাজনৈতিক পটভূমিতে না দেখে তাঁর ভেতরের আধ্যাত্মিক আর্তি দিয়ে বিচার করেছেন। শিশু ও কিশোর সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন এক অন্য ধারার জাদুকর। তাঁর 'রবীন্দ্রনাথ: কিশোর জীবনী'র পাতা ওল্টালে মন জুড়িয়ে যায়। কঠিন ইতিহাসকে রূপকের মতো মিষ্টি ও সহজ করে বলার বিরল ক্ষমতা ছিল তাঁর। আর তাঁর সবচেয়ে বড় জাদুকরি দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে অনুবাদ শিল্পে। ইংরেজি মাধ্যমের সুচারু সহায়তায় সুদূর রাশিয়ার ম্যাক্সিম গোর্কি বা আন্তন চেখভের গল্প, পুশকিনের কবিতা কিংবা অমর ফরাসি মহাকাব্য 'রলাঁ-র গান'কে তিনি এমন এক মায়াবী বাংলায় রূপান্তরিত করেছেন যা অনন্য। রুশ ও ফরাসি সাহিত্যের সেই সুদূর মনস্তত্ত্বকে বাঙালি মধ্যবিত্তের চেনা ঘরোয়া আবেগে রূপ দেওয়ার এই বিরল শিল্পকলা তাঁর অনুবাদকে এক নতুন মৌলিকতা দিয়েছিল।

তাঁর জীবনের দর্শন ছিল একেবারেই সহজ ও খাঁটি ইহজাগতিক মানবতাবাদ। মানুষকে ভালোবাসা এবং যশের মোহ থেকে দূরে থেকে নিজের কাজটুকু করে যাওয়াই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। প্রচারের চড়া আলো বা সস্তা তালি তাঁকে কখনো টানেনি। তিনি কোলাহল থেকে দূরে, নিজের পড়ার টেবিলে এক নির্জন ও পবিত্র দ্বীপ তৈরি করেছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের কবি জন কিটস যেমন সব সংশয়ের মাঝেও সুন্দরের জয়গান গেয়েছিলেন, কিংবা রুশ মহৎ কথাসাহিত্যিক লিও তলস্তয় যেভাবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানুষের ভেতরের ভালো মানুষটিকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, হায়াত মাহমুদও ঠিক তেমনি করে বাংলা সাহিত্যে এক শান্ত, অবিচল অথচ তীব্র সত্যের সাধনা করে গেছেন। ফরাসি চিন্তাবিদ ভলতেয়ারের মতো তাঁর মাথাটি ছিল প্রখর যুক্তিতে ভরা, কিন্তু মনটি ছিল চন্দনের মতো শীতল ও নরম। তিনি কোনো দলের বা মতের শিকলে নিজেকে বাঁধেননি। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সত্য ছিল মানুষ আর মানুষের ভাষা।

এই শান্ত ও গভীর সাধনার জন্য তিনি ভূষিত হয়েছেন একুশে পদক এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের মতো দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মানে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন বাঙালি মধ্যবিত্তের মনন, পরিমিতিবোধ ও সংস্কৃতির এক নীরব বিপ্লব ঘটানো। হায়াত মাহমুদ কেবল জাগতিক সম্মানের ফ্রেমে বন্দি কোনো নাম নন, তিনি মূলত বাঙালি মধ্যবিত্তের মনন-বিশ্বের এক নীরব ও অবিনাশী রূপান্তর। আজ আমাদের চারপাশের সময়টা বড্ড বেশি কোলাহলমুখর, মেকি এবং যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। মানুষ ক্রমাগত আত্মকেন্দ্রিকতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে হায়াত মাহমুদের প্রাসঙ্গিকতা এক অতল মহাসমুদ্রের মতো অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। জাগতিক নশ্বরতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে একা একটি পড়ার টেবিলে বসেও বিশ্বসংসারের স্পন্দন অনুভব করা যায়। প্রযুক্তির এই চোখধাঁধানো ও কৃত্রিম আলোর যুগেও মানুষের মনটাই যে মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও পবিত্র ল্যাবরেটরি, তাঁর জীবনদর্শন আমাদের সেই আদিম ধ্রুবসত্যেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়। হায়াত মাহমুদ কোনো সাময়িক ধূমকেতু নন, তিনি বাংলা সাহিত্যের অনন্ত আকাশে এক পরম স্নিগ্ধ ও চিরস্থায়ী ধ্রুবতারা। তাঁর সেই শান্ত পরিমিতিবোধ ও শব্দের প্রতি পবিত্র নিষ্ঠা আমাদের আত্মিক দীনতা থেকে মুক্তির পথ দেখায়। আমাদের শান্ত হতে শেখায় এবং এই অস্থির পৃথিবীতে মানুষের মতো মানুষ হতে শেখায়।

হায়াত মাহমুদ আমাদের সাহিত্যের ভূগোলে এমন এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ, যেখানে নোঙর ফেললে ক্লান্তি দূর হয়, চেতনা সতেজ হয়। জীবনের শেষলগ্নে এসেও তাঁর সেই ঋষিতুল্য নিস্পৃহতা ও কাজ করে যাওয়ার অদম্য স্পৃহা আমাদের উত্তরপ্রজন্মের জন্য এক অলিখিত পাথেয়। তিনি কোনো নির্দিষ্ট কালখণ্ডের শিকলে বন্দি নন, বরং সময়কে জয় করে তিনি হয়ে উঠেছেন শাশ্বত। শব্দ আর নীরবতার এই মহান সাধক তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। কারণ নশ্বর শরীরের অবসান ঘটলেও মননের ধ্রুবতারা কখনো নেভে না। তাই তাঁর স্নিগ্ধ আলো আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে সুদূর অনাগত দিনেও।

📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ,

(লেখক: গবেষক, সংগঠক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers