রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

ক্যাস্ত্রো, শোষিতের আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর

বাহাউদ্দিন গোলাপ ১৬ আগস্ট , ২০২৬, ১৮:২২:০৩

204
  • ক্যাস্ত্রো, শোষিতের আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর

১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার তৎকালীন ওরিয়েন্টে প্রদেশের বিরানের এক আখের খামারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। সে সময় লাতিন আমেরিকার রাজনীতি ও অর্থনীতি আচ্ছন্ন ছিল মার্কিন পুঁজির প্রভাব আর স্বৈরশাসক ব্যাটিস্টার শোষণে। ধনী খামারির সন্তান হয়েও খামারশ্রমিকদের দারিদ্র্য তরুণ কাস্ত্রোর মনে গভীর দাগ কেটেছিল। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার দিনে তিনি কিউবার স্বাধীনতার জনক হোসে মার্তির জাতীয়তাবাদী দর্শনে উদ্বুদ্ধ হন। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই মনকাদা সেনা ব্যারাকে ব্যর্থ আক্রমণের পর রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘ ভাষণ দেন, যা পরে La Historia Me Absolverá (‘ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে’) নামে প্রকাশিত হয়। এই ঐতিহাসিক বক্তব্যই ছিল তাঁর বিপ্লবের প্রথম রাজনৈতিক ইশতেহার।

​সিয়েরা মায়েস্ত্রার দুর্গম পাহাড়ে আর্নেস্তো চে গেভারাকে সাথে নিয়ে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি ব্যাটিস্টা সরকারের পতন ঘটান কাস্ত্রো। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নবগঠিত সরকারকে বড় বৈশ্বিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। ১৯৬১ সালে সিআইএ সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘বে অব পিগস’ আক্রমণ মাত্র তিন দিনে পরাস্ত করে কিউবান বাহিনী। এর পরের বছর, ১৯৬২ সালে মার্কিন আগ্রাসন প্রতিরোধে কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর সিদ্ধান্তে বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়, যা ইতিহাসে ‘কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস’ নামে পরিচিত। মার্কিন সিনেটের ১৯৭৫ সালের ‘চার্চ কমিটি রিপোর্ট’-এ উঠে আসে কাস্ত্রোকে হত্যার শত শত চক্রান্তের দালিলিক প্রমাণ। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পরাশক্তির চাপ সামলে নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা ছিল তাঁর রাজনীতির প্রধান ভিত্তি।

বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের সাথেও কাস্ত্রো ও কিউবার সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কিউবা নৈতিক সমর্থন জানায় এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) শীর্ষ সম্মেলনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটে। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে কাস্ত্রো উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর সেই কালজীয় বাক্য: “আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় এই মানুষটিই হিমালয়।” এই আত্মিক টান আজও বাংলাদেশ-কিউবা বন্ধুত্বের এক অবিনাশী ঐতিহাসিক স্মৃতি।

রাজনীতির বাইরে কাস্ত্রোর মননশীল জীবন ছিল গভীর ও সাহিত্যবান্ধব। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাথে তাঁর দীর্ঘ দিনের নিবিড় বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধুত্ব ছিল বিশ্বসাহিত্যে সুপরিচিত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কাস্ত্রো শোষিত মানুষের অন্যতম কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। ১৯৭৫ সালে আফ্রিকায় সেনাদল পাঠিয়ে তিনি সরাসরি বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেন। ১৯৮৮ সালের ঐতিহাসিক ‘কুয়াতো কুয়ানভালে’-র যুদ্ধে কিউবান বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী সরকারের পতন ও নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির পথকে ত্বরান্বিত করেছিল। নিজ দেশে ১৯৬১ সালে পরিচালিত অভূতপূর্ব অভিযানের মাধ্যমে শতভাগ নিরক্ষরতা দূর করা এবং বিনামূল্যে সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা চালুর পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। তীব্র অবরোধের মধ্যেও কিউবায় গড়ে ওঠে বিশ্বমানের বায়োটেকনোলজির ভিত্তি, যার ফলে আজ কিউবা ক্যানসারের ওষুধ ‘সিমাভ্যাক্স’ (CimaVax) ও কোভিডের নিজস্ব টিকা উৎপাদনে সক্ষম। এমনকি ষাট ও সত্তরের দশকে সমকামী ও যৌন সংখ্যালঘুদের প্রতি কিউবান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কথা ২০১০ সালে এক আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারে কাস্ত্রো প্রকাশ্যে স্বীকার করেন এবং এর দায় নিজের কাঁধে নেন।

​তবে কাস্ত্রোর শাসনের অনেক গুরুতর সমালোচনা রয়েছে। তাঁর চার দশকের বেশি সময়ের শাসনামলে একদলীয় ব্যবস্থা বহাল ছিল; স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বা রাজনৈতিক বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আবার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় অর্থনীতির নীতিগত ত্রুটি এবং টানা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার যৌথ প্রভাবে কিউবার অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়ে। এই অর্থনৈতিক স্তব্ধতার কারণে তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল অংশকে বাধ্য হয়ে দেশত্যাগের পথ বেছে নিতে হয়েছে, যা আজও কিউবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রধান সংকট।

​ইগনাসিও রামোনে-কে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থ My Life: A Spoken Autobiography-তে কাস্ত্রো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা সিদ্ধান্ত ও চিন্তার খোলামেলা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ১৯৯২ সালের রিও ধরিত্রী সম্মেলনে পরিবেশ বিপর্যয় ও গ্লোবাল সাউথের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেয়া তাঁর বক্তব্য আজও বিশ্ব জলবায়ু সংকটের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। কাস্ত্রোর অর্জনের উজ্জ্বল আলো যেমন আছে, তেমনই আছে তাঁর ব্যবস্থার স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা। আজ ১৩ আগস্ট, জন্মদিনে এই অনমনীয় ও জটিল বিপ্লবী নেতাকে অন্ধ ভক্তি কিংবা ঢালাও বিদ্বেষের বাইরে রেখে ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ আলোতেই মূল্যায়ন করা সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।

(লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী।  সভাপতি, ৭১’র চেতনা)

নিউজজি/নাসি  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers