শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

ফিচার
  >
প্রাণী ও পরিবেশ

শ্রাবণের জলরঙ: কদম-কেয়ার সুবাসে মেঘমেদুর স্মৃতি

বাহাউদ্দিন গোলাপ ১৬ জুলাই , ২০২৬, ১৮:৫৮:২২

238
  • শ্রাবণের জলরঙ: কদম-কেয়ার সুবাসে মেঘমেদুর স্মৃতি

সজল মেঘের ভারী ডানায় ভর করে আজ আবার দুয়ারে কড়া নাড়ল পহেলা শ্রাবণ। আষাঢ়ের চপল চঞ্চলতা, আকস্মিক মেঘের তর্জন-গর্জন আর ঝোড়ো হাওয়ার যে তীব্র দাপট, শ্রাবণের এই প্রথম সকালে তা যেন এক গভীর, শান্ত সমর্পণে রূপ নিয়েছে। আজকের আকাশ মানেই জলভারাতুর মেঘের এক নিবিড় স্নিগ্ধতা; যেখানে সময়ের কোনো তাড়া নেই, নেই কোনো জাগতিক ব্যস্ততা। আকাশজুড়ে ধূসর ও কাজল রঙের মায়াবী চাদর আজ চরাচরের বুকে এক শান্ত বিরহের আবরণ বিছিয়ে দিয়েছে। পহেলা শ্রাবণের এই বৃষ্টিভেজা সকালে ঘরের জানালা খুলে বাইরে তাকালে মন মুহূর্তেই উদাস হয়ে যায়। চেনা চারপাশটা নিমেষেই সুন্দর কোনো রূপকথার জগৎ বলে মনে হয়। ধুলোবালি ধুয়ে যাওয়া সতেজ সবুজ পাতা আর সোঁদা মাটির চেনা সুবাস অবলীলায় আমাদের মনের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি ও মলিনতা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর আকুতি—'শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে/ তোমারি সুরটি আমার মুখের পরে, বুকের পরে'—আজ আর কেবল সুরের খেলা নয়, আজ তা প্রকৃতির এক নিভৃত ধ্যানের মুহূর্ত। আষাঢ়ের মেঘলা দিনের পর শ্রাবণের এই অবিরাম ও শান্ত জলধারা সিক্ত শীতলতার এক পরম প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতির বুকে, যার নিবিড় পরশে মাটির গহ্বরে ঘুমিয়ে থাকা প্রাণগুলো এক অপূর্ব স্পন্দনে জেগে উঠছে আজ।

আজকের এই বিশেষ দিনে গ্রামীণ মেঠোপথ আর ঘাটের দিকে তাকালে মনে হয়, কোনো এক চিত্রশিল্পী যেন তাঁর ক্যানভাসে চিরকালের এক জলছবি এঁকে রেখেছেন। এখানকার সৌন্দর্য সম্পূর্ণ আদিম ও অকৃত্রিম, যেখানে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে রূপের মেলা বসে। বিল-ঝিল, নদী-নালা এ সময় কানায় কানায় ভরে উঠেছে, যেন তারা ফিরে পেয়েছে তাদের হারিয়ে যাওয়া যৌবন। টিনের চালে বৃষ্টির অবিরাম টুপটাপ শব্দ কিংবা বাঁশঝাড়ের মাথায় জলের নূপুরধ্বনি গ্রামীণ জীবনকে কিছুটা অলস করলেও তার নান্দনিকতাকে বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ। ঘরের দাওয়ায় চুপচাপ বসে এই জলপতন দেখার যে আনন্দ, তা মনের সব হিসাব-নিকাশ ভুলিয়ে দেয়। বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া কদম, কেয়া আর জুঁইয়ের হালকা মিষ্টি সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। মাঠের কৃষকেরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন কাদা-জলে লাঙল-জোয়াল নিয়ে আমনের চারা রোপণের চিরকালীন উৎসবে, আর ঘরের কোণে বসে গ্রামীণ বধূরা সুঁই-সুতোর ফোঁড়ে বুনে চলেছেন কোনো না-বলা বিরহ কিংবা ভালোবাসার গল্প। কাদার ছোঁয়ায় ধন্য মেঠোপথে ছাতা মাথায় দিয়ে কোনো পথিকের হেঁটে যাওয়া কিংবা নদীর ঘাটে বাঁধা একলা নৌকার দুলুনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলার প্রাণ আসলে এই জল ও মাটির মৈত্রীতেই বেঁচে থাকে।

​গ্রামীণ সেই শান্ত রূপের বিপরীতে ইট-পাথরের ধূসর শহরের বুকে শ্রাবণের প্রকাশ আজ একেবারে ভিন্ন এক দোলাচল তৈরি করেছে। শহরের শত ব্যস্ততার মাঝেও পহেলা শ্রাবণের এই এক পশলা অঝোর বৃষ্টি মানুষের কঠিন মনকে মুহূর্তের জন্য হলেও নরম ও আর্দ্র করে দিয়ে যাচ্ছে। জ্যামে আটকে থাকা বাসের জানালায় কপাল ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকা কোনো ক্লান্ত নাগরিকের চোখ যখন রাস্তার ধারের ভেজা কৃষ্ণচূড়ার পাতায় কিংবা কোনো একলা ল্যাম্পপোস্টে গিয়ে আটকে যায়, তখন তার মন নিমেষেই ফিরে যায় ফেলে আসা সোনালী শৈশবে বা কোনো প্রিয় স্মৃতির পাতায়। রাজপথের সাময়িক জলজট আর নাগরিক দুর্ভোগকে মেনে নিয়েও মানুষ এই দিনটিকে এক অদ্ভুত ভালোলাগায় জড়িয়ে নেয়। বহুতল ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া আর কান পেতে বৃষ্টির একটানা রিনিঝিনি শব্দ শোনার মধ্যে যে শান্ত আনন্দ আছে, তা কেবল এই ঋতুতেই সম্ভব। রিকশার হুড তুলে দিয়ে বৃষ্টিভেজা চেনা শহরের অচেনা রূপ দেখতে দেখতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই আকুল সুর মনে পড়ে যায়— ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে/ বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে।’ এই শহুরে শ্রাবণ আমাদের শেখায় যান্ত্রিকতার কঠিন আবরণের মাঝেও কীভাবে হৃদয়ের তারে শুদ্ধতার সুর তুলতে হয়।

​বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে শ্রাবণ কেবল একটি মাস নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক প্রতীক হিসেবে জড়িয়ে আছে। প্রাচীন কবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ থেকে শুরু করে বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা-কৃণের বিরহলীলা—সবখানেই শ্রাবণের মেঘ ও বৃষ্টি আকুল হৃদয়ের সমার্থক। বৈষ্ণব সাহিত্যের চিরকালীন সেই সুর আজও আমাদের হৃদয়ে বাজে— ‘মন্দির বাহির কঠিন কবাট / চলইতে শঙ্কা পঙ্কিল বাট...’। শ্রাবণের এই ছায়াময় দিনগুলো মানুষের ভেতরের সুপ্ত সৃজনশীলতাকে নাড়া দেয়। টেবিলে খাতা-কলম নিয়ে বসার কিংবা কোনো পুরোনো প্রিয় বইয়ের পাতা উল্টে দেখার এই যে তাগিদ, তা যেন প্রকৃতির এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক দান। বৃষ্টি কেবল শুষ্ক মাটির বুককেই উর্বর করে না, তা আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত অনুভূতিগুলোকেও সিক্ত ও সংবেদনশীল করে তোলে। শ্রাবণের এই কাজল রঙ আমাদের মনের সমস্ত গ্লানি আর মলিনতাকে ধুয়ে দেয়, প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে তৈরি করে এক অদৃশ্য ও নিবিড় আত্মিক মেলবন্ধন।

​পহেলা শ্রাবণের এই স্নিগ্ধ ও শান্ত দিনটি আমাদের একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবনে এক টুকরো সবুজ প্রশান্তি এনে দেওয়ার পরম সুযোগ। আমাদের প্রতিদিনের যে ব্যস্ত পথচলা, তার মাঝে এই অবিরাম বৃষ্টি আমাদের একটু থামতে শেখায়, একটু বুক ভরে প্রকৃতির আদিম ঘ্রাণ নিতে শেখায়। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন আমাদের মনে এই শাশ্বত আশার বীজ বুনে যায় যে, জীবনের সমস্ত রুক্ষতা, শূন্যতা আর দহনের পর একদিন অবধারিতভাবেই প্রশান্তির বারিধারা নেমে আসে। মেঘের আড়ালে যে সূর্য ঢাকা পড়ে থাকে, তা হারিয়ে যায় না, বরং তা পৃথিবীকে সুজলা-সুফলা করার এক নীরব আয়োজন মাত্র। শ্রাবণের এই পরম শুদ্ধির বর্ষণে ধুয়ে যাক আমাদের চারপাশের সব হিংসা, বিদ্বেষ, কৃত্রিমতা আর মলিনতা। প্রকৃতির এই চিরন্তন জলছবির মহোৎসবে আমরাও যেন অংশীদার হতে পারি আমাদের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে, সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে। বিদায় নিক মনের সব শুষ্কতা, জয় হোক প্রাণের অমল স্পন্দনের।

(লেখক: গবেষক, সংগঠক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers