মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ , ৫ শাওয়াল ১৪৪২

ফিচার
  >
ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস

নিউজজি ডেস্ক ১৪ ফেব্রুয়ারি , ২০২১, ১০:৩৭:৫৯

  • ছবি : সংগ্রহ

ঢাকা: আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। পুরুষরা লাল পাঞ্জাবি আর নারীরা লাল-সাদা শাড়ি বা অন্য পোশাক পরে বেরিয়ে পড়েন দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপনের জন্য। বছরজুড়ে ভালোবাসা চললেও দিনটি যেন একটু বেশি করেই ভালোবাসার। এদিনে নিজের ভ্যালেন্টাইনকে প্রপোজ করা, বিভিন্ন উপহারের পাশাপাশি লাল গোলাপ দেওয়া, তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়াসহ নানা কর্মকাণ্ডে মেতে ওঠেন তরুণ-তরুণীরা।

বিশ্বজুড়ে কেনো এই ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন করা হয়-এর পুরো ইতিহাস সম্পর্কে হয়তো অনেকের জানা নেই। আবার অনেকেরই হয়তো মনে প্রশ্ন জাগে, ভ্যালেন্টাইন ডের জন্ম বা উৎপত্তি কখন, কবে আর কোথায় হয়েছিল? বাংলাদেশেই বা এ দিবসটি কবে থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে। পাঠক, চলুন ভালোবাসা দিবসের অদ্যোপান্ত জেনে নিই।

বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবস প্রবর্তন করেন সাংবাদিক শফিক রেহমান। ১৯৯৩ সালে শফিক রেহমান তার সম্পাদিত মাসিক যায়যায়দিন পত্রিকায় ১৪ ফেব্রুয়ারিকে উপলক্ষ করে ‘ভালোবাসা সংখ্যা’ নামে একটা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেন। সে সংখ্যার পুরোটাজুড়ে ছিল দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাঠানো লেখকের ভালোবাসার গল্প। তখনও বা কে জানতো, একদিন বাংলাদেশে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ভালোবাসা দিবস রীতিমত উৎসবে রূপ নেবে!

রোমানরা খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আগে প্যাগান (পৌত্তলিক) ধর্মের অনুসারী ছিলেন। প্যাগান ধর্মের লোকজন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে পূর্বপুরুষদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ফেব্রুয়ালিয়া পূজা পালন করতেন। এই ফেব্রুয়ালিয়া অনুষ্ঠানের নামানুসারে পরবর্তীতে ইংরেজি মাসের নামকরণ করা হয় ফেব্রুয়ারি। তখন ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত এই পূজা হতো।পূজার উদ্দেশ্য ছিল দেবতার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে পুণ্যতা, উর্বরতা ও সমৃদ্ধি লাভ করা। অনুষ্ঠানের মাঝের দিনটি ছিল খুবই আকর্ষণীয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি দেবীরাণী জুনোর সম্মানে পবিত্রতার জন্য কুকুর আর উর্বরতার জন্য ছাগল উৎসর্গ করা হতো। উৎসর্গীকৃত কুকুর ও ছাগলের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যুবকেরা চামড়ার তৈরি সামান্য পোশাক পরতো। তারপর চামড়ার বেত দিয়ে দেবীর নামে তরুণীদের শরীরে আঘাত করতো।

সে সময়ের মানুষ বিশ্বাস করতো, এই আঘাতের কারণে দেবী ওই তরুণীদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেবেন। দিনটির আরো একটি বিশেষত্ব হলো, এ দিনেই পরবর্তী এক বছর আনন্দ দেওয়ার জন্য দেবীর ইচ্ছায় লটারির মাধ্যমে তরুণরা তাদের তরুণী সঙ্গীকে বেছে নিতেন। প্রথানুযায়ী বড় একটি বাক্সে তরুণীদের নাম লিখে রাখা হতো। সেখান থেকে তরুণরা একেকটি নাম তুলে পরবর্তী বছর লটারি হওয়া পর্যন্ত নির্বাচিত যুগল একসঙ্গে থাকার সুযোগ পেতেন।

এরই মাঝে ২৬৯ সালে ঘটে যায় একটি বিরল ঘটনা। সে সময় রোমান সম্রাট ছিলেন ক্লাডিউয়াস। খ্রিস্টান ধর্মযাজক, সমাজসেবক ও চিকিৎসক স্টিভ ভ্যালেন্টাইন নামের এক যুবক ধর্ম প্রচারকালে রোমান সম্রাট ক্লাডিউয়াস এর নানা আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে গ্রেপ্তার  হন। এই আদেশের অন্যতম একটি ছিল, রোমান সম্রাট ক্লাডিউয়াস কর্তৃক যুবক সেনাদের বিয়ে করা নিষেধ করে দেওয়া।

স্টিভ ভ্যালেন্টাইন সম্রাটের এই আদেশের বিপরীতে গিয়ে যুবক সেনাদের বিয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন ও গোপনে বিয়ে দিয়ে দিতেন। এছাড়া জনগণকে ধর্মদ্রোহী করা, সম্রাটের বিপক্ষের যুদ্ধাহত খ্রিস্টান সৈন্যদের চিকিৎসা করা এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের জন্য সম্রাটের রোষানলে পড়ে গ্রেপ্তার হন বিদ্রোহী যুবক স্টিভ ভ্যালেন্টাইন।

ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে পাঠানোর পর জনগণের কাছে তিনি আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এই সাহসী এবং জনপ্রিয় যুবককে দেখার জন্য প্রতিদিন অগণিত মানুষ কারাগারে যেতেন। এর মধ্যে এক কারারক্ষীর অন্ধ মেয়ে ‘জুলিয়া’ ও ছিলেন। ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে তিনি প্রায়ই কারাগারে দেখা করতেন এবং দীর্ঘসময় তারা এক সঙ্গে কাটাতেন।

এর মধ্যে ঘটে যায় আশ্চর্যজনক এক ঘটনা। স্টিভ ভ্যালেন্টাইন তার আধ্যাত্মিক চিকিৎসার মাধ্যমে অন্ধ জুলিয়াকে সুস্থ করে তোলেন এবং তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন। এক সময় ভ্যালেন্টাইন ও জুলিয়া একে অন্যের প্রতি গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েন। এই সংবাদ শোনার পর সম্রাট ক্লাডিউয়াস আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ২৭০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, দিনের কোনো এক সময়ে, হাজারো মানুষের সামনে স্টিভ ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। নির্বিকার, সাহসী যুবক স্টিভ ভ্যালেন্টাইন ফাঁসিকাষ্ঠে যাওয়ার আগে, তার ভালোবাসার মানুষ জুলিয়াকে একটি চিঠি লিখে যান। যে চিঠির শেষে লেখা ছিল ‘তোমার ভ্যালেন্টাইনের পক্ষ থেকে’।

এরপর কেটে যায় ২২৬ বছর। এক সময় লিওপারসালিয়া বা ফেব্রুয়ালিয়া পুজার নাম ও পদ্ধতি পরিবর্তন করে নিজ ধর্মের যাজক স্টিভ ভ্যালেন্টাইনের নামে অনুষ্ঠানের নামকরণ করেন তারা। সেই সময় মানে ৪৯৬ সাল থেকেই ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ এর সূচনা। কিন্তু মধ্যযুগে এসে সমস্ত ইউরোপে ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে ইংরেজি সাহিত্যের জনক জিওফ্রে চসার ১৩৮২ সালে তার ‘পার্লামেন্ট অব ফাউলস’ এর মধ্যে ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে লেখেন। এরপর উইলিয়াম শেকসপিয়রসহ অনেক খ্যাতিমান সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্যে এ বিষয়টিকে তুলে আনেন। অবশেষে ১৬৬০ সালে রাজা চার্লস-টু পুনরায় দিবসটি পালনের প্রথা চালু করেন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৪ সালে সৌদি আরবের পুলিশ ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের দায়ে সে দেশে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। আর ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়ায় ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কেবল মুসলিম দেশ নয়, ভারত সরকারও তাদের নিজস্ব সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করায় দিবসটি পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেয়।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers