মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ , ৫ শাওয়াল ১৪৪২

ফিচার
  >
ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাঙালির চেতনার নাম ‘অমর একুশ’

ফারুক হোসেন শিহাব ২০ ফেব্রুয়ারি , ২০২১, ১২:৪৪:১৭

  • ছবি : সংগ্রহ

রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস কাল। চেতনাদীপ্ত এ দিনটি একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও। ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য নির্ভয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দামাল ছেলেদের জীবন বলিদানের দিন। যার মধ্য দিয়ে  বিশ্বের বুকে বাঙালিদের প্রথম ইতিহাস সৃষ্টির সূচনা হয়েছিল এই দিনেই। একুশ বাঙালির ভাষা আন্দোলনের গৌরব আর বেদনা-বিদীর্ণ শোকের দিন হলেও সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করছে বীরত্বের উত্তরসূরিরা।

একুশের প্রথম প্রহরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ সঙ্গীতের বিষাদময় সুর-মূর্ছনায় রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়। ফাল্গুনের বাসন্তী  মধ্যরাতে শহীদ মিনারে নামে জনতার ঢল। বসন্তের মৃদুমন্দ দখিনা হাওয়ায় প্রভাতফেরির ফুলে ফুলে ঢাকা পড়বে শহীদ মিনারের বেদিমূল। ফুলের শ্রদ্ধার্ঘে সিক্ত হতে শহিদ মিনারও এখন প্রস্তুত।

‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ভয় কী বন্ধু আমরা তো আছি’ ভাষাশহীদের এ আত্মত্যাগ দেশপ্রেমের মহিমায় আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার। অমর একুশে শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আর বিপ্লবে অদম্য সাহসিকতা। সেই প্রতিবাদ থেকে, প্রতিরোধ থেকে একাত্তরের জন্ম। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে আত্মোৎসর্গের নজির সৃষ্টি করেছিল বাঙালি। 

মায়ের ভাষা বাংলার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ঢাকার রাজপথে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতসহ বীর সন্তানেরা। এই অমর বীরগাথা আজ কেবল এ ভূখণ্ডের সীমানায় আবদ্ধ নেই, বাঙালির আত্মত্যাগ স্মরণে ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত। এ গৌরব বাঙালির। ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের অহংকার। আমাদের জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপন হয়েছিল ভাষা আন্দোলনে। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে, মহান মুক্তিযুদ্ধে অমর একুশের চেতনা জাতিকে জুগিয়েছিল দুর্জয় সাহস। 

একুশের আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল বায়ান্নে, একাত্তরে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি পায়। ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীরতম আস্থা নয়। একুশের চেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী মনস্কতা। প্রতি বছর আমাদের সেই চেতনাকে শাণিত করতে ২১ ফেব্রুয়ারি আসে। 

আমাদের চেতনার গভীরে স্বরূপ অন্বেষার পাঠ দিয়ে যায় ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। আশির দশকে আইন করে সর্বস্তরে দাফতরিক কাজের পাশাপাশি সাইনবোর্ড, গাড়ির নম্বর ফলক প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলা লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু সে আদেশ ধরে রাখতে পারেনি সরকার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক-বীমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অ্যাপার্টমেন্ট, মার্কেট, হোটেল ও রেস্তোরাঁ সব ইংরেজি নামে চলছে। আমরা আন্তর্জাতিক ভাষা শিখব ঠিকই, কিন্তু নিজের মাতৃভাষার স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে নয়। 

বাংলা হরফে ইংরেজি লেখার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলা ভাষাকে মিশ্রভাষায় রূপান্তরের অপপ্রয়াস থেকে রক্ষা করতে হবে। সবার মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা নয়। আমাদের মাতৃভাষা সংবিধান স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা। ভুল বানান আর ভুল উচ্চারণ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে উদ্ধার এবং মাতৃভাষা চর্চাকে উৎসাহিত করতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ পালন করছে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers