মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ , ৫ শাওয়াল ১৪৪২

ফিচার
  >
ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একাত্তরে নারীরাও ছিল সম্মুখ সমরে

নিউজজি ডেস্ক ২৫ মার্চ , ২০২১, ০৮:৩১:০১

  • ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা : মুক্তিযুদ্ধে নারীকে একদিকে যেমন অসহায় করেছে, তেমনই সাহসী করেছে, যোদ্ধা করেছে। যুদ্ধ করেছেন বহু নারী অথচ সেই তুলনায় বীর প্রতীক খেতাব বা বীরের সম্মান তেমনভাবে দেয়া হয়নি অথচ পুরুষরা পেয়েছেন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বীরের সম্মান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মেয়েরাও অংশ নেন সাহসের সঙ্গে। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন তারা। পৌঁছে দেন যোদ্ধাদের কাছে গোপন খবর। কাজ করেন চিকিৎসক  হিসেবে, সেবিকা হিসেবে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাকিস্তানীদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন অনেক নারী।

কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা, রওশন আরার মতো অনেক নারী সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, পাকিস্তানী হানাদারদের গুলি করে মেরেছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গোবরা ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন অনেক নারী। ভারতে শরণার্থী শিবিরে ডাক্তার, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অসংখ্য নারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের সেবা করেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে অংশ নিয়েছেন অনেক নারী শিল্পী। এরা ছিলেন যুদ্ধের প্রেরণা। 

আবার দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী, শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এদেশের গ্রাম-গঞ্জে, শহরে, বন্দরে অসংখ্য নারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন। যুগিয়েছেন খাদ্য, অস্ত্র বহন করেছেন, লুকিয়ে রেখেছেন, গোপন সংবাদ আনা-নেয়া করেছেন। অথচ এই নারীরা তাদের অবদানের স্বীকৃতি ভালোভাবে পাননি আজও। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর এই নারীদের অনেক গুরুত্তপূর্ণ অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভূমিকা ছিলো দেশকে নতুন করে দাঁড় করানোর জন্য। নারীদের এই বিষয়টিও আজ আলোচনার বাইরে। যুদ্ধকালীন সময়ে আমাদের এই দেশের অনেক নারী হারিয়েছিলেন তার নিজের পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষ সদস্য যেমন বাবা, ভাই, স্বামী, ছেলেকে। পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরোচিত হামলায় কোনো পুরুষ জীবিত না থাকায় আমাদের দেশের অনেক গ্রাম পরিচিতি পেয়েছিলো ‘বিধবার গ্রামে’। এই সময় দেশের অর্থনীতির অনেকাংশের হাল ধরেছিলো এই মহান এবং সাহসী নারীরাই। সংসারের পুরো দায়িত্ব ছিল তাদেরই কাঁধে। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেছেন অনেক নারী। নূরজাহান মুর্শিদ, আতিয়া বাগমারের মতো উচ্চ শিক্ষিত নারীরা প্রবাসে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক তত্পরতা চালিয়েছেন, তহবিল সংগ্রহের কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের একটি পোস্টারের কথা এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই বলা চলে। পোস্টারটিতে লেখা ছিল বাংলার মায়েরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন অস্ত্র হাতে, যারা সেবা করেছেন আহতদের, যারা বন্দী শিবিরে নির্যাতন সয়েছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন তারা সকলেই কি বীর মুক্তিযোদ্ধা নন? 

বাংলার মুক্তিযুদ্ধ ছিল এদেশের জনগণের যুদ্ধ যে জনগণের পঞ্চাশ শতাংশই নারী। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে আড়াই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছে। কিন্তু ওয়্যার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তাদের গবেষণায় বলছে, এ সংখ্যা প্রায় চার লাখ ৬০ হাজার। এমনকি ৯ মাসে যে ৩০ লাখ বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছে, তার ২০ শতাংশই নারী। আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, তখন নারীমাত্রই বোঝাই বীরাঙ্গনাদের কথা। বলি, লাখো লাখো নারীর লাঞ্ছনার বিনিময়ে পেয়েছি স্বাধীন দেশ। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে যোগদান না করেও প্রতি মুহূর্তে আমাদের নারীরা নীরবে রেখে গেছেন অবদান। তারা ঘরে থেকে ভাই-স্বামী-ছেলেদের যুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছেন। 

বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তারা রেখেছেন সাহসী ভূমিকা। কিন্তু তাদের নীরব এই অবদানের কথা, ঘটনা কখনো কারও তেমন জানা হয়নি। টুকরো টুকরো সাহসী জীবনের গল্পগুলো একত্রে আসেনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের সময় চলে গেছে অনেক আগেই। আমরা অনেক দেরী করে ফেলেছি এই সব সাহসী আর মহান নারীদের সম্মানিত করতে। আমাদের প্রিয় লাল সবুজ পতাকার পুরুষের রক্তের পাশাপাশি মিশে আছে নারীর রক্ত, নারীর আত্মত্যাগ। 

সকল নারীদের এই মহান আত্মত্যাগের যথাযথ সম্মান জানাতে হবে। ৭১-এর সকল বীর নারীকে জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন। অভিবাদন জানাই শহীদ সেলিনা পারভীন, শহীদ মেহেরুন্নেসা, শহীদ ভাগীরথীসহ অসংখ্য শহীদ নারীকে, অসংখ্য নির্যাতিত নারীকে, অসংখ্য যোদ্ধা নারীকে। বাংলার মায়েরা মেয়েরা সকলেই বীর, সকলেই মুক্তিযোদ্ধা।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers