রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৩ জিলকদ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ব্যক্তিত্ব

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, একুশের আদি-ইশতেহার

বাহাউদ্দিন গোলাপ ২৩ ফেব্রুয়ারি , ২০২৬, ১৮:১২:০৮

267
  • ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, একুশের আদি-ইশতেহার

করাচির সেই রৌদ্রোজ্জ্বল গণপরিষদ কক্ষের গুমোট নীরবতা ভেঙে যখন একজন দীপ্তকণ্ঠের তেজস্বী বাঙালি আইনজীবী অকম্পিত স্বরে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন কি উপস্থিত কেউ ঘুণাক্ষরেও জানত যে—সেই মুহূর্তটিই ছিল একটি অনাগত মানচিত্রের প্রথম প্রসববেদনা? ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তানের বয়স তখন মোটে ছয় মাস; যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে কয়েক কোটি মানুষের মুখের বুলি কেড়ে নেয়ার এক নির্লজ্জ নীল নকশা চূড়ান্ত হচ্ছিল, ঠিক তখনই ইতিহাসের মহাবীর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন কয়েকশ বৈরী কণ্ঠের বিরুদ্ধে। তিনি কেবল একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেননি, বরং ওই প্রতিকূল পরিবেশে দাঁড়িয়ে অমোঘ সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেন: "What should be the State Language of the State? The State Language of the State should be the Language which is used by the majority of the people of the State." (রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিত? রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা সেটিই হওয়া উচিত, যা রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ব্যবহার করে।)

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান যখন ধূর্ততার সাথে ইংরেজিতে সেই কুখ্যাত হুঙ্কার ছাড়লেন—"Urdu and Urdu alone shall be the State Language of Pakistan." ( উর্দূ এবং কেবল উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা)—তখন তথাকথিত অনেক বাঙালি নেতা ক্ষমতার মায়ায় মেরুদণ্ডহীনভাবে মৌনব্রত পালন করেছিলেন। অথচ এই অকুতোভয় বাতিঘর তখন গণপরিষদের প্রতিটি কোণে প্রতিবাদের ঝংকার তুলেছিলেন। তাঁর সেই কণ্ঠস্বর কেবল একজন মানুষের ছিল না, তা ছিল শোষিত কোটি বাঙালির অবদমিত আত্মার গর্জন। ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইল গ্রামে জগবন্ধু দত্তের ঘরে জন্ম নেওয়া এই মহান বিপ্লবী জীবন শুরু করেছিলেন শিক্ষকতার ব্রত দিয়ে। পরবর্তীতে আইন পেশায় যোগ দিলেও তাঁর প্রকৃত সাধনা ছিল দেশ ও মানুষের কল্যাণ।

১৯৩৭ সালের বঙ্গীয় আইনসভায় যাঁর সংসদীয় পথচলা শুরু, তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও ছিলেন এক আপসহীন সেনানি। ১৯৪০-এর দশকে যখন ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের উন্মাদনা তুঙ্গে, তখন তিনি দাঁড়িয়েছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অটল স্তম্ভ হয়ে। ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের অপরাধে তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হয়। এরপর ১৯৪৬-এর ভয়াবহ দাঙ্গার সময় তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, রুখে দিয়েছিলেন ভ্রাতৃঘাতী রক্তপাত। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর যখন অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিলেন, ধীরেনবাবু তখন তাঁর প্রিয় মাটি ও শেকড়কে ছেড়ে যেতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন।

৫২-র সেই উত্তাল আন্দোলনের ফসল হিসেবেই ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন অভূতপূর্ব বিজয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও তাঁর প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও সততা কিংবদন্তি হয়ে আছে। এরপর ১৯৬০-এর দশকের সাম্প্রদায়িক উত্তাল সময়ে দাঙ্গা রুখতে জীবন বাজি রেখে তিনি যে মানবিকতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। ১৯৬৫-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি জান্তা যখন হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও ভাষার প্রশ্নে তাঁর আপসহীন অবস্থানের আক্রোশে তাঁকে ‘রাষ্ট্রশত্রু’ তকমা দিয়ে দীর্ঘকাল গৃহবন্দি করে রেখেছিল, তখন আসলে তারা একজন মানুষের চেয়ে তাঁর অদম্য বাঙালি জাতীয়তাবাদকেই বেশি ভয় পেয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চের সেই কাল রাতটি ছিল সভ্যতার ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। মধ্যরাতে হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়া পাকিস্তানি ঘাতক দল ৮৫ বছরের এই মহাপ্রাণ মানুষটিকে এবং তাঁর পুত্র দিলীপ কুমার দত্তকে নির্মমভাবে টেনে-হিঁচড়ে তুলে নিয়ে যায় ময়নামতী সেনানিবাসে। সেখানে যে পাশবিকতা চালানো হয়েছিল, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের প্রত্যক্ষদর্শী রমণীমোহন শীল বলেছিলেন—যে অমানবিক নির্যাতন ধীরেনবাবুর ওপর হয়েছে, তা দেখে কোনো বিবেকবান মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না। পৈশাচিক উল্লাসে এই ঋষিপ্রতিম বৃদ্ধের হাতের এবং পায়ের প্রতিটি নখ প্লাস দিয়ে টেনে উপড়ে ফেলা হয়েছিল। রাইফেলের বাঁট দিয়ে তাঁর হাঁটু ও কনুইয়ের হাড় পিটিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হয়েছিল যাতে তিনি আর কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারেন। পাঁজরের হাড়ের ভেতর বারবার বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছিল ধারালো বেয়নেট, ভারী বুটের আঘাতে থেঁতলে কোটরচ্যুত করা হয়েছিল তাঁর চোখ। পিপাসায় কাতর এই মহান সেনানিকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে বরফের মতো শীতল মেঝেতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছিল। এত অকল্পনীয় যন্ত্রণার মাঝেও পাকিস্তানি অফিসাররা তাঁর মুখ থেকে একটিবারের জন্যও ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলিয়ে নিতে পারেনি। অবশেষে পৈশাচিক নির্যাতনে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া সেই মহান নেতার দেহটি সেনানিবাসের কোনো এক বেনামি গণকবরে আবর্জনার মতো ফেলে দেয়া হয়েছিল।

​আজ আমাদের স্বাধীনতার সূর্য মধ্যগগনে, কিন্তু এক চরম কৃতজ্ঞতাহীনতার কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে তাঁর স্মৃতি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইল গ্রামে তাঁর পৈতৃক ভিটে আজ ধ্বংসস্তূপের নিচে ধুঁকছে। ৫২-র রক্তদান যদি হয় বাংলা ভাষার বিশাল মহীরুহ, তবে ১৯৪৮-এর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন সেই মহীরুহের অবিনাশী বীজ। ইতিহাস তাঁকে একটি বেনামি গণকবর দিলেও, একটি স্বাধীন মানচিত্র তাঁর কাছে চিরঋণী। আজ আমাদের সকলের শপথ হোক—বিস্মৃতির অতল থেকে এই মহান বাতিঘরকে উদ্ধার করা এবং তাঁর স্মৃতিধন্য বসতভিটাকে জাতীয় ঐতিহ্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা। কারণ, যে জাতি তার শেকড়কে সম্মান দিতে জানে না, তাদের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন কেবলই মরীচিকা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মনে রাখা মানেই হলো নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।  

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers