বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৮ সফর ১৪৪৮

ফিচার
  >
পাঠক বিভাগ

আমার এখন ১১ দেশের বন্ধু আছে

নানজীবা খান ৭ মার্চ , ২০১৭, ১৯:৩০:০০

18K
  • আমার এখন ১১ দেশের বন্ধু আছে

ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর ভারত আয়োজিত ১৭ দিনের ইউথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে বাংলাদেশসহ মোট ১১টি দেশ অংশ নেয়। সেখানে ছিল ভারত, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, কাজাখস্তান, কিরগিস্তান, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, রাশিয়া। সব দেশের সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। তাদের কাছ থেকে জেনেছি তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে। 

এছাড়াও এনসিসি ইন্ডিয়া থেকে আমাদের আগরার তাজমহল, জয়পুর, ফাতেহাবাদ, জাতীয় জাদুঘর, কুতুবমিনার, হুমায়ুন টম্ব, রাজস্থানের মরুভুমি, ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গা দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সাক্ষাৎ হয় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রক্ষামন্ত্রী মনহর পাররিকার সঙ্গে। এ সময় রক্ষামন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নেয়ারও সুযোগ হয় আমার।

ভারত

গোটা ভারতে ১৩ লাখেরও বেশি ক্যাডেট আছে। তারা অনেকটাই আমাদের বাঙালিদের মতো বেশ মিশুক। কথাও আমাদের মতোই বেশি বলে। তবে খাবারে পনির আর পাঁচ ফোরন তুলনামূলক বেশি দেয়। আচার খেতে পছন্দ করে। কিন্তু মনে হয় সেখানে পানির থেকে ফলের জুসের দাম কম। কারণ আমাদের বাসে কিংবা ঘুরতে যাওয়ার সময় পানির বোতলের জায়গায় জুস বেশি দিয়েছে। টানা ১৭ দিন এক ‘ফ্রুটি’ কোম্পানির জুসই দিয়েছে।

মালদ্বীপ

সেখানে শতভাগ মুসলিম। তারা সবার সাথেই মিশে কিন্তু দূরত্ব বজায় রেখে। ৪ ক্যাডেট এসেছিল সেখান থেকে। তারাও হিন্দি পারে কিন্তু তুলনামূলক কম। ওদের নাম শুনে মনে করেছিলাম বাঙালি। সারা, নেহা, মোহাম্মদ। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো ওরাতো মুসলিম। তাই নামগুলো আমাদের কাছে চেনা। 

শ্রীলঙ্কা

রাবনের দেশ থেকে এসেছিল ১২ জন ক্যাডেট। তাদের দেশে অনেক গরম। হাতে গোনা কয়েকজন শ্যামবর্ণ, এছাড়া সবাই কালো। কিন্তু ওদের মন অনেক ভালো। তাদের দেশের অনেক রকম দেখতে সুসাদু এমন খাবার আমাদের খেতে দিলেও আমরা বেশি খেতে পারিনি। প্রত্যেক খারাবের ভেতরেই নারকেল। কি আর বলব। খাবারের কথা জানতে চাইলেই নারকেলের গুনগান শুরু করে দেয়।

ভুটান

১২ জন এসেছিল ভুটান থেকে। দেশটিতে এনসিসি নেই। ওরা স্কাউট থেকে এসেছিল। কেউই তেমন লম্বা নয়। ইংরেজি তুলনামূলক কম পারে। খুব ধীরে নাচ করে কিন্তু বেশি নাচতে পছন্দ করে। ওদের ওই নাচ দেখলে আমার খুব ঘুম আসে।

কিরগিস্তান

কিরগিস্তান থেকে ২ জন এসেছিল। একজনের সাথে আমার যাওয়ার আগের কথা হয়েছে। আমাদের দেখলেই সরে যেত। আরেকজন সারাদিন একা একা কফি খেত। মনে হয়েছিল যেন ভিন্ন গ্রহে কেউ তাদের জোর করে এনে ফেলে রেখেছে। পরে বুঝলাম ওরা আমাদের ভাষা বোঝে না দেখে দূরে দূরে থাকত। দেখতে সাদা কিন্তু চোখ মাঝারি। চোখের মণি কালো। 

কাজাখস্তান

দেশটি থেকে ১২ জন এসেছিল। মুসলিম প্রধান দেশ। কথা বলতে চায় কিন্তু পারে না। কারণ ইংরেজি কম বুঝে এবং বলতেও পারে না। সবাই সাদা। তবে তাদের পোশাক এবং চালচলন দেখে বোঝা কঠিন যে তারা মুসলিম। সব কিছুই রাশিয়ানদের মতো। একবার কথা শুরু করলে বুঝে আর না বুঝে বলতেই থাকে। এক্সপ্রেশন দেখে কথা বলে। তবে মিশুক বলা যায়।

সিঙ্গাপুর

এরা কথা কম কিন্তু কাজে বিশ্বাসী। মাত্র ১ জন মেয়েসহ ১২ জন ক্যাডেট এসেছিল। আমার রুমেই ছিল মেয়েটি। কথা এত কম বলে যে মানুষ বাঁচতে পারে সেটা ওদের কাছ থেকে শেখা উচিত। তাদের নিয়ম বাসে, খাওয়ার টেবিল ও ক্লাসরুমে কথা না বলা। কিন্তু কাজে তারা খুবই পরিপাটি। সময়ের কাজ ঠিক সময়ে করে। তবে আমার রুমে যেহেতু ছিল তাও আবার আমার দোতলা বিছানার উপরে, কথা না বলে যাবে কই! বেচারা আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এই ভয়েই মনে হয় রুমেই আসত না।

তার চুপ করে থাকা আমার সহ্যই হতো না। ওর নাম রিটো। সে রুমে ঢুকতে দেরি কিন্তু আমার কথা শুরু করতে এক সেকেন্ডও দেরি হতো না। যাওয়ার আগে সে আমার শাড়ি পরতে চেয়েছিল। পরার পরে মহা খুশি। তার ছবি তোলার ধরন দেখে মনে হচ্ছিল তার মেমরি কার্ড সেদিন ছবি দিয়ে না ভরলে মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। তবে যাওয়ার আগে আমাকে সুন্দর গিফট দিতে ভুলে যায়নি। আমিও দিয়েছি। 

ভিয়েতনাম

আমার মতে বন্ধুসুলভ আচরের উদাহরণ দিয়ে চাও তাহলে ভিয়েতনামের নাম উল্লেখ করো। তারা অনেক বেশি বন্ধুপরায়ণ। এমন কোনো দেশ নেই যাদের সাথে তাদের সখ্যতা ছিল না। সবচেয়ে বেশি ছিল আমাদের সাথে। নিজেদের রুম রেখে সারাক্ষণ আমাদের রুমেই থাকত। মজা করে কথা বলতে অনেক পছন্দ করে। আর গিফট দেয়ার কথা তো বললামই না। আমি সব দেশ থেকেই গিফট পেয়েছি। যতটা গিফট দিয়েছি তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি। ভিয়েতনাম থেকে বেশি উপহার পেয়েছি। তারা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী না। তারা বলে, ‘উই লিসেন টু আওয়ার সোউল।’ ১২ জন এসেছিল। তাদেরও এনসিসি নেই। তারা ইউথ ফোরাম থেকে এসেছিল।

রাশিয়া

সব থেকে বেশি ক্যাডেট এসেছিল রাশিয়া থেকে। ওদের এনসিসি নেই। ওরা এসেছিল মিলিটারি প্রতিষ্ঠান থেকে। মানুষ এতো সুন্দর কীভাবে হয়! এসেছিল ২৫ জন ক্যাডেট। আমরা কাকে রেখে কাকে দেখবো  সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। মেয়েগুলো দেখতে একদম পরীর মতো। আর ছেলেদের দেখে মনে হয় পুতুল। এমনিতেই কাগজের মতো ফর্সা তার ওপরে পড়েছে সাদা পোশাক। একেকজনের চোখ একেকরকম। কারও চোখ দেখে মনে হবে ভূতের সিনেমার নায়ক-নায়িকা। তবে তাদের রয়েছে নজরকাড়া চেহারা। মনে হয় যেন সব কিছু বাদ দিয়ে ওদের দিকেই সারাদিন তাকিয়ে থাকি। কিন্তু ওরা বেশ গম্ভীর স্বভাবের। আমাদের দিকে তাকায়ই না। চোখে চোখ পড়লে এমন একটা ভাব দেখাবে তখন মনে তবে যে আমাকে দেখে ও রাগ করেছে। 

ওরা একদমই হাসে না। তাতে কি! যত যাই হোক। আমার রাশিয়াই পছন্দ। আমি ওদের সাথে কথা বলেই ছাড়বো। তখন মনে হলো, আরে আমিতো হ্যালোর সাংবাদিক। কথা বলারতো অনেক সুযোগ আমার আছে। গিয়েই পরিচয় দিয়ে শুরু করলাম কথা। আমি সাংবাদিক শুনে ওদের চেহারাই বদলে গেলো। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

পরে বুঝলাম ওদের কথা না বলার রহস্য। ২৫ জনের মধ্য মাত্র ১ জন ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। তাও ভালো যে সে ছেলে। সবার আগে আমি তার সাক্ষাৎকার নিলাম। তার নাম পিটার ইউযহাকভ। চোখগুলো সবুজ। অনেক ফর্সা। এরপর থেকে যেন আমার সব ধারণাই বদলে গেল। সবাই আমার কাছে আসে গল্প করতে। পিটার সব কথা ট্রান্সলেট করে দিত। মনে হচ্ছিল গোটা রাশিয়া আমার কত্ত আপন! আমাকে আর ধরে রাখে কে। যত উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম, পারলেতো সব কিছুই আমি রাশিয়াদের দেই।

কিন্তু যেটা বুঝলাম ওদের ইগো সমস্যা অনেক বেশি। ওদের কথা হলো তুমি আগে আমার সাথে কথা বলতে আস বন্ধু তোমাকে আমি নিজেই বানাবো, তবে তুমি যতই ভালো হও না কেন আমি নিজে থেকে তোমার সাথে মিশতে যাবো না। এই কথার প্রমাণ হলো আমার একজন বাঙালি বান্ধবী রাশিয়ার কাছে গিয়ে কখনও কথা বলেনি। আমি লক্ষ করলাম ১৭ দিনের একদিনও ২৫ জনের ১ জনও ওর দিকে তাকায়নি। তবে তারা যাদের সাথে মিশে তাদের সাথে অনেক বেশি বন্ধুসুলভ আচরণ করে।

কিন্তু তাদের সংস্কিরি আমাদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। যেমন স্কুলপড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা যেন জোড়া ছাড়া হাটতেই পারে না। সাবধান অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলেও একজন আরকজনের হাত ধরে থাকে। তাদের এই আচরণ দেখে আমরা যখন লজ্জায় চোখ ফিয়িরে নিতাম তখন আমাদের দেখেই ওরা উল্টা হাসা শুরু করত। 

তবে একটা কথা সত্য। সেটা হলো ছেলে যেই দেশেরই হোক না কেন! বাংলাদেশ কিংবা রাশিয়া, বরাবরের মতোই তারা দুষ্টু প্রকৃতির। আমাদের দেশের ছেলেরা তো রাশিয়ার মেয়ে পেয়ে ভুলেই গিয়েছিল যে সেখানে তাদের দেশেরও মেয়েরা আছে। তাদের বলা হয়েছিল মেয়েদেরকে দেখেশুনে রাখতে যেন আমাদের কোনো সমস্যা না হয়। কে শুনে কার কথা! উল্টা মেয়েদেরই ছেলেদের দেখেশুনে রাখতে হয়েছে।

আর যদি বলি রাশিয়ান ছেলেদের কথা। তারা আমাদের সাথে কথা শুরুই করত ‘আই লাভ ইউ’ দিয়ে। আমরাও কি কম দুষ্টু নাকি! আমাদের ভাষায় তাদের শিখিয়ে দিয়েছি ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। নিজেরা শিখিয়ে নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে এনেছি। সারাক্ষণ শুধু ওই একটা লাইনই বলে। বাঙালি মেয়ে দেখলেই হলো, বলা শুরু করে ‘আমি তোমাকে ভালবাসি।’

নেপাল

ইংরেজির থেকে ওদের সাথে হিন্দিতে কথা বেশি বলা হয়েছে। এর কারণ কয়েকদিন পরে জানতে পারলাম। ওদের দেশেও আমাদের মতো ভারতীয় চ্যানেল চলে। তারা আমাদের মতোই দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে হিন্দি সিরিয়ালে চোখ রেখে। কিন্তু ওরা সবাই বেশ রোমাঞ্চকর। প্রত্যেকের চেহারার ভেতরেই কেমন জানি প্রেমিক-প্রেমিকার ভাব আছে। ওদের দেশ থেকে ১০ জন ক্যাডেট এসেছিল।

বাংলাদেশ

আসলে দেশের বাইরে না গেলে বোঝা যায় না যে আমাদের সংস্কৃতি কত সুন্দর। রাশিয়ার কথাই যদি বলি। তাদের ভালবাসাজনিত আবেগ থাকলেও অন্যদিকে আবেগ একদমই নাই। কারও সাথে ঝগড়া হলে তাকে যে মানাতে হয় সেটা হয়তোবা তারা জানে না। একদিন দেখলাম রাশিয়ান একটা মেয়ে কাঁদছে। তার একটু দূরেই অনেকজন রাশিয়ান নিজেদের মধ্যে হাসতেছে। আরেকদিন দেখলাম একজন রাশিয়ান ছেলে মন খারাপ করে একা বসে খাচ্ছে। কিন্তু তাকে যে সান্ত্বনা দিয়ে নিজেদের মধ্যে নিয়ে তার মন ভালো করবে সেটা তাদের খেয়ালই নেই। বরং তাদের মন খারাপ দেখে আমাদের কষ্ট লাগছিল। আমরা তাকে আমাদের সাথে বসিয়ে খাবার খেলাম, কথা বললাম, তার মন ভালো করার চেষ্টা করতাম। আমরা কখনও কল্পনাই করতে পারি না যে একজন বন্ধু সাথে থাকা অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে নিজেরা ভালো থাকা যায়। 

আরেকদিন কাজাগিস্তানের একজন অফিসারের ক্যামেরার চার্জার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সে খুব অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে ভাবছিল কি করা যায়। আর এদিকে তার এ সমস্যার কথা শোনামাত্রই আমরা বাঙালিরা অস্থির হয়ে সবার কাছে জিজ্ঞাসা করছিলাম। তাকে কীভাবে সাহায্য করা যায়। সেটার জন্য আমরা সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। অবশেষে ভিয়েতনামের একজনের চার্জার আমরা তাকে দেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। 

আরেকদিন এক ভিয়েতনামের অফিসার রাস্তা ভুলে হারিয়ে গিয়েছিল। আমাদের বাংলাদেশের অফিসার ইন্ডিয়ান অফিসারের থেকেও বেশি চিন্তা এবং তাকে খুঁজে বের করার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যস্ত হয়েছিল।

আসলে আমরা হয়তোবা তাদের মতো এত উন্নত এখনও হয়নি কিন্তু এটা মানতেই হবে যে বাঙালি সাহায্য করার মানসিকতা, ভদ্রতা, আবেগ-ভালোবাসা এবং বন্ধুপরায়ণ আচরণের দিক থেকে তাদের থেকে অনেক ওপরে। সেখানে গিয়ে আমার মনে হয়েছে আমি গর্বিত যে আমি একজন বাঙালি। কারণ আমি সবসময় আমার সাহায্যের জন্য পাশে অন্য একজন বাঙালিকে পাই যা সব দেশ না হলেও অনেক দেশের মানুষই পায় না, আমি কষ্ট পেলে আমার বান্ধবীরা কাঁদে যা আমি ইউরোপের মানুষের মধ্যে দেখি না।

নানজীবা খান (১৫), ঢাকা।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers