বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ , ১ মুহররম ১৪৪৮

ফিচার
  >
পাঠক বিভাগ

স্বপ্নবাজ তরুণদের হাত ধরে পথচলা ‘নারী শক্তি উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’

নেহা রায় ২৮ অক্টোবর , ২০২৫, ১৩:৫৯:১৩

520
  • স্বপ্নবাজ তরুণদের হাত ধরে পথচলা ‘নারী শক্তি উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’

‘মা, তুমি কি কোনোদিন টাকা কামাই করবা না?’

মেয়েটার সরল প্রশ্নে থমকে যান ময়মনসিংহের চরাঞ্চলের হালিমা বেগম। স্বামীর মৃত্যুর পর দিন আনে দিন খায় পরিবার। একদিন স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে ‘নারী শক্তি উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’-এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে সেলাই শেখা শুরু করেন তিনি। এখন নিজ হাতে পোশাক তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। হাসিমুখে বলেন, “আগে ভাবতাম মেয়ে মানুষ হই, কিছুই পারব না। এখন বুঝছি, ইচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব।”

হালিমার মতো আরও শত শত নারী নিজেদের ভাগ্য বদলের গল্প লিখছেন প্রতিদিন।

২০২০ সালের ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যাত্রা শুরু করে ‘নারী শক্তি উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’। তরুণ সমাজকর্মীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি কাজ করছে গ্রামের নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে।

‘নিজ হাতে গড়া জীবন — হাসিনা বেগমের গল্প

পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করেন হাসিনা বেগম। আগে কৃষক স্বামীর আয়ে কোনোমতে সংসার চলত। সংগঠনের সহায়তায় এখন তিনি ছোট একটি হাঁসমুরগির খামার চালান।

তিনি বলেন,

“প্রথমে ভয় লাগত। ভাবতাম লোকজন হাসবে। কিন্তু প্রশিক্ষণ পেয়ে বুঝলাম, নিজের হাতে উপার্জন করলে সম্মানও বাড়ে, আত্মবিশ্বাসও।”

সংগঠনের লক্ষ্য ও কার্যক্রম

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া নওরীন, বলেন —

“আমরা চাই, প্রতিটি গ্রামের নারী যেন নিজের অবস্থান থেকে কিছু করতে পারে। শুধু অর্থ উপার্জন নয়, আত্মসম্মানবোধ গড়ে তোলা আমাদের মূল লক্ষ্য।”

বর্তমানে সংগঠনটি দেশের ১২টি জেলায় কাজ করছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া, বরিশাল, দিনাজপুর, নওগাঁ, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহে রয়েছে তাদের স্থায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

নারীদের সেলাই, হস্তশিল্প, হাঁসমুরগি পালন, অনলাইন বিক্রয়, ও প্রাথমিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

স্বপ্নবাজ তরুণদের অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী রাকিবুল ইসলাম বলেন,“আমরা শুধু প্রশিক্ষণই দিই না, প্রশিক্ষণের পর তাদের পণ্য বিক্রির পথও তৈরি করে দিই। স্থানীয় বাজার ও অনলাইন পেজে তাদের তৈরি সামগ্রী বিক্রি হয়। এখন তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছে — এটা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

রাজশাহী ক্যাম্পাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী ফারহানা হক যোগ করেন, “আমরা যখন প্রথম গ্রামে যাই, নারীরা মুখ খুলত না। এখন তারা নিজেরাই নেতৃত্ব দেয়, গ্রামের মেয়েদের সংগঠিত করে। এটা সত্যিকারের পরিবর্তন।”

সমাজে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

নারী শক্তি উন্নয়ন ফাউন্ডেশন শুধু প্রশিক্ষণেই থেমে নেই। সংগঠনটি নিয়মিত ‘নারী উদ্যোক্তা মেলা’, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, ও নারী স্বাস্থ্য সচেতনতা সেমিনার আয়োজন করে।

ভবিষ্যতে তারা গ্রামীণ নারীদের জন্য একটি ‘নারী ব্যাংক’ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারেন স্বনির্ভর নারী উদ্যোক্তারা।

শেষকথা

‘চলো বন্ধু বদলে যাই, স্বপ্ন দেখুক প্রতিটি নারী’— এই স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নারী শক্তি উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। তাদের লক্ষ্য একটাই— নারীর সম্মান ও আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করা।

যে সমাজে প্রতিটি নারী নিজের উপার্জনে হাসতে পারে, সেখানেই ফুটবে সত্যিকারের মানবতার ফুল।

লেখক: গণমাধ্যম ও অধ্যায়ন বিভাগ শিক্ষার্থী, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers