রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৪ সফর ১৪৪৮

ফিচার
  >
পাঠক বিভাগ

রাণীশংকৈলে প্রতিদিন বসে শ্রম বিক্রির মানুষ হাট

হুমায়ুন কবির, ঠাকুরগাঁও। ১৩ মে , ২০২৬, ১৫:৫৫:০৫

317
  • রাণীশংকৈলে প্রতিদিন বসে শ্রম বিক্রির মানুষ হাট

ঠাকুরগাঁও: ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। কুয়াশাভেজা পথ ধরে কেউ কাঁধে কোদাল, কেউ হাতে কাস্তে, আবার কেউ শাবল কিংবা ডালি নিয়ে ছুটে আসছেন শহরের মোড়ে মোড়ে। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার আমজুয়ান ইউনিয়ন পরিষদ মার্কেট, মাদ্রাসা মোড় ও বন্দর চৌরাস্তা এলাকায় প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই বসে যায় এক ব্যতিক্রমী হাট। এখানে বিক্রি হয় না কোনো ধান, চাল কিংবা গবাদিপশু—এখানে বিক্রি হয় মানুষের শ্রম, ঘামের মূল্য আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত “মানুষ হাট” কিংবা “শ্রম বিক্রির হাট” নামে। উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশ প্রতিদিন কাজের আশায় এখানে এসে জড়ো হন। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন তারা। কারও চোখে ক্ষীণ আশার আলো, কারও চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ। অপেক্ষা শুধু একজন কাজদাতার—যিনি এসে বলবেন, “চলেন, আজ কাজ আছে।”

এই হাটে আসা মানুষের হাতে থাকে তাদের জীবিকার অস্ত্র—কাস্তে, কোদাল, শাবল, হাতুড়ি কিংবা বাঁশের ডালি। কেউ রাজমিস্ত্রির সহকারী, কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিশ্রমিক। প্রতিদিন কাজ মিললে সন্ধ্যায় ঘরে হাঁড়ি চড়ে, আর কাজ না মিললে পুরো পরিবার ডুবে যায় নীরব হতাশায়। বুধবার (১৩ মে) সকালে বন্দর চৌরাস্তায় কথা হয় রাজমিস্ত্রি আব্দুর রশিদের সঙ্গে। মাথায় পুরনো গামছা, হাতে কাজের যন্ত্রপাতি। তিনি বলেন,“অভাবের তাড়নায় মানুষ প্রতিদিন এখানে আসে। মালিকপক্ষ এখান থেকেই মিস্ত্রি বা শ্রমিক নিয়ে যায়। এতে উভয়েরই সুবিধা হয়। শ্রমিককে দূরে গিয়ে কাজ খুঁজতে হয় না, আবার মালিকও সহজে শ্রমিক পেয়ে যায়।”এদিকে পৌর শহরের আবাদ তাকিয়া মাদ্রাসা মোড়ে কৃষিশ্রমিকদের ভিড় আরও বেশি। কারণ এখন ইরি ধান কাটা ও ভুট্টা ভাঙানোর মৌসুম চলছে। মাঠে কাজের চাপ বাড়লেও শ্রমিকের সংখ্যার তুলনায় কাজ এখনও অপ্রতুল।সুন্দরপুর গ্রামের আব্দুল জলিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,

“ভোরে বের হই, সারা দিন বসে থাকি। কেউ ডাকলে কাজ পাই, না হলে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়। তখন সংসারের মানুষের মুখের দিকে তাকানো কঠিন হয়ে যায়।”বাচোর ইউনিয়নের সামশুল হক ও বাসিয়া রায় জানান, তারা প্রতিদিন এখানে বসে থাকেন শুধুমাত্র কাজের আশায়। কেউ দিনচুক্তিতে, কেউ নির্দিষ্ট কাজের চুক্তিতে নিজেদের শ্রম বিক্রি করেন। কাজ না পেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে হতাশ মনেই বাড়ি ফিরে যেতে হয়।গুয়াগাঁও গ্রামের ভন্দু রায়ের কণ্ঠে ছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতার ভার। তিনি বলেন, “দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পাই, সেটাও নিয়মিত না। এখন কাজের চেয়ে মানুষ বেশি। অনেক সময় মনে হয় আমরা যেন হাটে বসে থাকা কোনো পণ্য।”অভাব আর অনিশ্চয়তার এই জীবন থেকে মুক্তির আশায় উত্তরাঞ্চলের বহু মানুষ ঘর ছাড়ছেন। কেউ যাচ্ছেন বগুড়া, কেউ কুমিল্লা, ফেনী, সিলেট কিংবা রাজধানী ঢাকায়। পরিবার-পরিজন রেখে দূর শহরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করাই হয়ে উঠেছে তাদের জীবনের বাস্তবতা।

ঢাকায় কর্মরত এক শ্রমিকের স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন, “এলাকায় কাজ নেই বলেই ওদের বাইরে যেতে হয়। না গেলে সংসার চালানো কঠিন। ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সহ্য করতে হয়।”

স্থানীয়দের মতে, উত্তরাঞ্চলে পর্যাপ্ত শিল্প-কারখানা ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। ফলে প্রতিদিন ভোরে শত শত মানুষ জীবিকার আশায় রাস্তায় বসে থাকেন, যেন তারা অপেক্ষমাণ কোনো নীরব মিছিল।এ বিষয়ে রাণীশংকৈল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আল্লামা ওয়াদুদ বিন নূর আলিফ বলেন, “উত্তরবঙ্গে শিল্পকারখানা ও স্থায়ী কর্মসংস্থান না থাকায় বহু পরিবার শুধু শ্রম বিক্রি করেই জীবন চালায়। অনেকে আবার কাজের সন্ধানে অন্য জেলায় চলে যেতে বাধ্য হন। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো না গেলে এই বাস্তবতার পরিবর্তন হবে না।”

রাণীশংকৈলের এই মানুষ হাট যেন বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রতিদিন সূর্য ওঠে নতুন আশার বার্তা নিয়ে, আর সূর্য ডুবে যায় অপূর্ণতা, ক্লান্তি আর না বলা অসংখ্য দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers