শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২ সফর ১৪৪৮

ফিচার
  >
বিশেষ দিবস

বিশ্ব মা দিবস আজ: ত্যাগ আর মমতার নাম ‘মা’

নিউজজি ডেস্ক ১০ মে , ২০২৬, ১০:৫৬:৩৮

422
  • সংগৃহীত

ঢাকা: ‘মা’ মাত্র একটি শব্দ, কিন্তু এর অনুভব বিশাল ও গভীর। সন্তানের জন্মের আগে থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যিনি নিঃস্বার্থ স্নেহ আর মমতায় পাশে থাকেন, তিনিই মা। সন্তানের সুখে যার মুখে হাসি ফোটে, আর কষ্টে যার হৃদয় ভেঙে যায়— সেই মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান জানাতেই পালিত হয় ‘মা দিবস’।

প্রতি বছর ১০ মে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি উদযাপন করা হলেও, সত্যিকারে মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো একটি দিনে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য প্রতিটি দিনই বিশেষ হতে পারে।

মা কেবল একটি সম্পর্কের নাম নয়; তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পৃথিবীতে আসার পর শিশুর প্রথম পরিচয় ঘটে মায়ের সঙ্গেই। কথা বলা, হাঁটতে শেখা কিংবা ভালো-মন্দ বুঝতে শেখা— সবকিছুর শুরু হয় মায়ের হাত ধরে। তাই একজন সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পেছনে মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হয়।

বর্তমান সময়ের ব্যস্ত জীবনে মানুষ যখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, তখন পরিবারে আবেগ ও সম্পর্কের জায়গাগুলো অনেকটাই সংকুচিত হচ্ছে। অনেক সন্তান কর্মব্যস্ততার কারণে মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে না। কেউ বিদেশে, কেউ শহরের দূরত্বে, আবার কেউ একই ছাদের নিচে থেকেও মায়ের খোঁজ নিতে ভুলে যায়। অথচ মা এমন একজন মানুষ, যিনি সন্তানের একটি ফোন কল বা ছোট্ট খোঁজেই আনন্দে ভরে ওঠেন। মা দিবস আমাদের সেই দায়িত্ব ও অনুভূতির কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

মা দিবসের ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক মা দিবসের সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। আনা জার্ভিস নামের এক নারী তার মায়ের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে ১৯০৮ সালে প্রথম মা দিবস উদযাপন করেন। পরে ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালিত হতে শুরু করে। বাংলাদেশেও দিনটি এখন বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপিত হয়।

তবে মা দিবস শুধু ফুল, উপহার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত সম্মান হলো মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া এবং তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা। একজন মা সারাজীবন পরিবারের জন্য নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা ও আরাম বিসর্জন দেন। অনেক মা নিজের সুখের কথা না ভেবে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে নিরলস সংগ্রাম করেন। তাই মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, আচরণেও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোয় মায়ের অবদান অপরিসীম। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই মায়েরা পরিবারকে ভালোবাসা ও ত্যাগ দিয়ে আগলে রাখেন। সংসারের অসংখ্য দায়িত্ব সামলেও সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিরলস চেষ্টা করেন তারা। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়েরা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের স্বপ্ন পূরণে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যান। অনেক সময় নিজের চাহিদা ত্যাগ করে সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন। মায়েদের এই আত্মত্যাগ সত্যিই অতুলনীয়।

বর্তমান সময়ে সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়তে থাকা উদ্বেগজনক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে মায়েরা একসময় সন্তানকে স্নেহ-মমতায় বড় করে তুলেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের অনেকেই অবহেলা ও একাকীত্বের শিকার হচ্ছেন। এটি শুধু পারিবারিক সংকট নয়, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরও

প্রতিচ্ছবি। মা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মায়ের প্রতি দায়িত্ব শুধু ভরণপোষণেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের প্রয়োজন সন্তানের ভালোবাসা, সময় ও যথাযথ সম্মান।

একজন মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ। সন্তানের ভুল, ব্যর্থতা কিংবা দুর্বলতার মাঝেও মা তাকে আগলে রাখেন। পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও মায়ের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। তাই সাহিত্য, সংগীত, কবিতা ও চলচ্চিত্রে যুগে যুগে মায়ের ভালোবাসা বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু সাহিত্যিক তাদের লেখায় মায়ের অসীম মমতার কথা তুলে ধরেছেন।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলামে মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’ এই একটি বাক্যই মায়ের মর্যাদা কতটা মহান, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। শুধু ইসলাম নয়, প্রায় সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

বর্তমান প্রজন্মের উচিত মায়ের প্রতি আরও আন্তরিক ও যত্নশীল হওয়া। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও প্রতিদিন কিছুটা সময় মায়ের সঙ্গে কাটানো, তার খোঁজ নেওয়া কিংবা ছোটখাটো কাজে পাশে দাঁড়ানো মা-সন্তানের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। কারণ জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব হলেও, মায়ের ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই।

মা দিবস শুধু উদযাপনের উপলক্ষ নয়, এটি নিজের দায়িত্ব ও আচরণ নিয়ে ভাবারও একটি সুযোগ। আমরা কি সত্যিই মায়ের প্রতি আমাদের কর্তব্য ঠিকভাবে পালন করছি? তার ত্যাগ ও ভালোবাসার মূল্য কতটা বুঝতে পারছি?—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন। একজন মা সন্তানের কাছে বড় কোনো চাওয়া রাখেন না; তিনি শুধু চান ভালোবাসা, সম্মান আর একটু আন্তরিকতা।

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers