মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (২য় পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ২০ অক্টোবর , ২০২৩, ১১:১২:১১

3K
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (২য় পর্ব)

২য় দিন/২০/০৭/২০২১

২০ তারিখ ভোরবেলা এপি আপু আর নিশাত আপুর কথোপকথনেই ঘুমটা ভেঙে গেল। এদিকে, আগের দিন এত পথ সাইক্লিং করায় সারা শরীর ব্যথায় ভরে আছে। রাতে একটা প্যারাসিটামল না খেয়ে ভুল হয়েছে। গ্যাস স্টোভ জ্বালিয়ে এপি আপু গরম পানি করে সবাইকে খাওয়ালেন। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মাঝেই  নিশু আপু কোথা থেকে যেন  তুলসি পাতা এনে আমাদের সবার হাতে তুলে দিলেন। এরপর রঙ চা খেয়ে স্যুপ বসানো হল। হালকা ব্রেকফাস্ট করে লিয়াংদাকে কল দিতেই বললেন ১০ মিনিট লাগবে। সকাল ৯টায় আমাদের  বিছানাপত্র ও ব্যাগ গুছিয়ে রেখে আমরা সাইকেল নিয়ে বের হলাম। ড্রিঞ্জার পিসির বাসার উঠোনে এক ঘরে বেশ কয়েকটি খরগোশ লাফালাফি করছে। সামনেই মস্ত বড় বয়েসি এক গাছ। কী বিশালতা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি। কী সুন্দর! পাশেই বহু যত্নে আগলে রাখা একটি সমাধি। হয়ত পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির সমাধি এটি। যার নাম মৌরী মারিয়া চিরান, চলে গেছে সেই ২০১৪ সালে। বেশ যত্ন করে সেই দিদির ছবি সাজিয়ে রাখা আছে সমাধির পাশে। দেখেই বুকটা কেমন হুঁ হুঁ করে উঠল।

একটু এদিক সেদিক করতে করতেই লিয়াংদা চলে এলেন। লিয়াংদা বললেন, পাশের বিশালকার গাছটির স্থানীয় নাম জৈনা গাছ। এটি প্রায় ১০০ বছরের পুরনো। উঠোনে দাঁড়িয়ে সবার সাথে একটা গ্রুপ ফটো নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।

প্যাডেল মারতে মারতে গায়রা গ্রাম পেরিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম বনের মধ্যে। মধুপুরের নির্জন বন। গা ছমছমে নিস্তব্ধতা।  লাল ইটের রাস্তায় বনের বুনো গন্ধ শুকতে শুকতে আমরা সাইক্লিং করছি আস্তে আস্তে। সাথে মোটরসাইকেলে আছেন লিয়াংদা আর শান্তদা। ইটের রাস্তা, জায়গায় জায়গায় ভাঙা। চালাতে গিয়ে সাইকেলে ঘটঘট শব্দ হচ্ছে। এমন নিস্তব্ধ বনে সাইকেলের এমন শব্দ ঠিক মানানসই নয়। বনের মধ্যে সাইকেল এনে কি ভুল করলাম?

এমন নির্জন বনের সাথে কথোপকথনের জন্য আমাদের চলতে হবে নিঃশব্দে। ভাঙা রাস্তায় শব্দ হচ্ছে সাইকেলে।  তাই সবাই নেমে পড়লাম সাইকেল থেকে। এবার হেঁটে-হেঁটে বনের পথে চলা শুরু।

মধুপুর বনে

পথেই ইটের রাস্তায় পরে থাকা নানা রঙের বুনো ফুল বার বার অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল আমাদের। সেখান থেকে তুলে কানে গুজিয়ে দিলাম বুনোফুল। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে একটা দুটো বয়েসি গাছ, যার শরীর বেয়ে বাস করছে অসংখ্য পরগাছা। আর সবুজ শায়রের সৌন্দর্যে বিমোহিত করে তুলেছে চারদিক। পাতার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝেই উঁকি দিচ্ছে বৃষ্টিতে স্নান করা কচি কচি পাতা। লাল ইটের পথে ছড়িয়ে থাকা বুনোফুলের উপর দিয়েই আমরা চললাম অনেকটা পথ। এর মধ্যে আরও বার কয়েক কাদার রাস্তায় সাইকেল নিয়ে পড়ে গেলেন আমাদের তালুকদার মশাই।

বনের পথে চলতে চলতেই জালাবাদ গ্রামের কাছে এসে থামলেন লিয়াং দা। এখানেই আছে বিপ্লবী পীরেন স্নালের স্মৃতিস্তম্ভ। পীরেন স্নালের ব্যাপারে আগের রাতেই অনেক কিছু বলেছেন লিয়াংদা। মধুপুরে কেউ বেড়াতে আসলে উনি সবার আগে তাদের এখানে নিয়ে আসেন। ট্যুরিস্ট হিসেবে শুধু জঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করে চলে যাবে তা হবে না। জঙ্গলের গ্রামে বাস করা মানুষের সুখ দুঃখ, সংগ্রাম ও নানা ত্যাগের কথাগুলোও জানা উচিত। তাই আমাদেরও সবার আগে এখানেই নিয়ে এলেন দাদা।

২০০৪ সালের ৩রা জানুয়ারি মধুপুরে ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনে শান্তিপূর্ণ মৌন মিছিল করা হয়। মধুপুর গড়ের ৩ হাজার একর জায়গা জুড়ে ৬১ হাজার রানিং ফুট দেয়াল নির্মাণের প্রতিবাদে সেদিন আদিবাসী জনতা সংগঠিত হয়েছিল। সেই মিছিলে পুলিশ ও বন রক্ষীরা নির্বিচারে গুলি চালালে এই জালাবাদে বনের মধ্যেই শহিদ হন পীরেন স্নাল। সেই সাথে উৎপল নকরেকসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নিরীহ আদিবাসী নারী পুরুষ আহত হন। সেই পীরেন স্নালের বীরত্বকে স্মরণ করেই এখানে নির্মাণ করা হয়েছে পীরেন স্নালের স্মৃতিস্তম্ভ।  সবুজ বনের মাঝে পীরেন স্নালের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এলো। আমার আর শিল্পী আপুর কানে গুজে রাখা বুনো ফুল হাতে নিয়ে অর্পণ করলাম পীরেন স্নালের স্মৃতিস্তম্ভে। এরপর সেখানেই লিয়াং দাদা শোনালেন পীরেন স্নালকে নিবেদিত মাদল ব্যান্ডের সেই বিখ্যাত গানটি।

লাল মাটিকে রক্ষার জন্য, মানুষ হয়ে বাঁচার জন্য, শাল বৃক্ষের মতো শিনা টান করেই জান দিয়েছেন পীরেন স্নাল। এসব ভাবতে ভাবতে আরও কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে আমরা উঠে পড়লাম।

বিপ্লবী পীরেন স্নালের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে...

বনের মধ্য দিয়ে ঘোড়ার পিঠে করে মোট বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকেরা। চাবুক দিয়ে ইচ্ছে মতো পেটাচ্ছেন ঘোড়াগুলোকে। দেখে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। মানুষ শুধুমাত্র নিজের প্রয়োজনে কত নিরীহ প্রাণীর উপর এভাবে অত্যাচার চালায়।

এতক্ষণে আমাদের সবার পেটেই কিঞ্চিৎ ক্ষুধা অনুভূত হচ্ছে। বনের মধ্যে আনারস ক্ষেতে কত্ত আনারস। কিন্তু খাওয়ার উপযোগী ছিল না একটিও। সব ছোট্ট। আরেকটু এগিয়ে লিয়াং দাদা আমাদের নিয়ে গেলেন ওনার দিদির বাড়িতে। ঝকঝকে তকতকে দিদির বাড়িতে ঢুকতেই দিদি নিয়ে এলেন লেবুর শরবত। তৃষ্ণার্ত সবাই প্রাণ ভরে সেই শরবত পান করে শীতল করলাম প্রাণ। এরপর এলো নানা পদের বিস্কুট আর লেবু চা। এত বিস্কুট খাওয়া যায়! সেখানে খানিক বিশ্রাম নিয়ে আবার আমরা যাত্রা শুরু করলাম গাঁয়ের পথ ধরে। যাব জয়নাগাছা গ্রামে। সেখানে পান্টু সিমসাং নামের এক দাদার সাথে গ্রামের মেয়েদের নিয়ে ফুটবল ম্যাচ নিয়ে কথা বলেছেন লিয়াং দাদা। জয়নাগাছা গ্রামে এক দোকানে বসে চা খেতে খেতে আমরা সাথে করে নিয়ে আসা জার্সি, ফুটবল ও মেডেলগুলো পান্টু দাদাকে দিয়ে দিলাম। আর ২০ জন মেয়েকে নিয়ে ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্ব নিলেন দাদা। দাদাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে এবার আমাদের গন্তব্য চুনিয়া গ্রাম।

চুনিয়ার কথা বলতেই আমার মনটা আনন্দে নেচে  উঠল। রফিক আজাদের সেই চুনিয়া! আহা! রফিক আজাদ লিখেছিলেন, ১৯৭৫ সালে পরিবারসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর সেই সময় খুব বিষণ্ণ মনে  এক পূর্ণিমায় প্রথম যান চুনিয়াতে। সাথে ছিলেন শামসুজ্জামান খান, রাহাত খান, রশীদ হায়দার, রইছউদ্দিন ভূঁঞা। সেই যাত্রায় গারোদের আতিথেয়তা ও আন্তরিকতায়  মুগ্ধ হয়েছিলেন কবি। চুনিয়ার প্রাকৃতিক লীলাভূমি আবেশিত হয়ে ফিরে এসেই লিখেছিলেন ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’। এরপর বহুবার ফিরে ফিরে গেছেন চুনিয়ায়।

সেই চুনিয়া আমার আর্কেডিয়ায় আজ আমার পা পড়েছে। সেই শান্ত স্নিগ্ধ চুনিয়া! নির্মল সবুজ চুনিয়া। লাল মাটির চুনিয়া। ঝকঝকে তকতকে শৈল্পিক মাটির ঘরের চুনিয়া।

আসলে চুনিয়া মানে কি শুধুই চুনিয়া? চুনিয়া তো পুরো মধুপুর গড়। এই গড়ে যত গ্রাম আছে তার সবগুলোরই মেটাফর তো চুনিয়া। সেই শান্ত স্নিগ্ধ চুনিয়া হয়ত আর আগের রূপে নেই,  কিন্তু শান্তিপ্রিয় সেই মান্দিরা, সেই গারো জাতি এখনো তেমনই, তেমনই অতিথিপরায়ন। যে কয়টা বাড়ির উঠোনেই আমাদের পা পড়েছে, সকলেই উষ্ণভাবে বরণ করেছেন আমাদের। তাদের ঘরের সামনের ফুলেল শোভা অপার মুগ্ধতায় বিমোহিত করেছে আমাদের।

চুনিয়া গ্রাম

এই চুনিয়া গ্রামেই বাস করেন সেখানকার একমাত্র সাংসারেক জনিক নকরেক। দেখা হল তাঁর সাথে। সাংসারেক হল গারোদের আদি ধর্ম।

গারো বা মান্দিদের প্রায় সবাই খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেলেও ১১৬ বছর বয়েসি জনিক নকরেক সাংসারেক ধর্ম ছাড়েননি। তার কাছে বিশ্বাস ছেড়ে বেঁচে থাকা কঠিন। গারোদের আদি এই ধর্মের রীতিনীতি পুরোপুরি মেনে চলেন তিনি। জনিক নকরেককে সবাই আচ্চু বলে ডাকে। মান্দিদের আচিক ভাষার আচ্চু শব্দটির বাংলা হবে দাদা অথবা নানা।

ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তি জনিক নকরেক। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, বাল্যে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গল্প শুনেছেন। যৌবনে ব্রিটিশ শাসনের দাপট দেখেছেন। ভারত বিভক্তি প্রত্যক্ষ করেছেন। ‘হাতমে বিড়ি মুমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান শুনেছেন। মধুপুর থেকে ময়মনসিংহ চল্লিশ কিলো কাঁচা রাস্তা পায়ে হেঁটে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মহাত্মা গান্ধীর জনসভায় গিয়েছেন।

জনিকের জীবনের সবচয়ে বড় স্মৃতি ৭১ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মধুপুর বনাঞ্চলের দোখলা বাংলোতে অবস্থানকালে বিরল সাক্ষাৎ। বেগম মুজিব ও শেখ রাসেল ছিলেন সফরসঙ্গী। দোখলা বাংলোতে অবস্থানকালে চুনিয়া গ্রাম পরিদর্শনের সময় জনিকের জীর্ণ কুটিরেও একদণ্ড বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

জনিক নকরেক

চুনিয়া থেকে বের হয়ে মধুপুর উদ্যানের ভিতর দিয়ে আমরা চলে গেলাম দোখলা বাজারে। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে ফেরার পথে বনের মধ্যে চা বিরতি দিলাম বাসন্তী দিদির দোকানে। মধুপুরের বাসন্তী রেমার উপর বন বিভাগের নিপীড়নের কথা অনেকেই জানে।

অতিদরিদ্র বাসন্তী রেমা তাঁর দুটো সন্তান নিয়ে  বসতবাড়িসংলগ্ন ৪০ শতক জমিতে ঋণ নিয়ে কলা চাষ করেছিলেন। গতবছর বিনা নোটিসে নির্বিচারে সেই কলা গাছগুলো কেটে ফেলে বন বিভাগ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। বাসন্তীর আর্তনাদে এলাকাবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করলে কাজটি বন্ধ হয়।

সেই বাসন্তী দিদির চায়ের দোকানে দিদির হাতের চা খেয়ে আমরা ধরলাম জয়নাগাছা গ্রামের পথ। সেখানে গ্রামের কিশোরীদের নিয়ে হবে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ।

চলবে…

শতবর্ষী জৈনা গাছ

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers