মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (৩য় পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ২৭ অক্টোবর , ২০২৩, ১১:৫৮:০২

851
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (৩য় পর্ব)

(২০/০৭/২০২১)

বাসন্তী দিদির দোকান থেকে কিছুদূর সাইকেল চালিয়েই পৌঁছে গেলাম জয়নাগাছা গ্রামে। জয়নাগাছা প্রাইমারী স্কুলের সবুজ মাঠে পৌঁছেই দেখি কিশোরী মেয়েদের দল নিয়ে অপেক্ষা করছেন পান্টু সিমসাংদা দা।  অনেক বড় স্কুল মাঠ। এপি আপু তড়িঘড়ি করে টিম রেডি করলেন।  ২০ জন মেয়ের দরকার হলেও আছে ১৬ জন।  এখন কী করার? দল মেলাতে গিয়ে তাদের সাথে যুক্ত হলো রত্না আপু। অনিচ্ছা সত্ত্বেও  টিম মেলাতে একটি দলে আমিও যোগ দিলাম। দুই দল মিলে ১৮ জন হল। একে একে সবাইকে জার্সি দেয়া হল।  নীল জার্সির এক দল আর কমলা জার্সির আরেক দল।  রত্না আপু হলেন কমলা দলের গোল কিপার, আর আমি নীল দলের একজন হুদাই  খেলোয়ার। ফুটবলের নিয়ম কিছুই জানি না। এপি আপু বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে সবাইকে একসাথে দাঁড় করালেন।  টস হল। খেলা হবে ১৫ মিনিট করে ৩০ মিনিটের। নিশাত আপু সময় দেখছেন । আর শিল্পী আপু ব্যস্ত ভিডিওগ্রাফিতে।  এরই মধ্যে মাঠের চারপাশে জড়ো হয়েছে অনেক মানুষ। এপি আপু আছেন রেফারির ভূমিকায়। বাশিতে ফুঁ দিতেই খেলা হল শুরু।

এখানকার বাচ্চারা কেউই তেমন ফুটবলের কোনো নিয়ম কানুন জানে না। খেলতে খেলতেই ফাউল, আউট, ফ্রি কিক এসব জানা হচ্ছে এপি আপুর বদৌলতে। এপি আপুকে সবাই চেনে। তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের একজন স্বনামধন্য নারী রেফারি। দারুণ ফুটবল খেলেন। ফুল ম্যারাথন, দিনে দুইশো কি.মি. সাইক্লিং কিংবা সাঁতার এসব তার কাছে মামুলি ব্যাপার। আর ওনার হাতের হাঁসের মাংস আর রুটি যারা খেয়েছেন তারা জীবনে একবার হলেও  ঘুমের মধ্যে হাঁস হাঁস বলে নাক ডেকেছেন নিশ্চিত। তো এই এপি আপু তার যাদুকরি ছোঁয়ায় বাচ্চাগুলোকে দারুণভাবে ফুটবলের নিয়মকানুন শেখাচ্ছিলেন খেলতে খেলতেই। আমি বয়সে প্রায় বুড়ো হওয়ায় আমার অবশ্য এসব বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল। কিশোর বয়সে এই তালুকদার মশাইয়ের সাক্ষাৎ পেলে হয়ত হতেও পারতাম নামকরা ফুটবলার (?)।

নতুন হিসেবে বাচ্চাগুলো খুবই দারুণ ফুটবল  খেলছে। শুরুতে কমলা দলের তুলনায় নীল দলই বেশি ভালো খেলছিল।  তবে কমলা দলের গোল কিপার রত্না আপু দারুণ পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন।  ম্যাচ শুরুর ৬ মিনিটের মাথায় প্রথম গোলটাও দিয়ে দিল কমলা দল।

আবারও খেলা শুরু।  পান্টু দাদা নতুন দুইজন মেয়ে এনে দুই দলে যুক্ত করলেন। এবার দুই দল মিলে ২০ জনের টিম হল। বেশ উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ হলেও হাফটাইমের আগে পেনাল্টিতে নীল দল একটি গোল দিলে ১-১ এ সমতায় এলো ম্যাচ। এবার বিরতি।

বিরতিতে  দুই দলই আলাদা আলাদা বসে আলোচনা করছে। কে জিতবে?  নীল দলের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম জিততে পারবে তো? কনফিডেন্স নিয়ে বলল, হ্যাঁ আমরাই জিতব। বিরতির পর খেলা শুরু হলে  সেকেন্ড হাফে পেনাল্টিতে আরও একটি গোল দিয়ে ২-১ এ এগিয়ে গেল কমলা দল। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীল দল আরেকটি গোল দিয়ে ২-২ এ সমতায় আনল ম্যাচ। জমজমাট উত্তেজনা চারদিকে।  কে জিতবে? কিন্তু ২-২ এর সমতাতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে এল খেলার পুরো ৩০ মিনিট। 

যেহেতু দুই দলই সমান সমান, তাই খেলা চলে গেল টাইব্রেকারে। প্রথম ধাপের টাইব্রেকারও টাই হয়ে গেল। দুই দলেরই ৩ জন করে ৬ জন প্লেয়ার ২ টা করে ৪ গোল দিল। আবারও টাইব্রেকার। এবার এক গোল বেশি দিয়ে জয় ছিনিয়ে নিল নীল দল।

এরই মধ্যে মাঠের চারদিকে আরও অনেক বেশি মানুষ জমে গেছে।  ছেলে মেয়েরা হাততালি দিয়ে লাফাচ্ছে।  সবার মাঝেই দারুণ এক উত্তেজনা।

মধুপুরের জয়নাগাছার এই মান্দি কিশোরীরা হয়ত কখনোই ভাবেনি নিজেদের স্কুল মাঠে এভাবে ফুটবল খেলবে তারা।  চারদিকে দর্শকেরা জড়ো হয়ে তাদের খেলা দেখবে।  আসলে এই গারো কমিউনিটি বাদে অন্য কোনো বাঙালি কমিউনিটিতে হয়ত এত সহজে ফুটবল ম্যাচ আয়োজন সম্ভব হতো না।   এখানকার মেয়েরা অনেক বেশি লিবারেল।  দুই দলে খেলেছে ওয়ান্না দালবত, সঙ্গিতা স্নাল, সেংছি নকরেক, দিংশ্রিয়া মাংসাং, ফ্রুই নকরেক, উপমা দফো, সিলমি ম্রং, জমমী নকরেক, উষা দফো, দৃষ্টি দালবৎ, অষ্টিনা দালবত, তানিয়া হাগিদক, চনিয়া দালবত, সুমনা নকরেক, চিনা নকরেক, ছমি নকরেক, অর্ণি চিরান ও মাংরি দালবত।  এই মেয়েরা প্রত্যেকেই অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী।  যথাযথ ট্রেইন আপ করলে এদের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে অনেক ভালো ফুটবলার।

খেলা তো শেষ।  এবার মেডেল দেয়ার পালা।  নিশু আপু আর লিয়াং দাদা একে একে চ্যাম্পিয়ন ও  রানার আপ দুই দলের খেলোয়ারদের গলাতে পরিয়ে দিলেন মেডেল। এরপর ঘোষণা করা হল সেরা খেলোয়ারের নাম।  সেরা খেলোয়ার হয়েছে কমলা দল থেকে একজন। সবাই প্রচুর হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাল তাকে। অভিনন্দিত করল দুই দলকেই। আর অনেক বেশি সম্মানিত করল আমাদের। সবাই মিলে একসাথে অনেক অনেক ছবিও তোলা হল।

খেলা শেষ করে পাশের দোকানে চা খেতে গেলাম আমরা। বাজার লোকজন দারুণ উৎসাহ নিয়ে বলছে আগে থেকে জানালে গ্রামের আরও অনেকেই আসত খেলা দেখতে।  পানটু সিমসাংদা দাদা এই গ্রামে  ছেলেমেয়েদের জন্য অনেকটা  কোচের ভূমিকায় আছেন। দাদার কারণেই আজকের এই আয়োজন সম্ভব হয়েছে। কৃতজ্ঞতায় দাদার প্রতি নত হয়ে এল মাথা। এত অল্প সময়ে উনি এতগুলো মেয়েকে রাজি  করিয়ে মাঠে খেলাতে আনবেন ভাবতেই পারিনি আমরা। সেই সাথে বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় বন্ধু ড্রিঞ্জা চাম্বুগং আর  লিয়াং রিছিল দাদার প্রতি।  ওঁরা না থাকলে এসবের কিছুই হত না।

এদিকে, বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে।  আজ আমরা ক্যাম্পিং করব বনের ভিতরে। লিয়াং দা নিজেই ওদিকে সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আমাদেরও সব গুছিয়ে বনে ঢুকতে হবে।  বাজারে চা খেয়ে রাতে ক্যাম্পিং এর জন্য বিশেষ আদিবাসী খাবার গাপ্পা তৈরির জন্য  কেনা হল মুরগীসহ অন্যান্য বাজার-সদাই। এরপর রওয়ানা দিলাম গায়রার দিকে।  নিশু আপু, রত্না আপু, শিল্পী আপু আর আমি সামনের দিকে এগিয়ে আগেই বনে ঢুকে গিয়েছি।  বাকিরা অনেক পিছনে বলে আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পরলাম। হঠাৎ নিশু আপু ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আমাদের শব্দ না করতে বললেন। ইশারায় তাকাতে বললেন উপরের দিকে।  উপরে এক গাছে ঝুলে আছে সোনালি রঙের এক বানর। এমন বানর আগে দেখিনি।  এক ডাল থেকে আরেক ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বানরটা। কী সুন্দর!

বানরের খেলা দেখতে দেখতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই লিয়াংদা, এপি আপুসহ অন্যরা চলে এল। আবারও বনের মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা গায়রার উদ্দেশে।  সেখানে ড্রিঞ্জাদের বাড়ির সবাই আজও অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

চলবে...

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers