সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ১ জিলহজ ১৪৪৭

ফিচার
  >
ভ্রমণ

সাইকেলের ডানায় উড়াল (৪র্থ পর্ব)

আঞ্জুমান লায়লা নওশিন ৩ নভেম্বর , ২০২৩, ১০:২৫:৪০

798
  • সাইকেলের ডানায় উড়াল (৪র্থ পর্ব)

(২০/০৭/২০২১)

জয়নাগাছায় ফুটবল ম্যাচ শেষ করে গায়রায় ড্রিঞ্জাদের বাড়িতে পৌঁছুতেই প্রায় অন্ধকার। গোধুলী রাঙা সন্ধেবেলায় ওদের বাড়ির কামিনীতলা পেরিয়ে উঠোন অব্দি পৌঁছুতেই দেখি বাড়ির সবাই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সকালে মধুপুর বনে যাওয়ার সময় বাজারে আংকেলের মানে ড্রিঞ্জার বাবার সাথে একবার দেখা হয়েছিল। বলেছিলাম বিকেলে আসব।  আগের দিন রাত হয়ে যাওয়ায় কারও সঙ্গে একটা ছবিও তোলা হয়নি। আগেও প্ল্যান করে রেখেছিলাম আলো থাকতেই ওদের বাড়ি গিয়ে সবার সঙ্গে ছবি তুলব।  কিন্তু তা আর হরেলা না।  আজও অন্ধকার হয়ে এসেছে।

ড্রিঞ্জাদের বাড়িতে গিয়ে দেখি আজও টেবিল ভর্তি নানা পদের ফুলমূল ও খাবার সাজিয়ে রেখেছে আমাদের জন্য।  গাপুসগুপুস ফলগুলো সাবার করে কিছু সঙ্গে নিলাম আমরা। ড্রিঞ্জার বাবা ব্যাগ ভর্তি করে লেবু দিলেন। আন্টি দিলেন আম ও আনারস। পারলে বস্তা ভর্তি করে ফলমূল দিয়ে দেন তিনি। এত কিছু নিতে পারব না বললেও  জোর করে দিয়ে দিলেন তিনি।

ড্রিঞ্জার বোন পূর্ণা ভারী মিষ্টি এক মেয়ে। ও কয়েক সেট ট্র্যাডিশনাল পোশাক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের পরাতে।  সারাদিন ঘোরাঘুরি আর খেলাধুলা করে শরীরে দুর্গন্ধ হওয়ায় আমরা এসব পরিস্কার পোশাক পরতে আপত্তি জানালাম। কিন্তু আন্তরিকতা কাকে বলে! কিছুতেই আন্টি ও পূর্ণা আমাদের কথা শুনল না। জোর করেই পরিয়ে দিল পোশাক।  এমন ট্র্যাডিশনাল পোশাক পরে আমরা তো মহাখুশি। এমন অসামান্য মুহূর্তের স্মৃতি ধরে রাখতে যেই না  ছবি তুলতে দাঁড়াব অমনি  চলে গেল বিদ্যুৎ। কী আর করার। সোলারের আলোতেই তড়িঘড়ি করে সবাই মিলে কিছু ছবি তুললাম আমরা।  কারণ ওদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে।

ড্রিঞ্জাদের বাড়ির প্রবেশপথ

ড্রিঞ্জাদের পুরো পরিবারটাই অনেক বেশি প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর। আন্টি তো সারাক্ষণই হাসেন।  এই বয়সেও আংকেল আন্টির মধ্যে এখনো দারুণ এক রোমান্স আছে।  আংকেল যখন হাতে মোবাইল নিয়ে আন্টির ছবি তুলে দিচ্ছিলেন তখন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন আন্টি।  এমন চমৎকার সান্নিধ্য ছেড়ে আজ আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিল না। তবুও আমাদের ফিরতে হবে। জগতের নিয়মই তো এই। সবার থেকে বিদায় নিয়ে  রাত ৮টার দিকে ড্রিঞ্জার পিসির বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম আমরা।  রাত হয়ে গেছে। পিসির বাসা থেকে আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে আমরা যাব বনের মধ্য আমাদের ক্যাম্পিং স্পটে।  টর্চলাইট নিয়ে আমাদের এগিয়ে দিলেন আংকেল। পিসির বাসায় এসে আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা আমাদের প্যানিয়ার, তাবু, ম্যাটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র সাইকেলে তুলে আমরা রওয়ানা হলাম বনের উদ্দেশে।  বেশ রাত হয়ে এসেছে। এবারে দুটো মোটর সাইকেলে লিয়াংদা ও শান্তদার সাথে যুক্ত হয়েছেন তুষার দাদা।  বনের এই রাস্তাটা বেশ কাদা ও খানাখন্দে ভরা।  রাতের বেলা এই পথে সাইক্লিং অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।  বারবার সাইকেল গর্তে পড়ে যাচ্ছে।  এর মধ্য দিয়েই আমরা নির্দিষ্ট সময়েই পৌঁছে গেলাম আমাদের ক্যাম্পিং স্পটে।

গাপ্পা রান্নার প্রস্তুতি

বনের পাশে আমবাগানে আমাদের ক্যাম্পিং স্পট।  রাত বেশি হওয়ায় এবার আমরা বনের অনেক গভীরে যেতে পারলাম না। এখানে বড় একটি টিনশেডের নিচে আমরা তাবু টানালাম। চারদিকে আমবাগান। দূরে ফসলের ক্ষেত।  জোৎস্না রাত হলেও আকাশ বেশ মেঘলা। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।  আমরা ৫টি মেয়ে।  আমরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে এখানে ক্যাম্পিং করতে পারি তার জন্য  লিয়াং দাদাদের সাথে আমাদের নিরাপত্তার জন্য আরও কয়েকজন গ্রামবাসী সেখানে এসেছেন।   ওনারা সার্বক্ষণিক সব ধরনের সহযোগিতা করছেন আমাদের। কলাপাতায় মুড়িয়ে ট্র্যাডিশনাল ভাত নিয়ে এসেছেন ওনারাই।  আর মুরগির গাপ্পা তৈরি হবে এখানেই। পাশেই একটি টানা কলের ঠান্ডা জলে একে একে গোসল সেরে সব ক্লান্তিকে বিদায় জানালাম  আমরা।  এদিকে, গাপ্পা তৈরির জন্য মুরগি কেটে রেডি করছেন অন্যরা। আগুন জ্বালানো হল।  মুরগির মাংসগুলোতে প্রয়োজনীয় মসলা মাখিয়ে কলার পাতায় মোড়ানো হল।

 হালকা ঝিরিঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। ক্যাম্প ফায়ারও রেডি। আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে সব কাণ্ডকারখানা দেখছি আমরা। আমাদের জন্যই এত আয়োজন। অথচ আমরা কিছুই করছি না। সব কাজকর্ম অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দের সঙ্গে লিয়াংদা, তুষারদা, শান্ত দাদা আর অন্যরা মিলে করছেন।

ক্যাম্প ফায়ার প্রস্তুত

রান্নার জন্য কয়লার মধ্যে কলার পাতায় মোড়ানো মুরগির মাংস দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হল বৃষ্টি। বিধি বাম। আগুন তো নিভে যাচ্ছে।  কী হবে?

বৃষ্টির কারণে নতুন করে টিনশেডের ভিতরে আবারও আগুন জ্বালানো হল।  সেখানেই রান্নার বাকি কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। এদিকে, পাটি বিছিয়ে সবাই মিলে চলছে তুমুল আড্ডা।  হঠাৎ ফুটবল খেলায় এর মধ্যেই আমার শরীর নেতিয়ে পরেছে। সবাই যখন একসাথে আড্ডা দিচ্ছিল, আমি গিয়ে তাবুতে গড়িয়ে নিলাম বেশ কিছুক্ষণ। রাত ১২টার দিকে রান্না শেষ হলে খেতে ডাকল সবাই। গিয়ে দেখি কলার পাতায় মোড়ানো ভাত আর বিশেষ কায়দায় তৈরি ট্র্যাডিশনাল ফুড গাপ্পা নিয়ে বসেছেন এপি আপু, শিল্পী আপু, নিশাত আপু আর রত্না আপু। লিয়াং দাদারা বসেন নি। কয়লার মধ্যে আরও একটি মুরগি রান্না হচ্ছে, সেটা তৈরি হলেই ওনারা খাবেন। একসাথে খেতে চাইলেও কাল সকালে আমাদের যাত্রার কথা ভেবে দাদারা আপত্তি জানালেন। রত্না আপুর সাথে একই পাতে বসে  প্রথমবারের মতো খেলাম গারোদের সেই ঐতিহ্যবাহী খাবার গাপ্পা ও কলাপাতায় মোড়ানো ভাত।  তেল ছাড়া শুধু লবণ পেঁয়াজ আর মরিচ দিয়ে রান্না করা চমৎকার খাবার।

কৃষকদের আনা কলাপাতায় মোড়ানো ভাত

খাবার খেয়ে ক্লান্ত শরীরে রত্না আপু আর আমি ঢুকে গেলাম তাবুর মধ্যে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। বনের মধ্য ঝমঝম বৃষ্টির শব্দই যেন টেনে নিয়ে গেল আরও গভীর ঘুমের সাগরে। শুধু হঠাৎ হঠাৎ কানে ভাসছিল দম ফাটানো হাসির শব্দ। আমি আর রত্না আপু যখন গভীর ঘুমে তখন মাঝরাত পর্যন্ত জেগে থেকে বনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আড্ডা দিলেন বাকি সবাই। আগামীকাল আমাদের গন্তব্য শেরপুর শহর।

চলবে...

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers