শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ , ১৪ জুমাদাউস সানি ১৪৪৭

জীবনযাত্রা

বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে যেসব কারণে!

নিউজজি ডেস্ক নভেম্বর ১১, ২০২৫, ১৯:৩৭:০৪

211
  • ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: ভালো দাম্পত্য সম্পর্ক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দাম্পত্য জীবন সুখের না হলে পুরো জীবনটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে। এত অশান্তি আর কোথাও নেই ,যদি কাছের মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকে।  সবচে বড় বিষয় হচ্ছে দুজনের বোঝাপড়া। এ  জায়গাতে মিল না হলে জীবন বিষাদময় হয়ে উঠতে বাধ্য।

দাম্পত্য জীবনে ছোট ছোট কিছু ভুল ধীরে ধীরে বড় হয়,এবং এক সময় যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন সম্পর্কের  সঠিক রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ার মধ্য দিয়ে মানুষ মুক্তি খোঁজে। অথচ একটু সচেতন হলে এড়ানো যায় এসব সমস্যা।  

যেসব কারণে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটছে

সঙ্গীকে অসম্মান করা: দম্পতিদের মধ্যে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া হওয়া কিংবা মনোমালিন্য খুবই সাধারণ বিষয়। তাই বলে বারবার সঙ্গীকে অসংলগ্ন কথা বলা কিংবা সঙ্গীকে অসম্মান করা বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে। এর ফলে অপরজনের মধ্যে ধারণা জন্মায়, সঙ্গীর কাছে বোধহয় তার কোনো সম্মান নেই!

ভুল বোঝাবুঝি : বেশিরভাগ মারামারি, তর্ক ও বিবাহবিচ্ছেদের মূল কারণ হলো ভুল বোঝাবুঝি। অনুমান ও অবিশ্বাস্যের কারণে ঘটতে পারে বিবাহবিচ্ছেদ।

বিশ্বাসঘাতকতা: বিশ্বাসঘাতকতার কারণেও অনেকেরই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক দাম্পত্য জীবন ধ্বংস করে দেয়। মুহূর্তেই ভেঙে দেয় সাজানো-গোছানো সংসার।

নেশাগ্রস্ত : অ্যালকোহল, ড্রাগে আসক্ত ব্যক্তিরাও সম্পর্ক ও সঙ্গীকে ধরে রাখতে পারেন না। কারণ মেজাজের পরিবর্তন, আচরণ, ঘুমের ধরন, ক্ষুধা, পারিবারিক দায়িত্ব, বন্ধু ও সংযোগ, অর্থের অপচয় ও ভুলে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে এমন মানুষদের মধ্যে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা লোভ: অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা লোভী নারী-পুরুষ অর্থ, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লোভে তার চেয়ে তিনগুণ বয়সী নারী-পুরুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। একসময় মোহ চলে যায় বা অক্ষম পুরুষ-নারী কিংবা অর্থচাহিদা পূর্ণ হলে আবার নতুনের সন্ধানে বের হয়। এমন সম্পর্ক শেষ হয় বিবাহবিচ্ছেদের মাধ্যমে।

পারিবারিক নির্যাতন: পারিবারিক নির্যাতনের কারণেও একটি সংসার ভেঙে যায়। বিশেষ করে অনেক নারী তার সঙ্গীর কাছ থেকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটান। শুধু নারীরাই নন, পুরুষদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এটি দেখা যায়।

তৃতীয়পক্ষের হস্তক্ষেপ: কারও দাম্পত্য জীবনে যদি পরিবারের সদস্যদের মতামত কিংবা অভিযোগ যুক্ত হয়, সে ক্ষেত্রে বিরোধ বাঁধতে পারে দম্পতির মধ্যে। যেমন- শ্বশুরবাড়ির কোনো সদস্যের বিরূপ মন্তব্য কিংবা কটাক্ষর শিকার হয়েও অনেকে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটান।

অভাবে-সংকটে: কখনো অভাব ঘরে ঢুকলে দুজনের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান করা যায়। অভাব ঘরে ঢুকলে নিজেরা এক থাকুন,কোন অভাবকে অভাব মনে হবে না । কথায় বলে, “যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন জন”। অর্থনৈতিক সমস্যা হলে পাশাপাশি বসে সমাধান করুন। সংকট মিটে যাবে।

ডিভোর্স ভাবনা: অল্পতেই ডিভোর্সের কথা মাথায় আনতে নেই। মাথায় একবার আনলে ভেতরে এটা ক্রমশ বড় হতে থাকে। এক সময মাথায় বিঁধে যায় । তখন পান থেকে চুন খসলেই আপনি ডিভোর্স চাইবেন। আপনার এমন আবদার অপর মানুষটিকে সম্পর্কের প্রতি ক্লান্ত করে তুলবে। আপনি যতবার এটি চাইবেন ততবার এই ঘটনার পুরনাবৃত্তি হবে। শেষমেশ  কিছু একটা ঘটেও যেতে পারে।

বিবাহ একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যাকে কেন্দ্র করে সমাজের সুষ্ঠু পরিবেশ যেমন নিশ্চিত করা হয় তেমনি ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে দেওয়া হয় একটি সুন্দর জীবন, তৈরি হয় পরিবার। কিন্তু এই সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই মহামারির মতো যে সামাজিক ব্যাধি তৈরি হচ্ছে তার নাম বিবাহবিচ্ছেদ, যা বর্তমানে উদ্বেগের কারণ। স্কট কলেট্রন ও মিশেল এডামস নামের দুজন সমাজবিজ্ঞানী এই অবস্থাকে কালেক্টিভ অ্যাংজাইটি বা সামষ্টিক দুর্ভাবনা বলতেন। বর্তমান সমাজে নারী পুরুষের সম অধিকার নিশ্চিত করা হলেও পারিবারিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি নারীদের স্বাধীনতা। একই পরিবারে কর্মজীবী পুরুষকে যেভাবে সম্মান ও বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয়, নারীকে তা দেওয়া হয় না। একজন কর্মজীবী নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় সাংসারিক চাপ। শ্বশুরবাড়ি থেকেও বেশিরভাগ সময় সহযোগিতা না করে উলটো আরো বেশি কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং নিখুঁতভাবে পালন করা না হলে শুনতে হয় বিভিন্ন নেতিবাচক কথা অথবা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ। আগের যুগে নারীরা পারিবারিক কলহ বা চাপের মুখেও অনেক কিছু সহ্য করে গিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষিত নারীরা বিচ্ছেদ-পরবর্তী জীবন নির্বাহে সমস্যা না থাকার কারণে বা কর্মস্থলের সুযোগ থাকার কারণে পারিবারিক কলহ বা অত্যাচার সহ্য না করে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। শহরে ডিভোর্সের মধ্যে নারীরা এগিয়ে থাকলেও সেটা সারা দেশের চিত্র নয়। বাস্তবে বিবাহবিচ্ছেদের হার আরো বেশি। কারণ অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার রয়েছে যাদের বিচ্ছেদ পারিবারিক সালিশের মাধ্যমে ঘটে থাকে; যার হিসাব সিটি করপোরেশনে বা কিংবা কোথাও দালিলিকভাবে লিপিবদ্ধ থাকে না। প্রান্তিক পর্যায়ে আগে নারীরা জানতেনই না যে তারা তালাক দিতে পারেন। মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করতেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীরা বর্তমানে ঝুঁকিতে আছেন। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রতি হাজারে ১০.৮ শতাংশ নারী বিবাহবিচ্ছেদ করেছেন। এর বিপরীতে প্রতি হাজারে ১.৫ শতাংশ পুরুষ বিচ্ছেদ করেছেন। মাসে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে ৮৪৩টিরও বেশি পরিবার। এর মধ্যে বিচ্ছেদে এগিয়ে রয়েছেন নারীরা। হিসাব অনুযায়ী, তালাক নোটিশ প্রেরণকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। যার মধ্যে অভিজাত পরিবারের শিক্ষিত ও বিত্তবান নারী থেকে শুরু করে কর্মজীবী নারীর সংখ্যাই বেশি।

বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ জানার পদ্ধতিটিও ত্রুটিপূর্ণ। বিস্তারিত কারণ উল্লেখের সুযোগ থাকলেও নথিবদ্ধকারীরা আবেদনকারীদের নিরুত্সাহিত করেন। হারিয়ে যায় অসংখ্য আসল গূঢ় ও গভীর কারণ। শিক্ষিত নারীদের নিয়ে সংসার পরিচালনা করতে এখনো প্রস্তুত নন ছেলেরা। তারা শিক্ষিত মেয়ের সঙ্গে সংসার করতে চান, কিন্তু শিক্ষিত মেয়ের চাকরিজীবন, তার ব্যক্তিস্বাধীনতা, তাকে কিছু বিষয়ে সহযোগিতা করা—এসবে পূর্ণ স্বাধীনতা বা সহযোগিতা করতে নারাজ স্বামীরা। মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়ে গেছে। পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদও করছে। স্বামী অথবা পরিবার কর্তৃক শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলছে। নারীর ক্ষমতায়নের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়েও উপার্জনক্ষম নারী বাড়ছে। অর্থনৈতিক মুক্তি শুধু কারণ নয়, আদর্শিক চিন্তার পরিবর্তনও একটা বড় কারণ। এজন্য নারীরা সাহস করে তালাক দিতে পারছে।

অন্যদিকে ছেলেদের শিক্ষার হার বেশি হলেও তাদের সঠিক সামাজিকীকরণ না হওয়ার কারণে তারা গতানুগতিক পুরোনো সংসারের ধ্যানধারণা লালন করেন। তাদের পরিবারের নারী সদস্যরা যেভাবে শ্বশুরবাড়ির এবং স্বামীর সব সিদ্ধান্তে সায় দিয়ে সংসারে টিকে থাকতেন, ঠিক তেমনিভাবে এ প্রজন্মের মেয়েটির কাছেও সেটি প্রত্যাশা করেন পুরুষরা। পরিবারের প্রাক্তন সদস্যরাও নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতা মেনে নিতে চান না। শুরু হয় পারিবারিক কলহ এবং অশান্তি। আবার অনেক সময় শিক্ষিত মেয়েরাও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কারণে অহংকার প্রকাশ করে ত্যাগ বা আপস করতে চান না। এজন্য অশিক্ষিত নারীদের থেকে শিক্ষিত নারীদের বিচ্ছেদ এর ঘটনা বেশি। ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি শীর্ষক সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় ১ হাজার ৯০০ জন তালাকপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যে জরিপ চালানো হয়। সার্বিক বিবেচনায় দেখা যায়, তালাক বা বিচ্ছেদের ঠিক পরপরই এই মানুষগুলোর জীবনযাত্রার মান অনেকটা নিচে নেমে যায়। বাবা-মার বিচ্ছেদের পর শিশুদের মানসিক অবস্থারও অবনতি দেখা যায় ব্যাপকভাবে। কোনো কাগজপত্রের ওপর বিবেচনা করে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অধিকারে যেমন পরিবর্তন এসেছে আমাদের চিন্তাধারাও সেভাবে পরিবর্তন করতে হবে। প্রত্যেকের সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ নিশ্চিত করতে হবে, একে অপরের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করতে হবে। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মতামতের গুরুত্ব প্রদান ও প্রাধান্য নিশ্চিত করতে হবে। গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে পরিবারের শান্তি নিশ্চিত করতে পরিবারের সব সদস্যকে সচেতন হতে হবে। ফ্যামিলি কাউন্সেলিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু সমস্যা সমাধান না করে ভালোবাসাহীন, অস্বাস্থ্যকর ও গভীরতাহীন সম্পর্ককে নানা রকম টোটকা প্রয়োগের মাধ্যমে জোরজবরদস্তি টিকিয়ে রাখাও মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

নিউজজি/হাআ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন