রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৪ সফর ১৪৪৮

জীবনযাত্রা

ভালোবাসা নয়, তবু গভীর টান: কী নাম এই অনুভূতির?

নিউজজি ডেস্ক জুলাই ১৫, ২০২৬, ১২:৫৮:৩৪

90
  • সংগৃহীত

ঢাকা: টানা আট বছর ধরে জর্ডান নামের এক নারী অদ্ভুত এক অনুভূতির মধ্যে ছিলেন। তার মনে হচ্ছিল, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছেন। এক সহকর্মীর সঙ্গে সাধারণ পরিচয় ও সম্পর্কের পরও তাকে ভালোভাবে না চিনেই জর্ডান গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেন, ওই ব্যক্তিই তার জীবনের ‘পরমাত্মা’।

৩৫ বছর বয়সী জর্ডান বলেন, আমি প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে তার কথা ভাবতাম। যেকোনও গানের কথা শুনলেই তার কথা মনে পড়ত এবং তার সঙ্গে যোগাযোগের বাহানা খুঁজতাম। তাকে নিয়ে নানারকম চমৎকার কল্পনা সাজাতাম।

জর্ডানের এই অভিজ্ঞতা তীব্র হলেও তা কিন্তু বিরল নয়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের নিউরোসায়েন্টিস্ট টম বেলামির মতে, বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ জীবনে অন্তত একবার এমন ঘোরগ্রস্ত রোমান্টিক মোহের মধ্য দিয়ে যান। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থার নাম ‘লাইমারেন্স’।

অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের নিবন্ধিত মনোবিজ্ঞানী অরলি মিলার জানান, লাইমারেন্স হলো এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যেখানে কোনও ব্যক্তির প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা, আচ্ছন্ন করে রাখা চিন্তা, বাধ্যতামূলক আচরণ এবং তার কাছ থেকে একই ধরনের আবেগ পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা কাজ করে।

১৯৭০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী ডরোথি টেনভ এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করলেও এটি মানসিক ব্যাধির ডায়াগনস্টিক ম্যানুয়ালে (ডিএসএম) অন্তর্ভুক্ত নয়। অরলি মিলারের মতে, সাধারণ ভালো লাগা বা ক্রাশ যেখানে ক্ষণস্থায়ী হয়, সেখানে লাইমারেন্স চলে মাস, বছর বা দশকজুড়ে। এটি যখন কোনও মানুষের ঘুম, খাওয়া বা কাজ করার স্বাভাবিক ক্ষমতাকে ব্যাহত করে, তখনই তা লাইমারেন্সে রূপ নেয়।

লাইমারেন্স আর ভালোবাসা এক নয়। অরলি মিলারের মতে, দুটিতেই তীব্র অনুভূতি থাকলেও লাইমারেন্স হলো অবাস্তব কল্পনা ও অস্পষ্টতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নিজের ভেতরের এক মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা।

কানেকটিকাটের স্যাক্রেড হার্ট ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক অ্যালবার্ট ওয়াকিন বলেন, এখানে অন্য ব্যক্তিটি কেবল একটি প্রতীক হয়ে ওঠে, যেন ওই ব্যক্তিই তার সব সুখ ও পূর্ণতার উৎস। এটি যে কেবল রোমান্টিক বা একপেশে সম্পর্কের ক্ষেত্রেই ঘটবে, তা নয়।

ইউনিভার্সিটি অব চিচেস্টারের মনোবিজ্ঞানী লিন মার্শাল বলেন, এটি রোমান্টিক না-ও হতে পারে। যেমন ম্যাসাচুসেটসের ৪৬ বছর বয়সী ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার লিলি জানান, এক বন্ধুর প্রতি তীব্র অনুভূতির কারণে সেই বন্ধু মেসেজ বা ইমেইলের উত্তর না দিলে তিনি চরম হতাশায় ভুগতেন। দিন-রাত কেবল একই চিন্তা তাকে তাড়া করত।

অরলি মিলার বলেন, এই ঘোরে থাকা মানুষগুলো অন্যজনের সামান্য চাউনি বা মেসেজ থেকে প্রত্যাখ্যান বা গ্রহণযোগ্যতার বিশাল গল্প সাজিয়ে নেয়।

ক্যালিফোর্নিয়ার মনোবিজ্ঞানী অ্যাবি মেডকাফ মনে করেন, অপর মানুষটির অনুভূতি আছে কি নেই, এমন এক ‘অনিশ্চয়তাই’ এই ঘোরের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। ডক্টর বেলামি একে মাদকের আসক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন; প্রতিপক্ষের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার অনিশ্চিত ইঙ্গিতগুলো মস্তিষ্কে পুরস্কার হিসেবে কাজ করে এবং মোহকে আরও তীব্র করে তোলে।

লিন মার্শালের গবেষণা বলছে, শৈশবে অনিরাপদ বা আবেগহীন পরিবেশে বড় হওয়া এবং বড় হয়ে একা হয়ে যাওয়ার ভয়ে থাকা মানুষেরা এই ঘোরে বেশি আক্রান্ত হন। তবে অ্যাবি মেডকাফ মনে করেন, এরা উদ্বিগ্ন বা বাধ্যতামূলক আচরণ করলেও এদের সাধারণ উদ্বেগের রোগ বা অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) থাকে না।

এই মানসিক পরিস্থিতি মানুষকে অত্যন্ত দুঃখী করে তুললেও অরলি মিলারের মতে, চাইলেই এ থেকে হুট করে মুক্তি পাওয়া যায় না। তবে ডক্টর বেলামি মনে করেন, নিজের তাড়নাগুলোকে চিহ্নিত করা (যেমন: ‘আমি তাকে মেসেজ করতে চাচ্ছি এবং এটা একটা লাইমারেন্সের তাড়না’), অপরের খুঁতগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং অন্যরা এই মোহের কথা জেনে গেলে কী হবে তা ভাবা কিছুটা সাহায্য করতে পারে।

সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। যেমনটা জর্ডানের ক্ষেত্রে হয়েছিল; তার সহকর্মী যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর তিনি খেতে ও ঘুমাতে পারতেন না, যা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল।

অরলি মিলার জানান, লাইমারেন্স বোঝেন এমন একজন থেরাপিস্টের সঙ্গে কাজ করা এবং কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি) নেওয়া এক্ষেত্রে বেশ কার্যকর। মূলত মানুষ অন্যের মাঝে নিজের হারিয়ে ফেলা বা আকাঙ্ক্ষা করা গুণগুলো খোঁজে বলেই এমনটা ঘটে। থেরাপির মাধ্যমে নিজের এই ইচ্ছাগুলোকে শনাক্ত ও পূরণ করে লাইমারেন্সকে ব্যক্তিগত বিকাশের বাহনে রূপান্তর করা সম্ভব। সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers